জানার খুব প্রয়োজন?
বাঃ জানতে হবে না। বাইবেলে আছে, লিভ ফর আদার্স। অন্যের জন্যে বাঁচো। বি এ গুড সামারিটান। তুমি তো জানো আমি অক্ষরে অক্ষরে সেই নির্দেশ পালন করি। নিজের ঘরসংসার তো ছেড়েই দিয়েছি। জনহিতকর কাজে সারাদিন ঘুরছি। আর মনে মনে বলছি, তোমার পকাতা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শতকি।
কানে খট করে লাগল, এ আবার কী? পকাতা? শতকি?
বলে পারলুম না, পকাতা শতকি মানে?
মেনিদা খাত খ্যাত করে হেসে বললেন, একে বলে ম্যালাপ্রপিজম। রোগটা ইংরেজদেরই হয় তবে আমারও তো সাদা চামড়া। ক’জন বাঙালির এমন গায়ের রং ছিল বলো! এখন একটু পুড়ে। গেছে পৃথিবীর শোকে-তাপে। তোমার বউদি তো বাসরঘরে প্রথম প্রশ্নটাই করেছিল ইংরেজিতে হোয়াটস দ্যা টাইম নাও। বোককা মেয়ে, বোককা মেয়ে, ভেবেছিল পাঞ্জাবি পরা সায়েব! ওটা হবে পকাতা। না না পকাতা নয়, পতাকা, শতকি নয় শকতি। আরে লাইনটা তো তুমি বহুবার শুনেছ, তোমার পকাতা, না দাঁড়াও, ধরে ধরে বলি, তোমার পতাকা…।
আমার ভয়ংকর তাড়া! পরে শুনব।
আমারও অনেক কাজ; তবে কী জানো, বিপ্লবী ছিলুম তো, তাই নিজের স্বার্থে দিয়া বলি পরের স্বার্থে ছুটি। এখন আবার মহাপ্রভু ঘাড় ধরেছেন। নিজের কাজ করিয়ে নিচ্ছেন। নাম প্রচার। ঘুমন্ত মানুষের কানে ঢেলে দাও মধুর হরি নাম। উঃ, গায়ে কাঁটা দেয়। মহাপ্রভু স্বপ্ন দিলেন, ওরে যা, তাপিত আর্তজনে নাম বিতরণ কর। আর ঘুমায়ো না মন। মায়াঘরে কত দিন আর রবে অচেতন। কে তুমি কী হেতু এলে, আপনারে ভুলে গেলে। দেখো রে নয়ন মেলে অরুণ তপন। নিজেকে ভুলে যেয়ো না পিন্টু। সব আন্ডিল বান্ডিল বেঁধে প্রভুর শ্রীচরণে নিবেদন করে দাও। বাই এনি চান্স, তোমার কাছে গোটাদশেক টাকা হবে? জানোই তো আমার দিন চলে মাধুকরী করে।
এক টাকা আছে।
ঠিক আছে, নাইন শর্ট। নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল। আলু কিনে বাড়ি যাই; কিন্তু মেয়েমানুষটি কে ছিল? সাক্ষাৎ বৈষ্ণবী। ওই নাক, ওই কপাল। রসকলি করলে রস যা জমত! হঠাৎ আত্মহত্যা করল কেন? গর্ভবতী হয়েছিল নাকি?
