আমি জানি না। আপনার সামনে সাপের মতো ওই যে জিনিসটা পড়ে আছে, সাপের চোখের মতো আলো ঠিকরোচ্ছে, ওটা আমাদের কোথায় নিয়ে যেতে পারে জানেন? হাজতে ওইটার জন্যে এখানকার আমাদের তিন পুরুষের বাস উঠে যেতে পারে। কেন, কেন আপনি আমাদের জেনেশুনে এই বিপদের মধ্যে টেনে আনলেন? আমাদের পরিবার আপনার কী ক্ষতি করেছিল?
একেবারেই কোনও ক্ষতি করেনি তা বলি কেমন করে! এই পরিবারেরই এক পুরুষ আমার মাকে বিয়ে করেছিলেন। আমার মাকে ছেড়ে তিনি স্ফুর্তি করতে গিয়েছিলেন অন্য মেয়েছেলের সঙ্গে। হয়ে গেলেন পাগল। একবারও ভাবলেন না, তার ছেলেমেয়েদের কী হবে! তোমারই পরিবারের অন্যান্যরা আমার মাকে গুমোরে, ঠেকারে বলে বাড়ি ছাড়া করলেন। তারপর? তারই তো সব পরপর, পরপর হয়ে গেল। এক থেকে আর এক। নিজেদের অত নিরপরাধ ভাবছ কেন পলাশ? তুমি কতটুকুই বা জানে! তোমাদের পরিবারের ভারী সুন্দর একটা গুণ, বিপদ দেখলেই সরে পড়া। যেমন আগুন দেখেই তুমি এক লাফে ঘর ছেড়ে পালালে। তোমাদের ধরন হল, যা শত্রু পরের পরের।
আপনি একটা অন্যায়কে আর একটা অন্যায় দিয়ে ঢাকতে চাইছেন। জেনে রাখুন, আপাতত মুকু যা বলেছে তাই হবে। অন্যরকম হবার উপায় নেই।
আমি আমার ঘরে চলে এলুম। মাথা দিয়ে আগুন ছুটছে। পেছন দিকটা আগুনে যার ঝলসে গেছে, সে কেমন করে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে কোথাও একটা যাবে? সেই কোথাওটা কোথায়? দিদি একটা কথাও ভুল বলেনি। অপ্রিয় সত্য। সহ্য করা শক্ত। সত্য এইরকমই। প্রখর আলোর মতো। বোধহয় একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলুম। যত দুশ্চিন্তাই থাক, ঘুমের প্রলেপ পড়বেই। প্রচণ্ড এক ঠেলায় ঘুম ভেঙে গেল। মুকু ডাকছে, শিগগির ওঠো, শিগগির ওঠো, সর্বনাশ হয়ে গেছে।
জানলায় দুলছে ভোরের পরদা। পাখির ডাকের অভ্রখণ্ড বসান। এমন একটা গোলাপি শুরুতেই সর্বনাশ! এত সর্বনাশের পরেও সর্বনাশ। ধড়মড় করে উঠে বসলুম ঘোর লাগা চোখে। কোথায় এতক্ষণ পড়ে ছিলুম তাও জানি না। জানলার ধার। তক্তপোশ। ভোরের ভিজে বাতাস।
আবার কী সাশ হল মুকু? যা হবার তা তো হয়েই গেছে।
মুকু হঠাৎ আমাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে লাগল। রুদ্ধ গলায় বললে, দিদি চলে গেছে।
তুমি তো তাই চেয়েছিলে, এখন আবার কাঁদছ কেন?
মুকু ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললে, আমি তো বাড়ি ছেড়ে যেতে বলেছিলুম, দিদি যে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে।
সেকী? সে আবার কী?
দিদি গলায় শাড়ির ফাঁস লাগিয়ে নীচের ঘরে ঝুলছে। আমারই সিল্কের শাড়ি।
সেকী?
