র্যাশন কার্ড থাকবে কী করে? এ বাড়িতে তো সবে এসেছিল।
একটা ঠিকানা, কিছু আত্মীয়স্বজন থাকলে জিনিসটার চেহারা অন্যরকম হত। কিছুটা রিস্ক থেকে যাবেই। যাক সে কী আর করা যাবে! লাশ নামিয়ে এনে পোস্টমর্টেমে ঠেলে দিই। হাপিস করে দোব?
হাপিস কাকে বলে?
একেবারে হাওয়া। আনক্লেমড বডি।
দিদির মুখ ভেসে উঠল চোখের সামনে। পাঁচিলের মাথার ওপর দিয়ে উঁকি মারা লতার দুটো কচি পাতার মতো। নিষ্ঠুর পৃথিবীকে দেখতে চাইছে ভীরু মুখে। একটু বাঁচতে চাই। একটু রোদের ছোঁয়া। আমি ফুল হব, আমি ফল হব। আমি সংসার করব, ভালবাসব, ভালবাসা পাব। আমার। একটা অর্থ থাকবে। আমার একটা মূল্য থাকবে। আমি আলোর অভিসারী। দিদির ধারালো মুখ দেখতে পাচ্ছি। সুরেলা কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি। দিদির এই আত্মহত্যার পশ্চাৎপটেও গভীর একটা রহস্য আছে, আমি ধরতে পারছি না। আর যাই হোক অজ্ঞাত মৃতদেহ হিসেবে গাদায় ফেলে দেবে, তারপর কঙ্কাল করে বেচে দেবে ডাক্তারির ছাত্রর কাছে, এ আমি চাই না। মৃত্যু আমারও হবে– আজ হোক, কি চল্লিশ বছর পরে হোক। আমার মৃত্যু আমাকে তখন ক্ষমা করবে না। আচমকা গলা দিয়ে প্রতিবাদ বেরিয়ে এল, না, না, তা কেন করবেন, যতই হোক আমার দিদি তো!
দারোগাসায়েব মুচকি হেসে বললেন, এই হল হিন্দু। কিছুতেই সংস্কার ছাড়তে পারে না। বেশ ঠিক আছে। আমি লাশ নামিয়ে পোস্টমর্টেমে পাঠাচ্ছি। সন্ধেবেলা আপনারা ডেলিভারি নিয়ে আসবেন। এক মুহূর্ত বিরতি। নিমেষে চলে গেলেন জ্যোতিষে, আচ্ছা কোনও স্টোন ধারণ করলে পারিবারিক অশান্তি কমা, কি কুইক প্রমোশন, এইসব হতে পারে?
কেন পারে না? কাকাবাবু আবার খেলাতে লাগলেন, জেম থেরাপিতে কিছু কাজ অবশ্যই হয়। তবে দেখেশুনে, কোষ্ঠীবিচার করে পাথর দিতে হবে। আপনার কোষ্ঠী আছে?
শুধু কোষ্ঠী, গাছ কোষ্ঠী। আপনার আজ সময় হবে?
এই যে এক ফ্যাচাং। সারাটা দিন তো এইতেই যাবে। তা না হলে আজ দিন তো ভালই ছিল।
আপনাদের কিছু করতে হবে না। সব আমি করিয়ে দিচ্ছি। এই থানা থেকেই বডি পাইয়ে দোব। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। আজ আপনি আমার গেস্ট। কী পছন্দ করেন চিকেন না মাটন?
আমি তান্ত্রিক, মাটনই আমার পথ্য।
আমরা সদলে বেরিয়ে এলুম থানা থেকে। কানে লেগে রইল একটি প্রশ্ন, চিকেন না মাটন। পৃথিবী বেলাভূমির মতো, জীবনের ঢেউয়ে মৃত্যুর পদচিহ্ন মুছে যেতে এক লহমা সময় লাগে। গত সন্ধ্যায় দিদি লুচি ভাজার আয়োজন করছিলেন। ময়ান দেওয়া ময়দার তাল এখনও পড়ে আছে ডেকচি চাপা। কড়ায় পড়ে আছে শুকনো আলুর দম। পেটের খিদে, মনের খিদে, খিদে নিয়েই চির বিদায়। পৃথিবীর যতেক মানুষের খিদে কিন্তু রয়েই গেল। এঁরা কী করে চিকেন-মাটনের কথা ভাবছেন!