আবার আমার মনে হল, সেদিনের মতো মারি এক থাপ্পড়। লোকটা যেন বজ্জাতের জিলিপি। নিজেকে যথেষ্ট সংযত করে বাড়িতে ঢুলুম। গোটা বাড়ির পরিবেশ থমকে গেছে। মৃত্যুর গন্ধ। সিঁড়ির প্রথম ধাপে মুকু বসে আছে। গালে হাত। কাজের মেয়েটি বলছে, একেই ভূতের বাড়ি, আরও একটা ভূত বেড়ে গেল। রাতের বেলা সব থাকবে কী করে! আমার তো এখনই গা ছমছম করছে। পুজোটুজো দাও। তোমাদের বাড়িতে গ্রহ লেগে গেছে।
মুকুর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করল না। পাশ দিয়ে সোজা উঠে এলুম ওপরে। দেড় হাজার টাকা নিয়ে এখনই আমাকে থানায় ছুটতে হবে। আলমারিতে কাপড়ের ভাঁজে আমার ব্যাগ আছে। সেই ব্যাগে আছে টাকা। আলমারি খুলে যথাস্থানে হাত বাড়াতেই ব্যাগটা পেয়ে গেলুম। চামড়ার ব্যাগ। সোনালি মনোগ্রাম, এইচ এস। হরিশঙ্কর। ব্যাগটার একটা ইতিহাস আছে। আমার জ্যাঠামশাই কোনও এক কালে আমার পিতাকে উপহার দিয়েছিলেন। তিনি আবার উপহার দিয়েছিলেন আমাকে। কারণ তার ব্যাগের কোনও প্রয়োজন হত না। তিনি টাকা রাখতেন খামে। সোনার হাতঘড়ি খাপেই থাকত। কখনও হাতঘড়ি পরতেন না, কারণ বিলাসিতা।
ব্যাগটা খুলেই চক্ষু স্থির। একটাও টাকা নেই। সব হাওয়া। পাগলের মতো আলমারি হাঁটকাতে লাগলুম। নিমেষে সব ওলটপালট। আমার স্পষ্ট মনে আছে ব্যাগে আমার সব জমানো টাকা অত্যন্ত সাবধানে রেখেছিলুম। আলমারির চাবি খোলা কেন? খোলা থাকার তো কথা নয়। অদ্ভুত একটা শূন্যতা নেমে এল। সব ঝিমঝিম করছে। আমার নিজেরই আত্মহত্যা করার ইচ্ছে হচ্ছে।
আলমারির সমস্ত মাল মেঝেতে ছড়িয়ে ফেলেছি। কোথায় কী? টাকার নামগন্ধ নেই। মুকু এল গম্ভীর মুখে। বিমর্ষ গলায় প্রশ্ন করল, কী খুঁজছ অমন লন্ডভন্ড করে?
আমার টাকা। এই ব্যাগে আমার পাঁচ হাজার টাকা ছিল। ব্যাগ খালি।
তার মানে?
তার মানে ব্যাগে টাকা নেই। আলমারি যদুর জানি চাবি দেওয়া ছিল, এখন দেখছি চাবি খোলা।
মুকু মেঝেতে বসে পড়ে বললে, আমি তখনই জানতুম, চিল যখন পড়েছে কুটো না নিয়ে উড়বে না।
আলমারির তালা ভেঙে টাকা নিয়ে হাওয়া।
কী হবে এখন? থানায় যে দেড় হাজার টাকা দিতে হবে!
আমার কাছে ঠিক দেড় হাজার টাকাই আছে, নিয়ে যাও। দিয়ে এসো খেসারত।
নীচে নেমে এলুম। কাজের মেয়েটি বললে, দেখুন তো এটা কোনও দরকারি কাগজ কি?
এক টুকরো কাগজ। একটা ক্যাশমেমোর পেছন দিক। পরিষ্কার লেখা, পিন্টু, চলে যাওয়াই ভাল। তবে পৃথিবীর কোথাও নয়, একেবারে পৃথিবীর বাইরে। যে-হারটা নিয়ে এত সমস্যা, সেটা আমারই। আমার মামার বাড়ির বহুমূল্য চন্দ্রহার। আমার দিদিমা গোপনে আমাকেই দিয়ে গিয়েছিলেন। এতকাল বুকে করে আগলে রেখেছিলুম। শেষ পর্যন্ত পেরেছি। গগন ওইটার সন্ধানেই এসেছিল। ময়দার তালের মধ্যে ঢুকিয়ে গগনকে বোকা বানিয়েছিলুম। আর যাই হোক আমি চোর নই। পিন্টু, ওই হারটা তোমার বিয়ের সময় মুকুর গলায় পরিয়ে দিয়ে। তোমার হতভাগিনী গরিব দিদির উপহার। আমাকে মনে রেখো না। আমার জন্যে দুঃখ কোরো না। পৃথিবীতে আমরা এইভাবেই আসি, যাই। তোমার দিদি।
স্বার্থপরতার কী খোলতাই রূপ! কোথায় অসহায় এক মহিলার প্রতি অবিচারের জন্যে মর্মাহত হব, তা না, মনে হল হাতে স্বর্গ পেয়েছি। এই তো সেই আত্মহত্যার চিঠি। অপূর্ব ওই হারটার জন্যে মনে লোভও জেগেছিল। এখন সেইটা বুঝতে পারছি, যাক পুলিশের হেফাজত থেকে হারটা আমাদের হাতে এসে যাবে এই এক চিঠির জোরে। তিরবেগে থানার দিকে দৌড়োলুম। যেতে যেতে ভাবলুম, দেড় হাজার টাকাও তত বাঁচানো যায়। সঙ্গে সঙ্গে পাঁচ হাজারের শোক ভুলে গেলুম।
