মুকুর ডাক এল, গগন, খাবে তো এদিকে আলোয় এসো।
বিশাল বাটি। দুধে মুড়ি ভিজছে বিজবিজ শব্দে। তার ওপর গোটা চারেক দানাদার। গগনের সত্যিই খিদে পেয়েছিল। হুপুস হাপুস করে খাওয়া শুরু করল।
মুকু বললে, হাত ধুয়ে, বাটি ধুয়ে, সোজা কোথাও গিয়ে শুয়ে পড়বে। শোওয়ার জায়গার অভাব। নেই। অভাব মশারির। একটা চাদর দিচ্ছি, আপাদমস্তক মুড়ি।
মশা আমার কী করবে! তখন চটাস চটাস করছিলুম ইচ্ছে করে, বদমাইশি করে।
আজ রাতে আর কোনও বদমাইশি কোরো না ভাগনে।
গগন লক্ষ্মী ছেলের মতো মাথা নাড়ল। তার দুঠোঁটে দুধ। কোণের দিকে একটা মুড়ি। ডান হাত বাটিতে। কপালের একটা পাশ সুপুরির মতো ফুলে উঠেছে। পাখার বাঁটের নির্দয় প্রহারে। মুকু আমার সঙ্গে ঘরে এসে দরজার ছিটকিনি তুলে দিল।
তোমার সঙ্গে আমার অনেক পরামর্শ আছে।
রাত অনেক হল।
তাতে আমাদের বয়েই গেল। বোসো আমার সামনে।
পেট চোঁচো করছে, দাঁড়াও আগে জল খাই এক গেলাস।
অ্যায়, এইবার শুরু হল তোমার খেলা।
জলযোগ সেরে ফিরে এলুম। মুকু বললে, দরজার ছিটকিনি তুলে দাও। আমাদের এখন ক্লোজড ডোর কনফারেন্স হবে।
বিছানার ওপর বেশ জুত করে বসল মুকু, ষষ্ঠীঠাকরুনের মতো। আমি বসলুম কিছুটা দূরে। যাকে বলে সম্মানজনক দূরত্বে। মুকু উদাস হয়ে কিছুক্ষণ বসে থেকে বললে, এখানকার পাট আপাতত কিছুদিনের মতো ওঠাতে হবে। এইসব অবাঞ্ছিত চরিত্র আমাদের জীবন আর সাধনা একেবারে বরবাদ করে দেবে। মেসোমশাইয়ের এই মন্দির শেষ হয়ে যাবে। এই তীর্থ আমাদের রক্ষা করতে হবে জীবন দিয়ে।
বলো, তোমার পরিকল্পনাটা কী?
কাল সকালে আবার আমি হস্টেলে ফিরে যাব।
নেবে কেন?
অবশ্যই নেবে। এখন সেশন নেই, নতুন মেয়ে আসার সম্ভাবনাও নেই।
আর আমি কী করব?
তুমি একটি বড় তালা ঝুলিয়ে সরে পড়বে কিছুদিনের জন্যে।
কোথায়?
তোমার সামনে তিনটে পথ খোলা আছে। প্রথম পথ, তোমার জীবিকা। সোজা দেরাদুন। বসে থাকলে তোমাকে তো আর কেউ খাওয়াবে না! তোমার জমিদারিও নেই। মেসোমশাইয়ের গচ্ছিত টাকায় মরে গেলেও হাত দেবে না। নিজের রোজগারের ওপর নির্ভর করবে। দ্বিতীয় পথ, তোমাকে আমি ছেড়েই দিলুম, তুমি আশ্রমে চলে যেতে পারো। চেষ্টা করে দেখো সন্ন্যাসী হতে পারো কি না! মনে হয়, পারবে না। মনে হয় কেন, একেবারে সুনিশ্চিত, পারবে না তুমি। আজকের আগুন লাগার ঘটনায় তোমার চরিত্রের পুরো পরিচয় স্পষ্ট। তুমি ভীরু। আত্মকেন্দ্রিক। একেবারে। নীচ ধরনের গৃহী। নিজেরটি ছাড়া তুমি আর কিছু বোঝে না। এই চরিত্রের মানুষ কখনও সন্ন্যাসী হতে পারে না। অসম্ভব। গেরুয়া গেরুয়া খেলা করে। ভেতরে ভোগ বাইরে যোগ। গেরুয়ার। ডেকরেশন। তৃতীয় পথ, তোমার জীবন-মরণের পথ। তুমি এদের নিয়ে এইখানেই পড়ে থাকো। এরাই তোমাকে রান্নাবান্না করে খাওয়াবে। তোমার আধারটাকে নষ্ট করবে। তোমাকে বিয়ে করার মেয়ের অভাব হবে না। মেয়েরা তোমাকে সহজেই