দোতলার ঘরে মুকু ততক্ষণে পোঁটলা খুলে সব জিনিস ছড়িয়ে ফেলেছে। কী-ই বা আছে সম্বল! কিছুই তেমন নেই। আমি গিয়ে দাঁড়াতেই বললে, কী হল? আমার হিসেবে তো কোনও ভুল হবার কথা নয়। তা হলে?
আমি ভয়ে ভয়ে বললুম, তা হলে কী মুকু! তুমি কী পাবে ভেবেছিলে?
চোরাই মাল।
চোরাই মাল মানে?
মানে খুবই সহজ। চুরি করে আনা মাল।
সে আবার কী?
মুকু রেগে গেল, থেকে থেকে সে আবার কী সে আবার কী কোরো না তো!
মুকু এক লহমার জন্যে অন্যমনস্ক হয়ে তিরবেগে রান্নাঘরের দিকে ছুটল। আমিও অনুসরণ করলুম। মুকু ঘরে ঢুকেই ডেকচিটা উলটে ফেলল। থালার ওপর বিশাল একতাল ময়দা। সেই ময়দার তালের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিল। কিছুক্ষণ। মুকু আনন্দে চিৎকার করে উঠল, ইউরেকা!
আর্কিমিডিসের পর এই বোধহয় আর একবার উল্লাসের চিৎকার। ইউরেকা। কী পেয়েছে? কিছু একটা বেরিয়ে আসছে তালের ভেতর থেকে।
মুকু বললে, দেখে যাও।
পাশে গিয়ে বসলুম। পাথর সেট করা একটা হার বেরিয়ে এল। হারটায় কত যে পাথর! কত রকমের পাথর! ময়দা লেগে আছে জায়গায় জায়গায়। তবু মনে হচ্ছে বহুমূল্য। কোনও রানি-মহারানির গলায় ছিল। মুকু বললে, জলের ঘটিটা নিয়ে এসো।
ঘটির জলে একবার ডোবাতেই রূপ বেরিয়ে পড়ল। পাথরের কী ঝিলিক!
মুকু বললে, এই চারটে হিরে। তিনটে দামি রুবি। এই দেখো, এইগুলো পোখরাজ। লাখখানেক টাকা দাম কি তারও বেশি। ব্যাপারটা এইবার বুঝলে, মোটা মাথা? রান্নাঘরে ঢুকে হুলুস্থুলুসের কারণটা। আমরা হঠাৎ এসে পড়ায় তোমার ওই দিদি মালটা ময়দার তালের ভেতর ঢুকিয়েছিল।
মালটা এল কোথা থেকে?
বুঝতে পারলে না! মালটা গগন চোর কোথা থেকে হাতিয়ে এনেছিল। জানত এইখানে কিছুকাল চেপে রাখতে পারলে পুলিশ কোনও সন্ধান পাবে না। তারপর পাচার করে দেবে ঠিকমতো জায়গায়। ওই কারণেই গগন রান্নাঘর থেকে বেরোতে চাইছিল না। হ্যাঁচড়ামো করছিল।
ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। আওয়াজ বেরোচ্ছে না। চোরাই মাল রাখার অপরাধে জেলে যেতে হবে। বরাতে এইটাই বাকি ছিল। কোনওরকমে জিজ্ঞেস করলুম, এখন কী হবে মুকু?
কী আবার? পুলিশ আসবে, তোমার কোমরে দড়ি দিয়ে নিয়ে যাবে।
জিনিসটাকে হাতে নিয়ে দু-চারবার চোখের সামনে ঘুরিয়ে মুকু বললে, তাকে ডেকে আনো নীচে থেকে। মাল আর মালের জিম্মাদার দুটোকেই বিদেয় করতে হবে এখান থেকে। এখুনি, এই মুহূর্তে।
বার্তাবাহক চলল নীচে। নীচের দালানের রকে বসে আছেন মহিলা। প্রেতিনীর মতো আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন। বেশ কঠিন গলায় বলার চেষ্টা করলুম, এ আপনি কী করলেন? কান্না এসে গেল। কারওকে অসহায় দেখলে মনে হয়, সে আমি। আমিই সেই অসহায় মানুষ। আমিই সেই ভুক্তভোগী। পৃথিবীটা কেন যে এমন বিশ্রী রকমের জটিল! কেন জানিনা, কেবলই মনে হচ্ছে, ওই কাজ এই মহিলার নয়। আর যাই হোক, আমাদের বংশের মেয়ে চোরের দলে ঢুকতে পারে না। পরিস্থিতির শিকার।
অতি কষ্টে বললুম, ওপরে আসুন।
দিদি পায়ে পায়ে অপরাধী শিশুর মতো দোতলার ঘরের দরজার আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালেন। নিপাপ মুখে অপরাধের ছায়া নেই, আছে ভয়। মুকুর গর্জন শোনা গেল, এটা কী? ভেতরে এসো। এসে বলো এটা কার, এল কোথা থেকে?
