তুমি কী বলছ মুকু?
ঠিকই বলছি পিন্টু। তুমি সর্ব অর্থে একটা গবেট।
যাই হোক, আমাদের একটা কর্তব্য আছে। কোথায় শোবে, কী খাবে, দিদির যন্ত্রণা হচ্ছে কি না?
যেখানে খুশি শোবে। বাড়িতে শোয়ার জায়গার অভাব নেই। আর খাওয়া! একদিন উপোস। করলে মানুষ মারা যায় না। ঘড়া ঘড়া জল আছে, তাই খাবে।
শোয়ার জায়গাটা ঠিক করে দিয়ে এসো।
আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার হাত দুটোর কী অবস্থা দেখেছ! আমার গালেও আগুনের আঁচ লেগেছে। তোমার যদি অতই চক্ষুলজ্জা, নিজে গিয়ে বিছানা পেতে শুইয়ে দিয়ে এসো। পদসেবা করতে চাও তো, তাও করে এসো।
আমি গুম মেরে গেলুম। এরপর আর আমার কিছু করা চলে না। যা হয় তোক। আমি পরিস্থিতির কাছে একেবারে বিকিয়ে গেছি ব্যক্তিত্বের অভাবে। কোনও স্বাধীনতাই আমার নেই। এ বলছে ওই করছি, ও বলছে এই করছি। আমিও এক চরিত্রহীন। আমার পিতার ভাষায় ক্রিস্টালাইজড ইডিয়েট। সংসারের বাইরে আশ্রমজীবনই আমার ভাল। আটকে গেছি তো গেছিই। দাঁড়ের চন্দনা। পায়ে রিং লাগানো। সোনার শেকলও শেকল। বিষয়ের কথা ছেড়ে দিলে, লোকে বলে প্রতিযোগিতায় দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই। ঈশ্বরের কথা বললে, বলে ভণ্ড। বিষয়ী লোক দেখলে পালাতে ইচ্ছে করে। সংসারে পঁচিশ বছর হল, সব ফক্কাবাজি। সব অসার। সব দু’দিনের জন্যে। সংসারে আছে কী? আমড়ার অম্বল, খেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু আমড়াতে আছে কী? আঁটি আর চামড়া, খেলে অম্লশূল। কোথাও এতটুকু শান্তি নেই, নির্জনতা নেই। সবাই হটটেম্পার। বন্ধ দরজার বাইরে হঠাৎ খঞ্জনি বেজে উঠল, সঙ্গে হেঁড়ে গলা, হরে কৃষ্ণ, হরে রাম, নিতাই গৌর রাধেশ্যাম। মুকু সঙ্গে সঙ্গে টানটান। মুখ লাল। এইবার কী হয় কে জানে! দু’পালটা গাইতে-না-গাইতেই, ধড়াব্বড় মারের শব্দ। লাঠি দিয়েই পেটাই হচ্ছে। গান থেকে কান্না, মা আর মেরো না। মহাপ্রভু নাম সংকীর্তন করতেন আর কাজি ধোলাই দিত। তুমি কি মা সেই কাজি! বিধর্মী খ্রিশ্চান। আর মেরো না মা। তুমি কি নালিকুল থানার বড় দারোগা? মার থামছে না। হরেক রকম আওয়াজ। বেশ খেলিয়ে মার চলেছে। মুকু ঝড়াক করে উঠে পড়ল। সোজা এগিয়ে গেল দরজার দিকে।
দু’জনেই বেরিয়ে এলুম। ছাতে ওঠার সিঁড়ির ধাপে দু’হাতে মাথা ঢেকে বসে আছে গগন। পাখার হাতল দিয়ে দিদি পেটাচ্ছে। মারে কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। এলোপাথাড়ি চলছে। দিদির পরনে কোনও শাড়ি নেই। সায়া আর ব্লাউজ। দৃশ্যটা হজম করা শক্ত। এলো চুল। মুকু এক ঝটকায় পাখাটা ছিনিয়ে নিল। ছুঁড়ে ফেলে দিল দোতলার বারান্দা থেকে নীচে। পাখাও