বিচার তো আপনারই হওয়া উচিত। মা পথে পথে ঘুরছেন, আপনি নেকটাই চড়িয়ে বেড়াচ্ছেন!
আমি অনুরোধ করেছি, হয়নি। প্রায়শ্চিত্ত করবেন। পাপের প্রায়শ্চিত্ত। আমার আর কিছু করার নেই। আমার কাজ আমি করে গেলুম।
বারেবারে কাজ বলছেন, কাজটা কী?
সত্য প্রকাশ। ছায়ার মতো আমি অনুসরণ করব।
মুকু বললে, এটাও আপনার অভিনয়। আসলে আপনি একটা পাকা চোর। আর এই মহিলাটি আপনার এক শাগরেদ। আপনি আমাদের ঘরের আলমারির তালা ভেঙেছেন। কায়দা করে লক খুলেছেন। জিনিসপত্র হাঁটকেছেন। গয়নাগাটি পাননি কিছুই। আমরা খুবই লজ্জিত। এমন কিছু ঘটতে পারে জেনেই লকারে দিয়ে এসেছি। অতি চালাকের গলায় দড়ি। আপনি আজ আসেননি, এসেছেন কাল রাতে। কাপড়ে আগুন লাগিয়ে সিগন্যাল দিয়েছিলেন, আমি এসে গেছি, গেট রেডি। এই মহিলাকে নিয়েই পালাতেন। বিধি বাম। কাপড়ে সত্যিই আগুন লেগে গেল।
মুকুর কথা শেষ হবার আগেই, সেই জোচ্চর রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। মুকু আমাকে ঝাজিয়ে। উঠল, হা করে দেখছ কী? ছুটে গিয়ে ধরো। ব্যাগটা সার্চ করতে হবে।
আর ধরো। বহু দূরে ছুটে চলেছে এক ছায়ামূর্তি। একটু আগেই যে বলছিল, তোমরা মানুষ চিনতে ভুল করেছ। সত্যিই মানুষ চেনা অতিশয় কঠিন। সিঁড়ির একপাশে প্রায় বিবসনা এক রমণী স্থাণু হয়ে আছেন। পাথরের মূর্তি। এখন আর আমার তাকাতে লজ্জা করছে না। মহিলা আমার দিদি নয়। হয়তো বিগত-যৌবনা দেহব্যবসায়ী। কোনও রাগ নয়, আমার দুঃখে বুক ফেটে যাচ্ছে। কী লজ্জা! যাচাই করার উপায় নেই, হয়তো সম্পর্কে দিদি। তুলসীদাসজি, আপনাকে প্রণাম। সেই দোহাঃ উদর ভরণকে কারণে, প্রাণী ন করতয়ি লাজ। নাচে বাঁচে রণ ভিরৈ, বাঁচে ন কাজ অকাজ ॥ পেটের জন্যে সব লাজলজ্জা বিসর্জন দিতে হয় মানুষকে, কেউ সভায় নাচছে, কেউ উত্তাল সমুদ্রে নৌকোর বাইচ খেলছে, কারও শরীরে বল নেই তবু যুদ্ধে যাচ্ছে। পেট। সব পেট। কাজের বাছবিচার নেই।
মুকু সিঁড়ির শেষ ধাপে দু’হাতে মাথা চেপে বসে পড়ে বিশাল এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, আর কতভাবে পরীক্ষা করতে চান আপনি? আর কতভাবে?
দিদি মুকুর পায়ের কাছে বসে পড়লেন। হাঁটুদুটো ধরে বললেন, বিশ্বাস করো ভাই, ও কিছু নিতে পারেনি। চেষ্টা করেছিল। পায়নি কিছুই।
সোনার জরি বসানো মাসিমার বেনারসি?
সন্ধান পায়নি।
এ আপনার সেই ভাগনের ছেলে?
অনেকটা তাই।
অনেকটা আবার কী? জানেন, আমি যদি থানায় যাই কী হবে?
আমাকে ধরে নিয়ে যাবে ভাই। অত্যাচার করবে। পুরনো জীবন থেকে আমি আর বেরোতে পারব না। আমি যেখানে যাচ্ছি সেখানেই পেছন পেছন তেড়ে আসছে আমার পাপ। আমি কী করি? যাই কোথা?
