সিগারেটের ধোঁয়ায় পাক মারছে দারোগামশাইয়ের প্রশ্ন।
কাকাবাবু বললেন, তা হলে আপনি কী সন্দেহ করছেন?
সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরোটা মেঝেতে ফেলে দিয়ে, ঠোঁট ছুঁচোলো করে ধোয়া ছেড়ে অফিসার বললেন, বিশ্রী রকমের একটা সন্দেহ। ইট মে বি এ কেস অফ মার্ডার। আগে মেরেছে তারপর ঝুলিয়েছে।
কে মেরেছে? কাকাবাবুর প্রশ্ন।
সেটা তো আপনারাই বলবেন।
কেন, পোস্টমর্টেম বলতে পারবে না?
তা অবশ্য পারবে। অপেক্ষা করে বসে থাকতে হবে। সেই সন্ধে পর্যন্ত। জটটা আমাদেরই ছাড়ানো উচিত, তা হলে আর ইনভেস্টিগেশন কী হল! ভাবছি আর একবার যাই ঘটনাস্থলে।
কাকাবাবু হাসতে হাসতে বললেন, সেই পাঁচ! পুলিশি প্যাঁচ মারছেন! ভুলে গেলেন আমাদের সম্পর্ক!
দারোগামশাই ফিক করে হেসে বললেন, আইনের সঙ্গে মানুষের একটাই সম্পর্ক, বিচার অথবা অবিচার? আমি যদি অবিচার করি, পাঁচজনে বলবে ব্যাটা ঘুষখোর! পাঁচ হাজার পকেটে পুরে, নিজে খেয়ে অন্যকে খাইয়ে, খুনকে আত্মহত্যা বলে চালাচ্ছে। পাবলিকও কিছু অন্যায় করবে না, এইরকমই তো হচ্ছে আজকাল। আর এ পাড়ার পাবলিক তো একজন, মেনি মুখার্জি। এই এল বলে, মুখে জরদা-পান ঠুসে!
কাকাবাবু বললেন, আর বলতে হবে না, একেবারে পরিষ্কার হয়ে গেছে। তবে পাঁচ হাজার পারব না, দেড় হাজার। দেড় একটা ভাল সংখ্যা। সবসময় এককে ঘিরে থাকবেন। একে চন্দ্র! আমি আমার ভাইপোকে বলছি, এখুনি নিয়ে আসছে।
আপনি বুদ্ধিমান মানুষ। ধরেছেন ঠিক। যে-দেবতার যে-নৈবেদ্য! দেড় খুবই কম। কেস তো সিরিয়াস! অনেককেই খিলাতে-পিলাতে হবে। যাই হোক আপনাকে কী আর বলব! আপনি গুণী মানুষ!
কাকাবাবু থানার বাইরে এসে আমাকে খুব আস্তে আস্তে বললেন, বাড়িতে ক্যাশ কিছু আছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ, হাজার পাঁচেক আছে।
যাও একটা খামে ভরে দেড় নিয়ে এসো। যেমন কর্ম তেমন ফল। এবার তোমার একটু সাবধান হবার সময় এসেছে। আর ওই মেয়েটির খপ্পর থেকে বেরিয়ে এসো। ও তোমার জীবনের রাহু, গ্রাস করে বসে আছে। সংসার তোমার হবে না বাপু। একমাত্র সন্ন্যাস, সন্ন্যাসই তোমার পথ। গতানুগতিক জীবন তোমার নয়। তোমার কোষ্ঠী আমার মুখস্থ। যাও টাকাটা তুমি নিয়ে এসো। দারোগাকে ততক্ষণ আমি একটু মালিশ করি।
