আমি মোটেই অসহায় নই। আমার কোনও আকর্ষণ নেই। আমি নিজেকে সেইভাবে শিক্ষিত করেছি।
মুকু, আমার সাফ কথা, তুমি চলে গেলে আমি একেবারেই অসহায় হয়ে যাব। তোমার প্ল্যান বাজে প্ল্যান।
আমাকে পরীক্ষা দিতে হবে।
অবশ্যই হবে। তুমি এই বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করো। আমি এই অবসরে কাশ্মীর ঘুরে আসি।
কাশ্মীর? সেখানে কী?
আমার সেই স্বপ্নে দেখা নদী, যার তীরে বসে আছেন তিনি।
তোমার মাথা। স্বপ্ন কখনও সত্য হয় না। নিজের চিন্তাই স্বপ্ন হয়ে দেখা দেয়। সময় আর পয়সার অপচয় হবে।
হোক। তবু আমি স্বপ্নকেই অনুসরণ করব। স্বপ্নকে অনুসরণ করেই মানুষ বাস্তবে পৌঁছোয়। কাল আমার অফিসে গিয়ে প্রথমেই চাকরিটা ছেড়ে দোব। ওঁদের আর ঝুলিয়ে রেখে লাভ নেই। জীবনটাকে অনিশ্চিত না করতে পারলে আমার রোক আসবে না। নিরাশ্রয়, ছন্নছাড়া। তা না হলে আমার আত্মসমর্পণ আসবে না যাকে বলে রেজিগনেশন।
চাকরি ছাড়ার কী কারণ ঘটল?
কারণ একটাই, আমার আর ছুটি পাওনা নেই।
চাকরি ছাড়লে চাকরি পাবে?
আমাদের লাইনে চাকরির অভাব নেই। যত পালটাব তত মাইনে বাড়বে। তোমাকে শুধু একটাই অনুরোধ, আমার সঙ্গে তুমিও চলো।
কেন খরচ বাড়াবে? এ কি তোমার প্রমোদ ভ্রমণ?
তা কেন? আমরা একটা উদ্দেশ্য নিয়েই যাচ্ছি। তবে পেতেও পারি, না-ও পারি। আমরা হরিদ্বার হয়ে ফিরে আসব।
সে তো এক মাসের ধাক্কা। আমার পরীক্ষা? আমার ক্লাস?
বিষয়টা আজ ধামাচাপা থাক। কাল আবার ভাবা যাবে।
যাই ভাবো, কাল এই বাড়ির সদরে তালা পড়বে। অদ্যই শেষ রজনী।
দিদিকে দূর করে দেবে এই অবস্থায়, কোমর পিঠ সব পুড়ে গেছে? দেখলে তো, বিপদ আসার আগে কেমন ইঙ্গিত দিয়েছিল!
মুকুর মুখ একটু গম্ভীর হল। ভাবতে বসল। ঘটনার প্রাথমিক উত্তেজনা কেটে আসছে। মুকু ক্রমশই স্বচ্ছ হচ্ছে। হৃদয় ফিরে আসছে হৃদয়ে। আমি তোমাকে একটা বিকল্প পরামর্শ দিচ্ছি মুকু। তুমি পনেরোটা দিন এই বাড়ির দায়িত্ব নাও, একটু কষ্ট করো, আমি কাশ্মীর থেকে ঘুরে আসি।
মুকু একটা কিছু বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ দড়াম করে সদর দরজার খিলটা খুলে পড়ে যাবার শব্দে বাড়ি কেঁপে গেল।
» ২.১৯ Come let us ask life
আমরা হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে এলুম ঘর থেকে। চোরে সদর দরজার খিল খুলেছে। তড়বড়িয়ে মুকু এগোচ্ছে নীচে নামার সিঁড়ির দিকে। ভয়ে আমার গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছে না। চোর শব্দটা শুনলেই মানুষের গলা বসে যাবে। যাবেই যাবে। চোর যেন ফ্যারেঞ্জাইটিস। ফিসফিস শব্দ বেরোল, মুকু, অন্ধকারে একা নেমো না। ওদের হাতে অস্ত্র থাকে।
আমার মুঠোয় ঘুসি আছে। আলোটা জ্বেলে দাও।
আমাদের গলা শুনে দিদি বেরিয়ে এসেছে, কী হল আবার?
