ভগবান ফগবান আমি মানি না বিনয়দা। যখন যেমন, মানুষের ইচ্ছে ভগবানের ইচ্ছে বলে চালানো হয়। আমি পুরুষকারে বিশ্বাস করি। ট্রাই অ্যান্ড ট্রাই! গরম রসগোল্লা আমি খাওয়াবই আর ওকে দিয়েই আনাব।
আপনি ঈশ্বর বিশ্বাস করেন না? কী আশ্চর্য! তার ইচ্ছেতেই তো জগৎ চলছে। জীব আসছে যাচ্ছে। গাছের পাতা নড়ছে। ফুল ফুটছে। পাখি ডাকছে। যেখানে যা দরকার তাই দিয়ে পৃথিবী সাজিয়েছেন। এ এক অনন্ত লীলা! আপনার আমার বোঝার ক্ষমতা নেই। মওঃ শরতরং নান্য কিঞ্চি অস্তি ধনঞ্জয়! ময়ি সর্ব ইদং পোতং সূত্রে মণি-গণা ইব।
মেয়ের বই দেখে আমাকে আর সংস্কৃট আওড়াবেন না। আমি সার বুঝেছি, ঈশ্বরাসিদ্ধেঃ প্রমাণাভাবাৎ ঈশ্বর আমার সামনে এসে দাঁড়ালেও আমি আগে আইডেন্টিটি কার্ড দেখতে চাইব। যাচাই করে নেব ইমপোস্টার কি না? আমি মনুর সন্তান মানুষ। আমার সেই পিতার পিতা তস্য। পিতা, প্রি-ইনফাইনাইট পিতা বলে গেছেন, যৎ কর্ম কুর্বতোহস্য স্যাৎ পরিতোমোহন্তরাত্মনঃ। তৎ প্রযত্নেন কুর্বিত বিপরীতন্তু বর্জয়েৎ। যে কাজ করলে অন্তরাত্মার তৃপ্তি হয় আমি সেই কাজই করব। ওসব গড উইশ ফুইশ আমি বুঝি না।
আগে তো আপনি এইরকম ঘোরতর নাস্তিক ছিলেন না। কী করে এরকম হয়ে গেলেন?
ঈশ্বর হলেন ধনীর বিলাসিতা, দরিদ্রদের দুর্বলতা। এই সংসারে একের পর এক যখন মৃত্যু নামছে, একটা করে প্রাণ ছিনিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে, তখন মাঝরাতে, নির্জন ছাতে, তারাভরা। আকাশের দিকে তাকিয়ে, জলভরা চোখে দিনের পর দিন বলেছি, প্রভু, আর না, আর না, এনাফ। অফ ইট, এবার ক্ষান্ত হও। একেবারে শ্মশান করে দিয়ো না। আপনার ডেফ অ্যান্ড ডাম্ব ঈশ্বর উল্কায় জ্বলেছেন, তারায় মিটমিট করেছেন, অ্যান্ড নাথিং মোর। ভীরুর কল্পনায় তার মন্দির। ওয়ান্ট, ডেস্ট্রাকশন, ডেস্টিচিউশন, মিউটিলেশন, রেপ, র্যামপেজ, ডিভাস্টেশন, আপনার ঈশ্বরের পৃথিবীর নিত্য ঘটনা। হার্ড লিকার। চিনি দিলেও মিষ্টি হবে না। এই নাও দশটা টাকা। এইবার মাথায় করে আনবে। দেখি এইবার ঈশ্বরের কেমন ক্ষমতা! দ্যাট নন-এগজিস্ট্যান্ট অলমাইটি লর্ড, আই চ্যালেঞ্জ ইয়োর অথরিটি।
পরেশদার ভিয়েন নেমে গেছে। দোকানের বেঞ্চিতে বসে আছেন। বাচ্চা ছেলেটা ঘ্যাসর ঘ্যাসর করে পিঠের ঘামাচি চুলকে দিচ্ছে। ছেলেটাকে দেখে বড় কষ্ট হয়। কে যে কী করার জন্যে জন্মায়! কীভাবে বিকিয়ে যায়! এই ভবের হাটে অনবরত চলছে বেচা-কেনা। কে কোন রাতে নিজের তাগিদে জন্ম দিয়ে সরে পড়েছে। এখন তুমি ভুগে মরো। নির্মলদা ঠিকই বলেন, তোমার আনন্দ আর একজনের দুঃখ। প্রাণ রাখিতে সদাই যে প্রাণান্ত। জন্মিতে কে চাইত যদি আগে সেটা জানত। ভোরে উঠেই ঘুমটি নষ্ট, তার পরেতে যে সব কষ্ট, বর্ণিতে অক্ষম আমি সে সব বৃত্তান্ত।
আয়েশে পরেশদার চোখ বুজে এসেছে। ছেলেটি তার গ্রাম্য ভাষায় বললে, খদ্দের এসেছে গো।
আসুক গে তুই শালা চুলকো।
আমার গলা না শুনলে আয়েশ কাটবে না। পরেশদা, এক সের গরম রসগোল্লা।
পরেশদা ঘাড় তুলে চিনলেন, আরে সেই ঘোড়াটা আবার এসেছে। কী হল? এই তো নিয়ে গেলে।
ছোঁড়া শব্দটা শুনে পা থেকে মাথা অবদি জ্বলে গেল। ব্যাটার পয়সা হয়েছে। পয়সা হলে কী হবে কালচার নেই। না, রাগলে চলবে না। গীতা বলছেন, বীতরাগভয়ক্রোধা মন্ময়া মামুপাশ্রিতাঃ। গীতাকে তো আবার ব্যঙ্গ করেছেন ডি এল রায়। গীতার জোরে সচ্ছে ঘুষি, সচ্ছে কানুটিটে, গীতার জোরে পেটে না খাই, সয়ে যাচ্ছে পিঠে। নানা ভাবের ধাক্কায় পৃথিবীর পথ খুঁজে পাওয়া বড় কঠিন হয়ে পড়ছে।
বেশ ঝরঝরে গলায় বলতে হল, দেরি হবে নাকি!
