গগন নিচু হতে গিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। মুখে স্বর্গীয় হাসি, মাইমা, তুমি আমার গুরুজন, রাগ কোরো না, তোমার একটু ঘুচিবাই আছে। সামনে এটা কী দেখছ? আগুনে পড়লে সব শুন্ধু। পচা মড়া, টাটকা মড়া, জ্যান্ত মড়া, চিতায় ফেলো, পরিষ্কার ছাই। তুমি দাঁতও মাজতে পারবে সেই ছাই দিয়ে! তুমি জানো কি, রোজ আমি দশটা করে তুলসীপাতা খাই!
দিদি এক ধমক লাগালেন, মুখে মুখে তর্ক করছিস? যা বাইরে যা। ঘর থেকে বেরো।
তর্ক করব কেন, ব্যাপারটা বুঝে নিচ্ছি। চুঁচিবাই থাকলে হাতের আঙুলে হাজা হয়।
মুকু বললে, আমি মুখে মুখে তর্ক, বাজে কথা, ফাজলামো একদম সহ্য করতে পারি না। তোমাকে আমি সাবধান করে দিচ্ছি। তোমাকে আমি বেরোতে বলেছি, বেরোবে। বেরিয়ে আসবে এক কথায়।
গগন এইবার খেপা খোকা হয়ে গেল, না আমি বেরোব না! আমি রান্না করব। তোমাকে খাওয়াব।
মুকু আমার দিকে তাকিয়ে বললে, বেআদবটাকে ঘাড় ধরে বের করে দাও!
মুকুর সম্পূর্ণ অন্য চেহারা! মুখ থমথমে, যেন দ্বিতীয় হরিশঙ্কর। এ নির্দেশ পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। শিশুর মতো জেদি এক যুবক। দুর্গার মতো এক শক্তি। দিদি এক কোণে মহা অপরাধী।
মুকু বললে, কাজটা তা হলে আমাকেই করতে হয়, কারও মুরোদে যখন কুলোচ্ছে না!
মুকু যেই এগোতে গেল, দিদি ছুটে এল, আমি আমি। আমি ঝেটিয়ে বের করছি।
দিদি যেই ঘুরতে গেল, আঁচলটা ঝপ করে উনুনে পড়ল। গনগনে আঁচ! দপ করে আগুন ধরে গেল।
২.১৮ If one calls you a donkey
আগুন আগুন, বলে ধেইধেই করে আমি একটা বাঁদর নাচ নাচলুম। তারপর এক লাফে ঘরের বাইরে বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করলুম। মুকু এক ধাক্কা মেরে আমাকে নিজের অজান্তেই সাহায্য করল। যে-থালায় ময়দার তাল, তার পাশেই বিশাল এক ঘটিতে জল ছিল। দিদির আঁচলে আগুন তখন সাপের মতো কিলবিল করছে। চুল পর্যন্ত লাফিয়ে উঠছে। মুকুর হাতে ঘটি। দিদি দু’হাত তুলে সতীদাহের সতীর মতো স্থির। পুরো ঘটির জল দিদির গায়ে ঢেলে দিল মুকু। তারপর দু’হাতে জাপটে ধরে মেঝেতে উলটে পড়ে দু’জনে গড়াগড়ি, জল সপসপে মেঝেতে। গগন কোথাও কিছু। নেই, একটিন ময়দা উপুড় করে দিল দু’জনের গায়ে। দুটো বিশাল আকারের পুলি পিঠে যেন মেঝেতে গড়াগড়ি যাচ্ছে। আগুন যখন নিবে গেছে, তখন আর ভয় কী! আমি বীর দর্পে ঘরে ঢুকলুম। আর মোচার খোলার মতো সড়াক করে হড়কে পড়ে গেলুম। জলেতে ময়দাতে যে মেঝেটা এত পিচ্ছিল হয়ে আছে, আমি ভাবতেও পারিনি। গগন ছেলেমানুষের মতো হাততালি দিতে দিতে সুর করে বলতে লাগল, পড়েছে পড়েছে। উলটে তো পড়েছে। মনে হচ্ছে, উঠে কষে এক থাপ্পড় লাগাই। ও হতভাগার জন্যেই এত কাণ্ড। দুটো মেয়ে এখনই পুড়ে মরত।
মুকু উঠে বসেছে। দিদি ওঠার চেষ্টা করছে। দু’জনকেই বৃদ্ধার মতো দেখাচ্ছে। মুকু আমার দিকে তাকিয়ে বললে, তোমার লজ্জা করে না! তখন ভয়ে পালাচ্ছিলে, এখন চালাকি করতে এসেছ। তুমি এই মুহূর্তে আমার চোখের সামনে থেকে দূর হয়ে যাও। তোমাকে দেখলে আগুনে পোড়ার চেয়েও শরীর জ্বলে উঠছে। তুমি এত স্বার্থপর! আত্মপর! কাপুরুষ! ওপরচালাক! দয়া করে ওই পাঁঠাটাকে নিয়ে ঘরের বাইরে যাও। গেট আউট ফ্রম হিয়ার। কাওয়ার্ড। নিনকমপুপ!