পাখা মেলে। মুকুর পরবর্তী আক্রমণ হল খঞ্জনির ওপর। একটানে গগনের কোল থেকে সেটা ছিনিয়ে নিয়ে, তারও সেই এক দশা করে দিল। সোজা বাগানে, ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে। আঁচলটা কোমরে ভাল করে জড়িয়ে নিয়ে বললে, এইবার? আর কী কী খেলা তোমরা দেখাতে চাও? সারারাত আমরা জেগে থাকি ক্ষতি নেই, পাড়ার আর পাঁচটা মানুষ একটু ঘুমোবে তো? না তাও তোমরা দেবে না? এটা গ্রাম নয়, শহর! একটু আক্কেল হবার মতো বয়েস হয়েছে।
দিদি একেবারে বিস্মৃত। কী পরে আছেন সে খেয়ালটুকুও নেই। থাকলে এইভাবে কোমরে দু’হাত রেখে দাঁড়াতে পারত না। চোখের সামনে দুটো ছেলে। শরীরের বসন্ত এখনও বিদায় নেয়নি। এখানে আসার আগে যথেষ্ট তোয়াজে ছিলেন বলেই মনে হয়। আমাকে চোখ নামাতে হল। নিজের লজ্জা নিজের কাছেই।
দিদি বললে, এই জানোয়ারটাকে দূর না করা পর্যন্ত আমাদের শান্তি নেই। নড়া ধরে বাইরে বসিয়ে দিয়ে এসো। গগন অত ধোলাই খাওয়ার পরেও বলতে পারলে, কুপুত্র যদি বা হয়, কুমাতা কখনও নয়। আয় মা সাধনসমরে। দেখি মা হারে, না পুত্র হারে। ভ্যাপ্পোর, পাপ্পোর, পোঁ।
দিদি প্রায় দোকাদো গলায় বললেন, আজ বোধহয় একাদশী। একাদশী অমাবস্যাঁতে ও একেবারে পাগল হয়ে যায়।
মুকু কঁজিয়ে উঠল, জানোই যখন, তখন ঠিকানাটা দয়া করে দিয়ে এলে কেন? ঝাড়ের বাঁশ। ঝাড়েই থাকত।
গগন বললে, আমি ডিটেকটিভ মোহন। ঠিকানা ছাড়াই চলে এসেছি। এর আগে তিনবার তুমি আমাকে ফেলে পালিয়েছিলে। সেখানেও আমি গিয়েছিলুম। তুমি আমার কী করতে পেরেছিলে মা? তোমার সেই রেলের গার্ডসায়েব আমাকে পিটিয়ে পানাপুকুরে ফেলে দিয়েছিল। তবু আমি। মরিনি। আমি মরছি না, মরব না।
দাঁত কিড়মিড় করে দিদি বললে, মাঝে মাঝে মনে হয়, তোর গলা টিপে শেষ করে দিই। যতদিন বাঁচবি, ততদিন জ্বালাবি!
এখন আমাকে কিছু খেতে দাও। আমার পেট খালি থাকলে আমি ঘুমোতে পারি না। সেই কাল রাত্তিরে আমি মুড়ি তেলেভাজা খেয়েছি। আর আজ এই রাত্তির। আমার যে ভীষণ খিদে পেয়েছে। মা!
গগনের শেষ মা ডাকটা হাহাকারের মতো শোনাল। যে-কোনো নিষ্ঠুর বুক ফেটে যাবে।
মুকুর টানটান শরীর একটু আলগা হল। মুকু বললে, পেট পুরে খাইয়ে দিলে লক্ষ্মী হয়ে ঘুমোবে?
গগন দু’হাতে মাথা ধরে বললে, আমি পাগল। তাই খেতে চাইলে সবাই আমাকে মারই খাওয়ায়। মুকু কিছুক্ষণ থমকে থেকে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। আমি আর থাকতে না পেরে বললুম, দিদি, একটা কাপড় পরে এসো।
দিদি একটু থতমত হয়ে বললেন, পরতে পারছি না ভাই। কোমরের কাছটা পুড়ে গেছে। কোনওরকমে সায়াটা ধরে আছি। সবই তো সহ্য করছ, ক’দিন এইটুকু সহ্য করে নাও।
