হাতে হাঁড়ি দেখে পিতা উল্লাসে চিৎকার করে উঠলেন, এসেছে এসেছে। পেরেছে পেরেছে। আপনার ঈশ্বর পরাজিত হয়েছেন বিনয়দা। মেসোমশাই মুখ তুলে তাকালেন। সহজে হারতে চান না। মৃদু হেসে বললেন, বিচার হবে শেষের সে দিনে, যেদিন আমরা মৃত্যুর মুখোমুখি হব। মৃত্যু একটা ন্যাচারাল প্রসেস। ওখানে ঈশ্বর নেই। আছে কাল। ইজ থেকে ওয়াজ।
Under the wide and starry sky,
Dig the grave and let me lie.
Glad did I live and gladly die,
And I laid me down with a will.
জলের বিম্ব জলেতে মিলায় অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত মরতে মরতে একেবারে মরণটারে মারত ॥
ব্যস! মেসোমশাই কুপোকাত। ইংরেজি, বাংলা, সংস্কৃত সব একেবারে পাঞ্চ করে ছেড়েছেন। ভোলাময়রা আর হরুঠাকুরের ধুন্ধুমার লড়াই। ভুরভুরে ঘিয়ের গন্ধ নাকে আসছে। মুকু চেয়ারে নেই। রান্নাঘরে গেছে দিদিকে সাহায্য করতে। হঠাৎ মাতামহকে মনে পড়ল। এই মুহূর্তে কী করছেন কে জানে? বাগানের একপাশে নারকেল গাছের তলায় ছোট্ট একানে ঘর। বিশাল এক সিন্দুক। একটু পরেই আমরা লুচি খাব। তিনি কী খেলেন? মাতুলের সংসারের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। অভিমানে দূরে সরে আছেন। কিছু প্রশ্ন করলেই হা হা হাসি, গৃহীভুত্বা বনী ভবেৎ, বার্ধক্যে মুনিবৃত্তীনাম।
মুকু গোটাকতক আসন হাতে বড়ঘরে ঢুকল। হলঘরই বলা চলে। শুনেছি একসময় এই ঘরে বড় বড় আসর বসত। রাত ভোর হয়ে যেত গানে গানে। বড় বড় সব ওস্তাদ আসতেন। মাতুল তখন কিশোর। সেই কিশোর বয়সেই তাক লাগিয়ে দিতেন। মুকু হাতের ইশারায় ডাকল।
সেই সন্ধে থেকে এক নাগাড়ে পড়ে পড়ে চোখদুটো ফুলে উঠেছে। কোন দিকে মুখ করে খেতে বসতে হয় জানো?
দক্ষিণ ছাড়া, যে-কোনও দিকেই মুখ করে বসা যায়। দাও আমি পেতে দিচ্ছি। মুকু তিনটে আসন এনেছে। দুটো আসন পেতে দিলুম।
তোমারটা পাতলে না?
আমি পরে তোমাদের সঙ্গে একসঙ্গে বসব।
খেতে বসে পিতৃদেব নানা ফ্যাচাং বের করেন। কনক সামলাতে পারবে না। তা ছাড়া অপরিচিত মেসোমশাইয়ের সামনে বসে তারই মেয়ের ভেজে ভেজে দেওয়া ফুলকো লুচি খেতে লজ্জায় মরে যাব। রান্নাঘরে উনুনের আগুনের আভায় কনককে একেবারে বউমার মতো দেখাচ্ছে। ওবেলা একটু আড়ষ্ট ছিল। এবেলা সব পুরোমাত্রায় দখলে এসে গেছে। মাঝে মাঝে ডিক্টেটারের মতো মুকুকে হুকুম চালাচ্ছে।
একটা নকল কাশি দূর থেকে এগিয়ে আসছে। পিতা আসছেন। কনকের একেবারে পেছনে পঁড়িয়ে সিঁথি দেখছিলুম। কেন দেখছিলুম তা বলতে পারব না। ভাল লাগছিল। সম্মানজনক দূরত্বে সরে গেলুম। যতই শিশুর মতো নিষ্পাপ মুখ করি না কেন, পিতার চক্ষুবীক্ষণে মনের ফেঁসো ধরা পড়বেই। মন রে তুই শোয়াপোকা।
তালতলার চটি পটাস পটাস শব্দ করছে। কনকের কিছু দূরে এসে শব্দ থেমে গেল। পিড়েতে পেছন ঠেকিয়ে কনক বসে আছে উবু হয়ে। ইয়া এক খোঁপা ঘাড়ের কাছে লটকে আছে। সামনে অ্যালুমিনিয়ামের কড়ায় আধা-ঘিয়ে লুচি ফুলছে ফোঁস করে।
পিতা তারিফ করলেন, বাঃ বেশ ফুলছে। একেবারে নিখুঁত, নিটোল হয়ে। আচ্ছা এবার তুমি ওঠো। তোমার কাজ শেষ। এবার আমাদের শুরু।
কনক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল, তার মানে?