কতটা পুড়ল একবার দেখি। ফাস্ট ডিগ্রি, না সেকেন্ড ডিগ্রি? হসপিট্যালাইজ করতে হবে কি?
তোমাকে আর ডিগ্রি দেখতে হবে না। দয়া করে সরে পড়ো। যা করার আমি করব।
রাত তখন প্রায় বারোটা। অগ্নিপর্ব শেষ করে মুকু ঘরে ফিরে এল। খাওয়াদাওয়া মাথায় উঠেছে। দু’জনেই অল্পবিস্তর পুড়েছে, তবে তেমন মারাত্মক নয়। দেহের চেয়ে মন পুড়েছে বেশি। বিশ্রী একটা এলোমেলো কাণ্ড। কোথা থেকে একটা চটাস চটাস শব্দ আসছে কানে। মুকুর মুখ ভয়ংকর গম্ভীর। তবু সাহস করে জিজ্ঞেস করলুম, শব্দটা কীসের?
গিয়ে দেখে এসো। আমি জানি না।
মুকু সসাফার ওপর গোঁজ হয়ে বসল। বাইরে থেকে গগনের গলা ভেসে এল, একে খাওয়াদাওয়া নেই, যেটুকু রক্ত ছিল সব শালা মশায় শুষে নিলে। এরা মাছের চাষ না করে মশার চাষ করেছে। বাড়িটা দেখছি পাগলের আখড়া!
আমি হেসে ফেললুম। মুকু উঠে গিয়ে দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে ফিরে এল।
কী করলে? এ যে চরম অভদ্রতা! দিদি কী মনে করবে।
মনে করুক। আমি সেইটাই চাই। এ বাড়িটা মগের মুলুক নয়। ভবিষ্যতে এই বাড়িটা আশ্রম হবে। এটা পাগলা গারদ নয়। অনাথ আশ্রম নয়।
তোমার হঠাৎ মন ঘুরে গেল কেন?
কারণ আমি ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি। একের পেছনে আর এক, তার পেছনে আর এক আসবে। আমার গভীর সন্দেহ, এই পাগলটা তোমার দিদিরই ছেলে। ভদ্রমহিলা ডাহা মিথ্যে কথা বলছেন।
নিজের ছেলে থাকলে কেউ রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় না। ছেলের ওপর নির্ভর করে নিজেই সংসার পাতে। আমার পিতারও ছেলে আছে, কিন্তু তিনি আজ পথে পথে ঘুরছেন। ছেলের ওপর । কীসের ভরসা?
মেসোমশাইয়ের ওটা স্পিরিচুয়াল ক্রাইসিস। তিনি বেরিয়েছেন অন্বেষণে। পরমার্থের সন্ধানে। আমাকে প্রায়ই বলতেন, পাহাড় আমি ভালবাসি। ভালবাসি নদীর উৎসমুখ। হরিদ্বার আমার প্রিয় জায়গা। শ্রবণনাথ ঘাট, হর-কি-পৌরি, কংখল, নিরঞ্জনী সাধুদের আখড়া। চণ্ডীপাহাড়। অলকানন্দা। মৃত্যু আমাকে বাঁচতে শিখিয়েছে। ভাগ্য আমার প্রিয়জনদের একে একে কেড়ে নিয়েছে। সন্তানটিকে স্বাবলম্বী করাই ছিল আমার শেষ কর্তব্য। করেছি। এইবার শিকল কাটার সময়। সময় হয়েছে নিকট, এবার বাঁধন ছিড়িতে হবে। এর সঙ্গে ওটাকে এক করে ফেলো না! সংসার হরিশঙ্করের পক্ষে একটা অত্যন্ত ছোট জায়গা। তোমার এই মহিলাটি মোটেই সুবিধের নয়। এই ছেলেটির জন্মবৃত্তান্তে গভীর কোনও রহস্য লুকোনো আছে। দিদির মুখের সঙ্গে অনেক মিল। পিতার পরিচয় ছেলের পক্ষে জানা। সম্ভব নয়, একমাত্র মা-ই বলতে পারে পিতা কে?