পুলিশ-পুলিশ করে সারাপাড়া ভেঙে পড়ল। যাঁরা বাজারে যাচ্ছিলেন তাঁরা থমকে গেলেন। কাজের মহিলারা ময়লা আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বাড়ি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। ট্র্যাক থেকে খইনির পুরিয়া বের করে নীচের দাঁত আর ঠোঁটের মাঝখানে পুরে পিচ পিচ করে থুতু ফেলতে লাগল। চারিদিকে দন্ত্য স-এর ছড়াছড়ি। শাড়ি আর তেলচিটে খোঁপা আর বিনুনির মেটেমেটে গন্ধ। বারান্দায় বারান্দায় বউ আর লুঙ্গি-পরা কর্তাদের ঝুঁকে থাকা ঝুল মূর্তি। কারও কারও মুখে সিগারেট। গবেষণার অন্ত নেই। ইতিহাস নিয়ে নাড়াচাড়া। এ পাড়ায় কবে কে আত্মহত্যা করেছিল। সেই মেনিদার খ্যানখ্যানে গলা।
দারোগাসায়েব ঘটনাস্থলে ঢুকেই জাত-দারোগা হয়ে গেলেন। ঝুলে থাকা দিদির দেহটাকে যৎপরোনাস্তি পর্যবেক্ষণ করলেন। যে-অংশে আগুনের ঝলসানি সেই অংশটা দেখলেন। মেঝে থেকে হারটা তুলে নিয়ে বললেন, এর দাম অনেক।
কাকাবাবু বললেন, ওটার যা হয় একটা ব্যবস্থা করবেন। দেখবেন মালিক যেন ফিরে পায়।
এরই ফাঁকে একবার বাইরে বেরিয়ে গিয়ে জমায়েতকে ধমকধামক লাগিয়ে এলেন। পুলিশের। কালো গাড়ি চেপে দিদি চলে গেলেন কাটাই-ঘেঁড়াই হতে। আমরা দুজনে আবার থানায়। পাড়া। থেমে পড়েছিল আবার চালু হয়ে গেল। উত্তেজনা থিতিয়ে গেল।
থানায় আমাদের একটা স্টেটমেন্ট লিখে সই করতে হল। যা জানি, যা ঘটেছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। এক মহিলার চকিত জীবনকাহিনি। গগনচন্দ্রের চেহারার বর্ণনা। সব জমা পড়ে গেল। মহাফেজখানায়। দিদির সেই পোঁটলা পড়ে আছে একপাশে। হারের সঙ্গে আমাদের দু’জনের সই করা একটা স্টেটমেন্টও জমা পড়ল।
কাকাবাবু সবশেষে জিজ্ঞেস করলেন, এরপর কী ধরনের ঝামেলা আসতে পারে?
দারোগাসায়েব ঠোঁটে সিগারেট খুঁজতে খুঁজতে বললেন, পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা। প্রবলেম হল ওই পুড়ে যাওয়াটা। মনে হতে পারে প্রথমে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা হয়েছিল, তারপর ঝোলানো হয়েছে। এখন ঝুলোতে গেলে একটা কিছুর ওপর উঠতে হয়। সেরকম কিছু কি ছিল ঘরে? খেয়াল করতে পারছি না তো। ছিল কি?
আমরা তিনজনে পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে বসে রইলুম। সিগারেটের ধোঁয়া রোদের রেখায় পাক মারছে ছিন্নমস্তার ধূমল চুলের মতো। দাঁড়িয়ে আছেন সেকেন্ড অফিসার। হাতের তালুতে ব্যাটন ঠুকছেন।
২.২১ সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে
আঠারো ঘায়ের এক ঘা। কীসের ওপর দাঁড়িয়ে দিদি গলায় ফাঁস আটকেছিল? এই সন্দেহ তুলে দারোগামশাই জোরে জোরে সিগারেট টানতে লাগলেন। ওটা নাকি একটা ইম্পর্টান্ট পয়েন্ট। একটা টুল, একটা চেয়ার, যা হয় একটা উঁচু কিছু থাকা উচিত ছিল ঘরে। নেই কেন?