শুনতে পাননি, নীচে খিল খুলে পড়ার শব্দ হল?
শব্দ একটা পেলুম বটে। অপেক্ষা করছিলুম, আবার হয় কি না?
মুকু ততক্ষণে নেমে গেছে নীচে। ভেসে এল তার চড়া গলা, কী হচ্ছে? এই এত রাতে খিল খুলে তুমি যাচ্ছ কোথায়? আবার শুরু করলে পাগলামি!
আমরা তরতরিয়ে নেমে এসেছি। সদর হাট খোলা। বাইরে রাত রাস্তা হয়ে পড়ে আছে। আকাশ-চোঁয়ানো নিশুতি আলো। জমাট ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের গগনচন্দ্র। হাতে একটা ব্যাগ। হাত বাড়িয়ে নীচের গলির আলোটা জ্বাললুম। আলোয় গগনকে দেখে চমকে গেলুম। নিখুঁত সায়েবি। পোশাক। চোখে চশমা। চশমা আগে ছিল না। মাঝরাতের ফড়ফড়ে ফড়িং-এর মতো বাতাসে মাথার চুল এলোমেলো। গলায় নেকটাই। আমার প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাবার মতো অবস্থা। আলোয় ওই চেহারা দেখে মুকুও স্তম্ভিত। এ কে? এই সুদর্শন যুবকটি! এ তো সেই একটু আগের আধ-পাগলা গগন নয়। গগন হাসছে। পরিষ্কার বিশুদ্ধ বাংলায় বললে, আমাকে এইবার যেতে হচ্ছে। আমার কাজ শেষ। তোমরা একটা ভুল করেছিলে, বাইরেটা দেখে মানুষের বিচার। আমি এভাঞ্জেলিক্যাল সার্ভিসে আছি। আমি একজন ডি ডি। ডি ডি কী তা নিশ্চয় জানো! ডক্টর অফ ডিভিনিটি। আমাকে সারাপৃথিবী ঘুরে বেড়াতে হয়।
আমি মনে মনে গুটিয়ে গেলেও মুকু সমান তেরিয়া, আপনি আমাদের বোকা বানালেন কেন? কাজ শেষ বলছেন? কী কাজ?
আমার মায়ের সঙ্গে দেখা করা। আজ সাত বছর পরে আমি ডেনমার্ক থেকে ফিরছি।
যাকে মা বলছেন, তিনিই বা কেন আমাদের বোকা বানাতে চাইলেন?
লজ্জায়। নিজের পাপ চাপা দেবার জন্যে। ওই ভদ্রমহিলার আমি জারজ সন্তান। আমার বাবা একজন ড্যানিশ মিশনারি। এই পাপে তিনি বিতাড়িত হয়েছিলেন চার্চ থেকে। তিনি আর নেই। হি ইজ। লং ডেড। আমার এই মা আজও আমাকে স্বীকার করে নিতে পারলেন না। নিজের পাপকে ঘৃণা না করে তিনি ঘৃণা করছেন আমাকে। এখনও সেই এক অভিনয়! যে-সমাজ দেখল না, সেই সমাজকে ভয়। অথচ মনে মনে সন্তানের অধিকার ছাড়তে পারছেন না। পাখা দিয়ে যখন পেটাচ্ছিলেন আমার ভীষণ আনন্দ হচ্ছিল- এই তো আমার মা। যিশুর চেয়ে মা বড়। ওই মুহূর্তে আমি শিশু হয়ে গিয়েছিলুম।
আপনিই বা কেন পাগলের অভিনয় করছিলেন!
তোমরা ছিলে না। আমি এলুম। এই বেশেই এসেছিলুম। আমাকে দেখে মায়ের কোথায় আনন্দ হবে, তিনি ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যান আর কী! তিনি আমার পিতার ঘোস্ট দেখছেন। সেই বিশাল নাক। সেই মুখ। পরিচয় প্রকাশ হয়ে গেলে এই শেষ আশ্রয় যদি চলে যায়। আমি অভিনয়ে রাজি হলুম। পরে আমার মধ্যে একটা বিদ্রোহের ভাব এল। টুথ, সত্য, তাকে কি চাপা যায়! কেন এই অভিনয়! কার জন্যে এই অভিনয়? বোকা রমণী! তোমরা সাক্ষী রইলে। বিচারের ভার রইল তোমাদের ওপর।