আমার শরীর পাথরের মতো হয়ে গেল। অদ্ভুত একটা ধাক্কা। বজ্রের মতো। একই সঙ্গে একরাশ চিন্তা মাথায় খেলে গেল। সেই থানা পুলিশ। সেই পাড়ার লোক জড়ো হয়ে যাওয়া। ছি ছি, ধিক্কার। উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করলুম। কাঁপতে কাঁপতে পড়ে গেলুম। গৃহদেবতা হরিশঙ্কর চলে গেছেন। মাথার ওপরের ছাদ ধসে গেছে। দুর্যোগ থেকে বাঁচার রাস্তা নেই। বাঁচাবারও কেউ নেই। যা ঘৃণা করতুম, তাই ঘটছে একের পর এক।
২.২০ One learns to know oneself best
সেই বহুমূল্য হারটা মেঝেতেই পড়ে আছে অবহেলিত। প্রাণহীন দেহ মাটি থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে ঝুলছে। কোনও এক রন্ধ্রপথে সকালের বাতাস ঢুকছে, দেহটা অল্প অল্প দুলছে। অভাবনীয় দৃশ্য। ঘণ্টা কয়েক আগেও মানুষটা ছিল। বাঁচতে চেয়েছিল করুণভাবে। জীবনকে কে আর স্বেচ্ছায় ফুরোতে চায়। আমি আর মুকু চলে যাবার পর, আমাদের ঘৃণা নিয়ে বসে ছিল বহুক্ষণ। অবশেষে। এই সহজ সিদ্ধান্ত। আবার কোথায় কোন অনিশ্চিত জায়গায় যাওয়া যায়, তার চেয়ে একেবারেই চলে যাই। অনেক খেলাই তো হল, আর কী হবে! আর সে তো কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার! দেহের খাঁচা খুলে জীবন-পাখির উড়ে যেতে কতটুকুই বা সময় লাগে!
কে খুনি?
খুন তো বটেই। কিন্তু কে? আমাদের তিন জনের মধ্যে কে খুনি? আমি, মুকু, গগন? না চতুর্থ আর একজন কেউ? যে আমার দিদির অতীতকে তাড়া করে ফিরছে অলক্ষে বসে, তার এজেন্টের মাধ্যমে। আগুন দেখে যে লাফিয়ে ঘরের বাইরে চলে গিয়েছিল তার এই সাহস দেখে নিজেই অবাক। সামনে দু’হাত দূরে দিদির দেহ ঝুলছে। অল্প অল্প পাক খাচ্ছে। মুখটা সামান্য বিকৃত। চোখদুটো ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। তবু আমার ভয় করছে না। আমি ভাবতে পারছি। স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ভাবনা। এরপর কী হবে! কীভাবে পার পাওয়া যাবে আইনের হাত থেকে। এখন তো ডবল ফ্যাকড়া বেরোল। এক, চোরাই মাল, দুই, আত্মহত্যা। বুকের কাছে মাঝে মাঝেই কী একটা দলামতো ঠেলে উঠছে। আমার জমাট কান্না। একটা পুঁটলি, কয়েকখানা আটপৌরে কাপড়, দু-একটা ব্লাউজ, ছোট্ট একটা গীতা, এই সামান্য সম্বল ফেলে, জীবনের খেলা শেষ করে চিরতরে চলে গেল সংগ্রামী এক জীবন। এই দেখেই গাইতে ইচ্ছে করে, ঊ্যা করে জন্মে আমি কী পেলাম!
মুকু দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে স্তব্ধ হয়ে। খুব কঠিন হতে গিয়েছিল। পাপ পুণ্যের বিচারক। কেমন শিক্ষা দিয়ে গেলেন মহিলা। এইবার ঠেলা সামলাও। দেখাও তোমার তেজ। আঁচলে চোখ মুছে মুকু বললে, তা হলে তো থানায় যেতে হয়।
তা তো হয়ই। তুমি যাও। সারাপাড়া এইবার ভেঙে পড়ুক। অপমানের একশেষ। আমার পক্ষে আর কিছুই সম্ভব নয়। তোমার হাত ধরে চলতে গিয়ে আমার পতন হল খানায়।