বাবা, তুমি যে দেখছি ঘোড়ায় জিন দিয়ে এসেছ?
হ্যাঁ, তাড়া আছে। আমার কাজ আছে।
ব্যাজার মুখে পরেশদা দোকানে ঢুকলেন। বিচিত্র স্বভাবের মানুষ। আগেও দেখেছি দোকানে কোনও নিম্নশ্রেণির মহিলা এলে, অন্য খদ্দের ভুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রসালাপ করবেন। স্বামীজি কেমন করে বললেন, মানুষই ঈশ্বর। বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর। কী দৃষ্টি লাভ করলে পরেশকে ঈশ্বর ভাবা যায়! পরেশ ঈশ্বর, মণিপাগলি ঈশ্বর। আমিও ঈশ্বর। ঈশ্বরে ঈশ্বরে ছয়লাপ। পৃথিবী গিজগিজ করছে রে বাবা!
এবার আর কোনও ঝুঁকি নেওয়া চলবে না। মাথায় না চাপালেও, প্রায় বুকের কাছে গরম হুঁড়ি চেপে ধরে গুটিগুটি এগোতে থাকি। কৃষ্ণকোলে নন্দলালা যমুনা পার হচ্ছেন। আর কোনওদিন রাস্তার কুকুরকে সোহাগ করে বলতে যাব না, মানু আমার, মাংস নয়, রসগোল্লা। অন্ধকারে ভোস করে একটা শব্দ হল। ইনি আবার কে? আমাদের পাড়ার সেই বিখ্যাত ষাঁড়টি। যার আতঙ্কে যুবতী গোরুরা রাস্তা হাঁটে ভয়ে ভয়ে। যে থানার বড় দারোগাকে শিঙে ঝুলিয়ে রেখে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছে। খ্যাতিমান পুরুষ এখন প্রাণায়াম করছেন। কুলকুণ্ডলিনী ধ্যানস্থ। ইড়া পিঙ্গলায় মহেশ্বরের আসা-যাওয়া শুরু হয়েছে। চিত্তচাঞ্চল্য ঘটাবার মতো গাভী সুন্দরীরা এখন গোয়ালে জাবর কাটছে। প্রকৃতিতে বড় কামপ্রভাব। পজেটিভ আর নেগেটিভ এক হবার জন্যে সদাই ছটফটর করছে। তাতে তোর কী রে শালা। এ যে রামকৃষ্ণের গলা। তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম।
আমাদের বাড়িতে মধ্যরাতে সন্ধ্যা নামে। সব নিদ্ৰাজয়ী মহাযোগী। কোন বাড়িতে রাত বারোটার সময় কর্তা হাঁকেন, চা চাপাও তো! পিতৃদেব গর্ব করে বলেন, আমি হলুম নকটারন্যাল বার্ড। কালপ্যাচা। কেন এমন হয়েছে জানেন, একের পর এক রুগির পাশে বসে রাতের পর রাত জেগে জেগে আমার বায়োলজিক্যাল ক্লক ঘুরে গেছে। পৃথিবী যখন ঘুমোয় আমি তখন জাগি। সেন্টিন্যাল অফ দি নাইট। নাইটজার। পিতার স্টকে কত যে ভাল ভাল শব্দ আছে। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, ছেলে না হয়ে মেয়ে হলে সারাজীবন এমন পিতার পাশে থেকে সেবা করে যেতুম।