আমাদের কাছে চাপা দেবার চেষ্টা না করে, প্রথম থেকেই বলতে পারতেন। আপনি কি জানেন না, সত্যকে চাপা দেওয়া যায় না!
আমি যে ফিরতে চাই। আমি ফিরে আসতে চাই সুস্থ জীবনে। সংসারে। রান্নাঘর, ঠাকুরঘর, মন্দির, মেলা, রুগির বিছানার পাশে। আমাকে তুমি একটু সাহায্য করো ভাই। যা জোর করে আমার ঘাড়ে চাপানো হয়েছ, তার থেকে আমাকে আমার মুক্তির পথ বলে দাও। তুমি পারো, একমাত্র তুমিই পারো।
মুকুর হাঁটুতে মাথা রাখলেন দিদি। আমার মনে হচ্ছিল, এক ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিই। আমাদের বংশের কলঙ্ক। যা শুনেছিলুম ছেলেবেলায় তা ঠিকই, বড় জ্যাঠাইমার চরিত্রে অনেক ছিদ্র ছিল। সেই ছিদ্রেরই একটি ফসল এই মেয়ে। বিষ-জারুলের গাছে কি আর অমৃত ফল ধরে!
মুকুর ব্যবহারে কোনও ঘৃণা নেই, ক্রোধ নেই, হতাশা থাকতে পারে। দিদির মাথার পেছন দিকে হাত রেখে মুকু বললে, আমি কী করতে পারি দিদি! আপনি যা করে এসেছেন, তার ফল তো ভোগ করতেই হবে। পাপ ভূমিসে ভারী। পৃথিবীর চেয়ে ভারী মানুষের পাপ। আপনি তো পড়ে আছেন অতীতের খপ্পরে। এখন কী হবে! আমার মাথায় তো কিছু আসছে না!
হঠাৎ মুকু গা ঝাড়া দিয়ে উঠল। আপন মনেই বললে, তাই তো, এটা তো ভেবে দেখা হয়নি!
মুকু দিদির মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। বেশ বুঝতে পারছি দিদির বেশ অস্বস্তি হচ্ছে। মুকু খপ করে দিদির ডান হাতটা চেপে ধরে বললে, তাই তো বলি, তুমি যাও ডালে ডালে আমি যাই পাতায় পাতায়। চলো ওপরে চলো, আমি তোমার পোঁটলা সার্চ করব।
মুকু বলে কী? পাগল হয়ে গেল নাকি! নিজেকে ভাবে কি সবজান্তা স্বর্গীয় পুরুষ! পুরুষ তো নয়, নারী। পোঁটলা সার্চ করে পাবেটা কী? মাথায় পোকা নড়েছে।
দিদি বললেন, সে আবার কী? গরিব মানুষের পোঁটলায় তুমি পাবেটা কী? তুমি এইভাবে আমাকে অপমান করছ কেন? অভাবে পড়েছি বলে? অসহায় বলে?
অত কথার তো দরকার নেই। আমি দেখতে চাইছি দেখব। তুমি এই জায়গা ছেড়ে এক পা-ও নড়বে না। আমি আগে ওপরে যাব।
অহংকারে তোমার মাথা বিগড়ে গেছে। রূপের অহংকার, শিক্ষার অহংকার, পয়সার অহংকার।
একটু পরেই তোমার মাথা বিগড়োবে।
তারপর মুকু আমার দিকে তাকিয়ে বললে, ও নীচেই থাক। তুমি দোতলায় ওঠার সিঁড়ির দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে ওপরে এসো আমার সঙ্গে। কাণ্ডটা দেখে যাও।
অসহায় সেই মহিলার দিকে একবার ফিরে তাকালুম। আমার চোখে জল এসে গেছে। মানুষের হাতে মানুষের কী অপমান! কেন যে মানুষ এমন করে! মেয়েরাই মেয়েদের এইরকম অপমান করে। ছেলে হলে পারত না। দিদি জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আমি মুখের ওপর সিঁড়ির দরজাটা বন্ধ করে ওপরে উঠে এলুম।
