এই মুহূর্তে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া না করে সমস্যার সমাধানে লাগাই উচিত। মাথা ঠান্ডা রাখো।
উপদেশটা নিজেকেই দাও।
আমার মাথা খুবই ঠান্ডা। সবার আগে হারটা সরাও।
তাতে লাভ! পরে হারটা যখন আমাদের কাছ থেকে বেরোবে তখন কী হবে? হাজতে? যেখানে যা আছে ঠিক সেইরকমই থাক। চালাকি করে লাভ নেই। এতদিন তোমার কথায় চলেছে, এইবার আমার কথায় চলুক। আমি একটা গাড়ি ধরে সুরঞ্জনাদের বাড়ি যাই। সুরঞ্জনার বাবার সাহায্য এখন কাজে আসবে। পুলিশের ওপরমহলের মানুষ।
দেরি হয়ে যাবে। তুমি বরং তোমার বিষ্টুদার সাহায্য নাও। পুলিশকে জানাতে যত দেরি করবে, ততই তাদের সন্দেহ বাড়বে।
পুলিশ যখন এসে দেখবে কোনও সুইসাইডাল নোট নেই, দেহের কিছুটা অংশ পোড়া, সামনে পড়ে আছে দামি একটা হার, তখন কেসটা কোন দিকে যাবে তুমি জানো?
যে-দিকেই যাক, জানাতে তো হবেই।
অভিজ্ঞ মানুষের পরামর্শ নিয়ে জানাব। সেইটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
তুমি চলে গেলে আমি একা থাকব নাকি? এখুনি তো কাজের মেয়েটি আসবে।
মুকুর কথা শেষ হতে না-হতেই সদরের কড়া নড়ে উঠল। দু’জনেই ভয়ে কাঠ। সর্বনাশ করেছে। এখন কী হবে! যে বাসন মাজে সে এসেছে। এখুনি সারা পাড়ায় রাষ্ট্র হয়ে যাবে। কাতারে কাতারে লোক ছুটে আসবে গলায় দড়ি দেখতে। এর চেয়ে দর্শনীয় আর কী আছে!
মুকু বললে, আমি দরজা বন্ধ করে রাখছি, তুমি কোনওরকমে ওকে ভাগাও।
দরজা খুলেই অবাক হয়ে গেলুম, সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন অক্ষয় কাকাবাবু। জীবন্ত স্তম্ভের মতো। পাঞ্জাবির ঝুল প্রায় হাঁটু পর্যন্ত। পরিষ্কার ধুতি। পায়ে চপ্পল। কাঁধে একটা গেরুয়া সাইড ব্যাগ। মনে হল, হাতে স্বর্গ পেলুম। পিতার সর্বাধিক প্রিয় বন্ধু পিতার মতোই। যেন হরিশঙ্করই ফিরে এলেন। ভেতরে প্রবেশ করতে করতে বললেন, অনেক দিন তোমাদের কোনও খবর নিতে পারিনি। তোমাকে একদিন অবশ্য ট্রামে দেখলুম মাথা নিচু করে একটি মেয়ের পাশে বসে আছ। বুঝলুম আমাকে অ্যাভয়েড করতে চাইছ, তাই আর বিরক্ত করলুম না।
অক্ষয় কাকাবাবুকে প্রণাম করে যখন উঠে দাঁড়ালুম তখন আমার দু’চোখে জল। তিনি তার বিশাল চওড়া বুকে আমার মাথাটা টেনে নিয়ে বললেন, কীসের এত দুঃখ? সময় কি সবসময় সমান যায়! কখনও ভাল, কখনও খারাপ। নীলকণ্ঠের সেই গানের মতো, শ্যামাপদে আশ, নদীর তীরে বাস, কখন কী যে ঘটে ভেবে হই মা সারা। এক কূল নদী ভাঙে নিরবধি আবার অন্য কূলে আকুলে সাজায়। খবর আমি পেয়েছি, হরিদা চলে গেছেন। কোথায় গেছেন, সেইটাই হল প্রশ্ন।
কাকাবাবু, তার চেয়ে বড় সমস্যা, এই মুহূর্তে ঘরে একটা ডেডবডি ঝুলছে।
সেকী? এ তোমার কোনও হেঁয়ালি নয় তো!