বাঁদর নাচ নাচাতে পারবে। তোমার প্রথম ইন্দ্রিয় অতিশয় প্রবল। কী হবে হরিশঙ্করের জন্যে ব্যাকুল হয়ে? প্রায় ভুলেই তো এসেছ। আর মাসখানেকের মধ্যে তিনি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেন। তোমাকে নাকি সুরঞ্জনার দাদার মতো দেখতে! ওখানে টোপ ফেলো, বড়লোক শ্বশুর পাবে। হাতের কাছেও একটা মেয়ে আছে, টিপ। যাই বলো, যতই অস্বীকার করো, ওখানেও তোমার দুর্বলতা। তোমার মতো জামাই পেলে ওরা হাতে স্বর্গ পাবে। মেসোমশাইকে খুঁজে বের করার ধৈর্য, সাহস, ইচ্ছে কোনওটাই তোমার নেই। তোমার সে ব্যাকুলতাই নেই। মৃত্যুর মতো ব্যাপারটাকে তুমি মেনে নিয়েছ। কী করে ভাবলে, তুমি ঈশ্বরের অন্বেষণে বেরোবে! সে যে সহস্র গুণ কঠিন কাজ। এই বিশ্বরচনার কোনখানে তিনি বসে আছেন। কেউ জানে না। সেই অধরাকে তোমার মতো ধৈর্যহারা ধরবে? বামন হয়ে চাঁদে হাত দেবার শখ! জেনে রাখো, আমি সারাজীবন বসে থাকব আমার মেসোমশাইয়ের জন্যে। সারাভারত একা ঘুরে বেড়াবার সাহস আমার আছে। আমি তার পায়ের কাছে বসে, ত্যাগ আর বৈরাগ্যের শিক্ষা নোব। তোমার মতো অর্ধনারীশ্বরদের জীবনসঙ্গিনী হওয়ার চেয়ে ঈশ্বরের গলায় মালা দেওয়াই ভাল। এই আমার শেষ কথা। গুড নাইট।
দমাদ্দম গোলা ছুড়লে দুর্গের যা অবস্থা হয়, আমার সেই অবস্থা। প্রাসাদ প্রাকার বিধ্বস্ত। তবু শেষ চেষ্টা। নিজের ইজ্জতের সওয়াল। হঠাৎ আবিষ্কার করলুম, মেয়েরা যত মারমুখি আর আক্রমণাত্মক হয় ততই তাদের আকর্ষণ বাড়ে। লুকিয়ে লুকিয়ে একটা বই পড়েছিলুম। লেখা ছিল, বিলেতে মানুষ পয়সা খরচ করে মেয়েদের হাতে চাবুক খেতে যায়। তাইতে নাকি ভীষণ আনন্দ!
আমার শেষ চেষ্টা। যে-জাহাজ ডুবছে তাকে ভাসিয়ে রাখতে চাইছে কাপ্তেন। মুকু ছাড়া আমার জীবন অচল, এটুকু বুঝে গেছি। বললুম, মুকু, আগুন আর সাপ মানুষকে দিশাহারা করে। একে বলে প্রিমিটিভ ফিয়ার। স্বীকার করছি, আমি তোমার মতো সাহসী নই। সকলেই সাহসী হয় না। তার মানে এই নয় আমি স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক। আর মেয়েপাগল বললে আমাকে! ওটা পৃথিবীর একটা আদি ব্যাধি। মুনিঋষিরাও নিস্তার পাননি। কোনও পুরুষই পুরোপুরি পুরুষ নয়, কোনও নারীই পুরোপুরি নারী নয়। শাস্ত্র বলছে, মূলে বসে আছেন ভগবান। সৃষ্টিই তার খেলা। খেলাটা তুমি বিজ্ঞান দিয়ে বোঝার চেষ্টা করো। সৃষ্টিকে চালু রাখার জন্যে তিনি কী করলেন? মজা করলেন, দক্ষিণ অঙ্গ পুরুষ বাম অঙ্গ স্ত্রী। একটিতে দুটি, দুটিতে একটি। দু’জনে মিলে ধারণ করেন অনন্ত রূপ। এই কারণে পুরুষের আকর্ষণ নারীতে, নারীর আকর্ষণ পুরুষে স্বাভাবিক। এইটা প্রকৃতির কারসাজি। আমরা অসহায়। তুমিও অসহায়, আমিও অসহায়। পৃথিবীর তাবৎ মানুষ অসহায়। কিছুই করার নেই। পঞ্চভূতের ফাঁদে পড়ে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর কাঁদে।
