কাকাবাবু আবার গুম। অবশেষে বললেন, আঃ, আচ্ছা একটা দাবার চাল চেলে গেছে। একেবারে কিস্তিমাতের চাল। তা হলে থাক। যেখানে পড়ে আছে সেইখানেই পড়ে থাক হারটা। আচ্ছা তাই বা কেন? হারের সন্ধান পুলিশ পাবে কী করে?
সহজেই পাবে কাকাবাবু। যাঁদের হার তারা থানায় ডায়েরি করবেন। পুলিশ অনুসন্ধানে বেরোবে। গন্ধে গন্ধে চলে আসবে এখানে। তখন কেস আরও জটিল হবে।
তোমার মাথা দেখছি আমার চেয়ে অনেক সাফ। হরিশঙ্করদার মাথা। চলো, যা হয়েছে তাই বলব, তারপর যা হবার তাই হবে। কেমন? সাহস আছে তো?
আপনি সঙ্গে আছেন আর আমি ভয় পাই না।
.
থানার বড় দারোগামশাই কোমরে বেল্ট বাঁধছিলেন। সব দারোগার মতোই, এঁরও ভুড়ি সমস্যা। এতটাই স্বাধীনতা পেয়ে এসেছে, যে এই মুহূর্তে আর শাসনে আসতে চাইছে না কিছুতেই। এত দুষ্টের দমন করেন, নিজের মধ্যপ্রদেশকে দমন করতে পারছেন না কিছুতেই। বেল্ট বাঁধা হলে তিনি আসনে বসবেন। তিনিও দাঁড়িয়ে, আমরাও দাঁড়িয়ে, একজন হাবিলদারও দাঁড়িয়ে। সময়ও যেন দাঁড়িয়ে পড়েছে। রিভলভারটা টেবিলের ওপর। তার পাশেই শুয়ে আছে তেলচুকচুকে ব্যাটন।
পেছনের একটা জানলা খোলা। জানলার ওপাশে পাঁচিল। পাঁচিলের মাথায় স্বর্ণগোধিকার মতো একফালি রোদ। পাঁচিলের ওপিঠ থেকে ছোট্ট একটা লতা সবে তার দুটি পাতাকে জাগাতে পেরেছে, যেন গোপনে চুমু খাচ্ছে রোদ। কড়ির পাশে কোমল। অতি কষ্টে প্রথম ফুটোয় বেল্ট বেঁধে দারোগাসায়েব চেয়ারে বসে ভুরু কুঁচকে আমাদের দিকে তাকালেন। কাকাবাবুর শালপ্রাংশু চেহারা টেবিলে ছায়া ফেলেছে। কর্কশতম গলায় বললেন, কী চাই?
কাকাবাবু সামান্যতম ঘাবড়ে না গিয়ে বললেন, আপনার সাহায্য।
কে মরেছে?
কী করে বুঝলেন?
আরে মশাই এই সময় গলায় দড়ি দিয়েই তো সব আসে। এত বছর দারোগাগিরি করছি কী কারণে? এইটুকুই যদি না বুঝব! ঠিকানা বলুন।
কাকাবাবু খুব নরম গলায় বললেন, আপনার অদ্ভুত ক্ষমতা। এমন আমি দেখিনি কোথাও।
দারোগাসায়েব গম্ভীর গলায় বললেন, বসুন।
পুবের জানলা দিয়ে এক চিলতে রোদ চোরের মতো ঢুকেছে। টেবিলের তলায় অন্ধকার খুঁজতে এসেছে। শেষ শত্ৰুটিকেও আর আস্ত রাখবে না।
কাকাবাবু সবিনয়ে বললেন, আপনার যদি মন ভাল থাকে তা হলে সামান্য কিছু নিবেদন করতে চাই।
দারোগাবাবু বুক চিতিয়ে বললেন, আমি ঘুষ নিই না, এমনকী একটা চালকুমড়োও না।
আমি কিন্তু ঘুষ নিবেদন করতে চাইনি। এপাশে বসে আপনার হাতের যতটুকু আমি দেখেছি, আঙুল, বুড়ো আঙুল, নখ, তাতে আমি বুঝেছি, আপনি আধ্যাত্মিক জগতের মানুষ। সেন্ট পারসেন্ট স্পিরিচুয়াল। বৃহস্পতি তুঙ্গী, মঙ্গল ক্ষেত্রী। কেবল একটাই সমস্যা মাথায় আঘাত লাগতে পারে।
লাগতে পারে কী মশাই, লেগে গেছে একবার। আবার লাগবে?