বাড়ির সামনে থেকে ভিড় সরে গেলেও, মেনিদা ঠিক ঘুরঘুর করছেন। চোখ-মুখ যেন পুরুষ্টু লাল একটি লঙ্কার মতো। চনমন চনমন করছেন। মানুষের সর্বনাশে মহা উল্লসিত! আমি যখন চাকরি পেলুম, মেনিদা তখন বিষ্টুদার দোকানে চা খেতে খেতে বলেছিলেন, চাকরি পেলে কী হবে, মাইনে পাবে না। এ পাড়ায় কেউ পরীক্ষা দিলে মেনিদা তার জীবন অতিষ্ঠ করে তোলেন, কী হে। তোমার রেজাল্ট কবে বেরোবে! কেউ পাশ করেছে শুনলে ভীষণ দুঃখ পান। কারও অসুখ করেছে শুনলে, দু’বেলা দেখতে ছোটেন! পরিবার পরিজনকে নানাভাবে ভয় পাইয়ে দিয়ে আসেন। ইদানীং এক ভণ্ডামি ধরেছেন, ভোরবেলা একটা খঞ্জনি হাতে নগর-পরিক্রমায় বেরোন। খাই খাঁচা শব্দে আর মিনমিনে গলার মিলনে সে এক অপূর্ব মহানাম। ভালভাবে উচ্চারণ করারও ক্ষমতা নেই। হরে। কৃষ্ণ, হরে রাম হয়ে দাঁড়ায়, হচে কৃষ্ণ, হচে রাম। ঈশ্বরের কী মহিমা! হরে উচ্চারণ করলে যে উদ্ধার পেয়ে যাবেন। নাকের ওপর পাউডারের তিলক-সেবা। পাউডার আর সাবু একসঙ্গে ফেটিয়ে ওই শিল্পকর্মটি করেন। এক রাউন্ড মেরে এসেই তেলেভাজার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েন। গনগনে উনুন। কড়ায় টইটম্বুর তেল। গোল গোল ফুলুরি সাঁতার কাটছে। সামনে মেনিদা আর ভোলা ষাঁড়। দোকানির নাম নিত্যানন্দ। মেনিদা তেল মারছেন, নিত্যানন্দ প্রেম বিলোতে। এসেছিলেন। তুমি এসেছ ভক্তজনকে প্রেমসে তেলেভাজা বিলোতে। নিত্যানন্দ প্রথমে ষাঁড়কে একটি বেগুনি খাওয়াবে, পরে মেনিদাকে দুটি ফুলুরি শালপাতায় মুড়ে দেবে। সেটিকে কপালে ঠেকিয়ে মেনিদা মিনমিনে গলায় বলবেন, জয় রাধে!
আমাকে দেখে মেনিদা এগিয়ে আসতে আসতে বললেন, স্কোয়ার আপ স্কোয়ার আপ। সব শত্রুতা ভুলে যাও। জানবে, ইউনাইটেড উই স্ট্যান্ড, ডিভাইডেড উই ফল। শ্ৰদ্ধানন্দ পার্কে মহামতি গোখলে অগ্নিযুগে আমাদের বলেছিলেন। আমরা তখন দেশের স্বাধীনতার জন্যে আলুপটলের মতো প্রাণ দিচ্ছি। সংসার টংসার সব চুলোয় গেছে। টেগার্টকে টার্গেট করে আমরা তখন ছাতা মাথায় ঘুরছি। জামার পকেটে রিভলভার। গলায় গুলির মালা। শ্রীরঙ্গমে যাই। এক এক দিন এক এক মেকআপ। লালবাজারের সামনে ঘুরি। কাওয়ার্ড। সায়েব ভয়ে আর বেরোয় না। এর নাম ইংরেজের বাচ্চা! সাহস থাকে বুক পেতে দে রিভলভারের সামনে। আমরাও ছদ্মবেশে, সে ব্যাটাও। ছদ্মবেশে। একদিন দেখি বোরখা পরে বেরিয়ে আসছে। ধরেছিলুম ঠিকই, ভেরিফাই করতে গিয়ে পালাল। ভেরিফাই করতে গেলুম কেন জানো, ক্ষুদিরামের কে যেন না হয়ে যায়– বড়লাটকে। মারতে গিয়ে মারলাম ইংলন্ডবাসী। সত্যিই যদি মুসলমান রমণী হয় তা হলে তো কম্যুনাল রায়ট বেধে যাবে! বিপ্লবের পথ বড় কঠিন পথ! তা ওই মেয়েমানুষটি কে?
গা আমার জ্বলে যাচ্ছিল। ভদ্রলোক আমার পিতার ভাষায় ক্রিস্টালাইজড ইডিয়েট। তবু ভদ্রতার খাতিরে উত্তর দিতে হল, এই তো আপনিই বললেন, বোরখা-পরা টেগার্ট।
আরে ধুর! মেনিদা কাকতাড়ুয়ার মতো নেচে উঠলেন, আরে আমি অতীত থেকে বর্তমানে চলে এসেছি, গলায় দড়িটা কে? তোমাদের বাড়িতে তো আগে দেখিনি কখনও।