দিদি ঘরে ঢুকে মেঝের ওপর ধপাস করে বসে পড়ে বললেন, সত্যি বলছি আমি কিছুই জানি না। আমার জানার কথা নয়।
এটা চোরাই মাল।
হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে।
এটা চোরাই মাল।
বেশ, তাই না হয় হল।
এখন কী হবে? থানা-পুলিশ কে সামলাবে?
এতে থানা-পুলিশ আসছে কোথা থেকে?
খুব সহজেই আসছে। কাল না হয় পরশু। তখন কী হবে?
দিদি পালটা প্রশ্ন করলেন, কী হবে তখন?
তখন হবার আগেই এখন হবে। এখন রাত তিনটে প্রায়। এই মহামূল্য চোরাই মাল নিজের পোঁটলায় পুরে সোজা দক্ষিণমুখো হাঁটা দাও। ওই দিকেই যমের দক্ষিণ দুয়ার। আর তোমার কোনও ন্যাকা ন্যাকা কথা শুনতে আমি রাজি নই। এই মুহূর্তে তুমি এই বাড়ি ছেড়ে বিদেয় হয়ে যাবে। তোমার ওই পাপমুখ আমি দেখতে চাই না।
দিদি অসহায় মুখে আমার দিকে তাকালেন। আমিও সমান অসহায়। সম্রাজ্ঞী মুকুর মুখের ওপর কথা বলার সাহস আমার নেই। মুকুর যুক্তি আর তর্কের সামনে আমি দাঁড়াতে পারি না। হরিশঙ্করের চেয়েও প্রখর।
দিদি বললেন, এই গভীর রাতে আমি যাই কোথা! আমাকে তো ছিঁড়ে খাবে। আমার একটা অনুরোধ তুমি রাখো। ভোর হলেই আমি চলে যাব!
আমি বললুম, সেই ভাল। আর তো কিছুক্ষণ!
মুকু গুম মেরে রইল। কী ভাবল কে জানে! সময় যেন থম মেরে গেছে। অবশেষে বললে, বেশ, ঠিক আছে, তাই হোক। সূর্যোদয়ের আগে, পাড়া জেগে ওঠার আগে, তুমি ঠিক যেভাবে এসেছিলে সেইভাবেই ফিরে যাবে। কোথায় যাবে আমার জানার দরকার নেই।
সেই বহুমূল্য গয়নাটি মেঝেতে ফেলে দিয়ে মুকু উঠে গেল। আমিও চলে যেতে চেয়েছিলুম, দিদি আমার হাতটা চেপে ধরলেন, পলাশ, এ বাড়ি তো তোমার? আমি তো তোমার আশ্রয়েই এসেছিলুম ভাই! তুমিও কি আমাকে তাড়াতে চাও? আমার শরীরের পেছন দিকের অবস্থাটা কি একবার দেখেছ? আমার জ্বর এসে গেছে।
আমি কী করব? আপনি নিজের পাপেই ভুগছেন।
যদি বলি, পাপ আমি করিনি। পাপই আমার ঘাড়ে এসে চেপেছে। পেছন পেছন ফিরছে তাড়া করে। কার দোষ? দোষ আমার না দোষ তাদের? কার বিচার হবে? সেই ভাগনে, সেই ভাগনের বুড়ো মামা, আমার মা, সেই ফাদার, সেই পুরোহিতমশাই, সেই থানার বড়দারোগা, সেই কোল্ডস্টোরের মালিক, সেই নেতা, সেই স্কুলমাস্টার, হুগলি আদালতের সেই উকিল, এদের, এদের বিচার হবে না ভাই?