ওইটাই তো আপনার উইক পয়েন্ট। আর ওই পয়েন্ট থেকেই স্ত্রীর সঙ্গে অবনিবনা। ওইটাই আপনার জীবনের একটা কার্স। সংসারে ঢোকার আগে আমার সঙ্গে পরামর্শ করলে আমি আপনার রাইট পার্টনার সিলেক্ট করে দিতুম। আপনার স্ত্রীর বৃহস্পতিও প্রবল। প্রবলে প্রবলে একটু বেশি বলাবলি হয়ে যায়। তবে স্ত্রীভাগ্যেই আপনার জীবনের উন্নতি।
দারোগামশাই কেমন যেন হা হয়ে গেছেন। চোখদুটো স্থির পটলের মতো।
কাকাবাবু কোনওরকম দয়ামায়া না করে একটা বম্বশেল ছাড়লেন, আপনার দ্বিতীয়বার বিবাহ। হবে এবং আপনার জীবন তখন মহাসুখে ভরপুর হবে।
দারোগামশাই হাবিলদারের দিকে তাকিয়ে বললেন, অ্যায় তুমি বাইরে যাও।
তিনি সঙ্গে সঙ্গে স্যালুট করে বেরিয়ে গেলেন। ভদ্রলোক কাকাবাবুর দিকে একটু ঝুঁকে এসে বললেন, এসব আপনি বলছেন কী করে? সেন্ট পারসেন্ট মিলে যাচ্ছে!
কাকাবাবু হাতির দাঁতের মতো হেসে বললেন, আমার গুরু হলেন তারাখেপা। সবই তার কৃপা, তারই শক্তি। আর যৎসামান্য জ্যোতিষী।
আপনি আমার হাত দেখছেন কী করে? আমি তো টেবিলের এপাশে?
যা বলছি সব আপনার হাতের এ পিঠ, এপারে বসে দেখে বলছি। ও পিঠে আরও কী আছে কে জানে? তারপর বাঁ হাত! বাঁ হাতে আছে আপনার প্রারব্ধ, যা নিয়ে এসেছেন। জানেন তো মানুষ নিয়ে এসে দিয়ে যায়। কীরকম জানেন, একজন সেলসম্যান, হাতে ফোলিও ব্যাগ, এসেছে। একে একে সব বের করে হাতে হাতে তুলে দিচ্ছে। এই নাও সাহিত্য, এই নাও সংগীত, এই নাও চিত্রকলা, আচ্ছা এই নাও সেবা, পরোপকার, এই নাও ভালবাসা, এই নাও সাধনা, আবার, এই নাও নিষ্ঠুরতা, অত্যাচার, হত্যা। ব্যাগ থেকে সব একে একে নামিয়ে রাখছে। এই হল মানুষের জীবনের কাঠামো। জ্যোতিষীর সঙ্গে সাধনা, আধ্যাত্মিকতা যুক্ত না হলে মানুষকে স্টাডি করা যায় না। গুরু কৃপায় আমি শতকরা নব্বই ভাগ মেলাতে পারি। কিন্তু আমার কোনও গর্ব নেই।
দারোগাসাহেব একেবারে অভিভূত। আরও খানিকটা ঝুঁকে পড়ে বললেন, চলুন না আমার কোয়ার্টারে, কিছুক্ষণ হয়ে যাক। আমার বউয়ের হাতটাও একবার দেখবেন।
নিশ্চয় দেখব, দ্যাটস মাই প্লেজার। শুধু আমাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার করে দিন। বড় । সমস্যায় পড়ে গেছি। মানসম্মান নিয়ে টানাটানি। কেসটা মন দিয়ে শুনুন।
অফকোর্স অফকোর্স। দাঁড়ান চা আনাই আগে।
পুলিশের হুকুম, সে যেন মাথায় ছাত ভেঙে পড়ল। যেন চা নয়, হাবিলদারকে তিনটে মুণ্ডু কেটে আনতে বললেন। চা এসে গেল। কাকাবাবু একটু একটু করে সব বললেন। স্তরে স্তরে। সব শুনে দারোগাসায়েব বললেন, র্যাশন কার্ড ছিল?