না কাকাবাবু, আপনি জানেন না, কী ঘোর সংকটের মুহূর্তে আপনি এসেছেন! ঈশ্বর আপনাকে পাঠিয়েছেন।
কাকাবাবু ওপরে উঠতে উঠতে সংক্ষেপে সব শুনলেন। একটাই মন্তব্য করলেন, অজ্ঞাত কুলশীল কারওকে আশ্রয়ে রাখার আগে একটু খোঁজখবর নেওয়ার দরকার ছিল পিন্টু। তুমি যাকে কখনও দেখোনি, যার ঠিকানাও তুমি জানো না, তাকে সোজা বলে দিলেই পারতে, আমার বাবা নেই, আপনি পরে আসবেন।
দোতলার বারান্দার রেলিং-এ হাত রেখে কাকাবাবু গুম মেরে দাঁড়ালেন। একমুখ কাঁচাপাকা দাড়ি। সেকালের কোনও মুনি যেন একালে ছাড়া পেয়েছেন। মুকু এসে প্রণাম করল। আমার খুব অদ্ভুত লাগছে, সময় যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। দিদির মৃত্যু নয়, সময়ের মৃত্যু হয়েছে। প্রাণহীন ঘটনা ঘটে চলেছে। কাকাবাবুর আসা, মুকুর প্রণাম, কথাবার্তা, জল্পনা কল্পনা, সবই যেন স্থিরচিত্র।
কাকাবাবুকে সামান্য ধরিয়ে দিতে হল মুকুর পরিচয়। মৃদু হাসলেন। মৃতের হাসির মতো। আমরা সকলেই মরে গেছি যেন। দম নেই। আগের বেগেই চাকা ঘুরছে।
কাকাবাবু ঘরে এসে পিতার চেয়ারে বসলেন। হরিশঙ্করের মতোই এক ব্যক্তিত্ব। হাতের আঙুলগুলো বিশাল বিশাল। তর্জনী তুলে আছেন, মনে হচ্ছে সমস্ত ঘটনা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে পরবর্তী আদেশের অপেক্ষায়। টেবিলে একটা টোকা মেরে বললেন, আমার প্ল্যান রেডি। কোনও লুকোছাপা নয়, সোজা থানায় গিয়ে আমরা অফিসারকে বলব, মশাই এই এই ব্যাপার। তুমি বলবে আমার বিধবা দিদি আত্মহত্যা করেছে। কারণ একটাই– ছেলের অত্যাচার।
কাকাবাবু, ছেলের কথা বললেই প্রশ্ন হবে ছেলে কোথায়? আমরা তো তার ঠিকানা জানি না। কাকাবাবু। বাবা জানলেও জানতে পারতেন।
সেই প্রশ্নেরও উত্তর আছে। বাউন্ডুলে ছেলে, কখনও আসে, কখনও হারিয়ে যায়।
পুলিশ যখন পাড়ার লোককে প্রশ্ন করবেন তারা তো বলবে, এই মহিলা এখানে থাকতেন না। এই কয়েক দিন হল দেখছি। পুলিশ আসামাত্রই শয়ে শয়ে লোক এসে জুটবে। তখন কী হবে। তা ছাড়া পিঠের দিকে ওই আগুনে পোড়া। পুলিশ যদি বলে, এটা আত্মহত্যা নয়, খুন!
কাকাবাবু নিজের কপালে তিনবার আঙুলের টোকা মেরে বললেন, উঃ, কী কঠিন সমস্যা। এ যে দেখি ডাঙায় বাঘ, জলে কুমির। এগোলেও নির্বংশের ব্যাটা, পেছোলেও নির্বংশের ব্যাটা। ঠিক আছে, দেখাই যাক না কী হয়! জলে নেমেই দেখা যাক। সমস্যা আসুক তারপর দেখা যাবে। চলো, থানায় যাই।
কাকাবাবু, ওই চোরাই হারটা?
পড়ে থাক। অথবা ওটাকে আবার ময়দার তালেই ঢুকিয়ে দেওয়া যাক।
সেটা কি ঠিক হবে? দ্বিতীয়বার যখন পুলিশ আসবে হারের খোঁজে, তখন এই আত্মহত্যাটা হয়ে দাঁড়াবে খুন। আমি আর মুকু হারের লোভে মহিলাকে খুন করেছি। তখন সোজা হাজতে।