তার মানে, তোমরা এইবার খেতে বসবে, আমরা পিতাপুত্রে পরিবেশন করব।
এ আবার কোন দেশি নিয়ম!
তোমরা অতিথি। অতিথিসেবার পর গৃহস্থ আহারে বসবে, এই হল নিয়ম।
নিয়ম শাস্ত্রেই থাক। আপনারা খেতে বসুন। মেয়েলি শাস্ত্র আলাদা।
কনক কথা বলছে আর লুচি ভেজে চলেছে। মেসোমশাইকে বেশ কায়দায় ফেলে দিয়েছে। মেয়েরা কেমন সহজেই শাসক হতে পারে! ভয়ডর কিছুই নেই। সাধে পরের বাড়ি গিয়ে সহজে আঁকিয়ে বসে? ছুঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরোয়।
পিতা বললেন, কথা তা হলে শুনবে না!
না, মেসোমশাইয়ের বাড়িতে এসেছি। অতিথিফতিতি আবার কী? যদ্দিন আছি, এ মহলে আপনার প্রবেশ নিষেধ।
ঠ্যাং করে কড়াতে ঝুঁজরিতে একটা শব্দ হল। পিতার চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টি। বহু দূর থেকে যেন তাকিয়ে আছেন। দীর্ঘ জলযাত্রার পর নাবিক যে-দৃষ্টিতে তমাল তটরেখার দিকে তাকিয়ে থাকে। স্থির অচঞ্চল। চটির শব্দ ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল। এ কি জয়? এ কি পরাজয়? পরাজয় মাঝে মাঝে ভাল।
কনক এবার আমার দিকে তাকাল। একটা চোখ আধ-বোজা। কড়ার ভাপ এসে লাগছে। এ এক মারাত্মক চাহুনি। একে আমার একটু কবিকবি ভাব। থেকে থেকে আকাশে কালিদাসকে দেখি। ছাদে উঠে ডানা মেলে উড়ে যেতে চাই। বিরহী যক্ষের মতো জানলা দিয়ে উত্তরের শ্যামবৃক্ষরাজির দিকে তাকিয়ে থাকি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তার দিকে এমন ধারালো মুখ যদি আধ-বোজা চোখে তাকায়, তা হলে কী হয়? নাও ভেসে যায় নদীর জলে।
কনক বললে, তুমি বসছ না কেন?
আমার কি লুচি চলবে?
ওমা সেকী কথা!
দেখলে না, সকালের খাদ্য।
তোমার তো পেট সেরে গেছে।
অত্যাচারে যদি বেড়ে যায়?
ঘোড়ার ডিম হবে। গরম লুচিতে পেট ভাল হয়।
তা হলে, তোমাদের সঙ্গে বসব।
রাত হয়েছে বেশ। তোমার খিদে পায়নি?
না না, খিদে পাবে কেন?
খিদে পেয়ে পেয়ে মরে মরে এখন আর খিদে কাকে বলে ভুলেই গেছি। কনক তো আর জীবনের সব ঘটনা জানে না। মরা গাছে ফল শুকিয়ে পাকে। রং থাকে স্বাদ থাকে না।
মুকু পরিবেশন করছে। শাড়ির আঁচল ঝুলে ঝুলে পড়ছিল। মেসোমশাই বললেন, কতদিন বলেছি, আঁচল কোমরে জড়াবে।
