উঃ, তোমার সাংঘাতিক অবজার্ভেশন! কিন্তু দ্বিতীয়টা? কী করে বললে সেখানেই গেছে?
কাকাবাবু, আমার ইনটিউশন।
তুমি আজ আমাকে মস্ত বড় একটা কিউ দিয়ে চলে গেলে। চলো, তোমাদের পৌঁছে দিয়ে আসি।
না কাকাবাবু, সে অনেক দূর। আমরা লজ্জায় মরে যাব। আপনাকে আবার অতটা পথ ফিরে আসতে হবে। আমরা এমনিই বেশ ফিরে যেতে পারব। তেমন বেশি রাত হয়নি কাকাবাবু!
তুমি কি পড়ছ?
আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি এম এ দিচ্ছি, ফিলজফিতে।
তোমাকে আমি বলে রাখছি, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে পরীক্ষা দিয়ো। তুমি খুব শাইন করবে। তোমার মতো বাঙালি মেয়ে আমি খুব কম দেখেছি।
আমাদের বাড়ি ফিরতে রাত প্রায় এগারোটা হয়ে গেল। সদর দরজা বন্ধ। ওপরের ঘরে একটা মাত্র আলো। সদরের কড়াদুটো বিশাল বালার মতো। তাইতে আবার নানা কারুকার্য। একবার মাত্র নাড়তেই দিদির গলা পাওয়া গেল।
দরজা খোলামাত্রই আমরা অবাক, দিদি হঠাৎ মন্ত্রবলে ছেলে হয়ে গেলেন নাকি? বিশাল বড় নাক। ঝোলা গোঁফ। ইনি আবার কে? খাকি ইউনিফর্ম। প্রশ্ন করার আগেই তিনি বললেন, রাখলে ভেতরে থাকব, তাড়িয়ে দিলে রকে রাত কাটাব। লোক খারাপ নই, তবে একটু চরিত্রদোষ আছে। এখন যেমন বিধান দেবেন, আপনারাই মালিক।
আমি তো আমি, মুকু পর্যন্ত হতভম্ব। এ আবার কে? শরীরে নাকটাই যার সর্বস্ব। যেন ভগবান ম্যানুফ্যাকচার করার সময় গন্ডারের ওয়ার্কশপ থেকে একটা নাক এনে ফিট করে দিয়েছেন। মুকু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনি কে ভাই?
মানুষের স্যাম্পলটি হাসলেন! অসম্ভব ঝকঝকে দু’সার দত। বললেন, আমি মনে হয় ঠিক ভাই নই। ভাগনে হতে পারি। আপনারা আমার দূর সম্পর্কের মামা আর মামি!
মুকু বললে, মামি কী করে হলুম? মামি তো এমনি এমনি জন্মায় না! মামা হতে পারে। মামি হতে হয়। কোনও এক মামাকে বিয়ে করলে তবেই মামি হওয়া যায়। অবিবাহিতা মামি হয় না!
দিদির কাছে, তোমাদের দিদির কাছে আমি সব শুনে নিয়েছি। ছেলেমানুষের মতো হইহই করে নেচে উঠল। মামার তুমি মামি হবে। আমি সব শুনে নিয়েছি।
মামার মামি হবে কী রে! বলো, মামার বউ হবে। ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না, এই বড় খোকাটি কে? মুকু পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে গেল। আমি পড়লুম মহাবিপদে। লোকটি খপ করে আমার হাতদুটো ধরে ফেলল। সাংঘাতিক জোর। তেমনি খসখসে। হাতদুটো ঝাঁকাতে ঝকাতে বললে, বলল মামা, তুমি আমাকে চরণাশ্রয় দিলে?
ভয় পেয়ে গেলুম, আশ্রয় মানে, কতদিনের আশ্রয়! শক্ত গলায় বললুম, ওপরে চলো। আগে জানা দরকার তুমি কে? হঠাৎ কোথা থেকে এলে? কেনই বা এলে?
এটা কোনও কথা হল? মাকে ছেড়ে ছেলে থাকতে পারে? যেখানে মা, সেইখানেই ছেলে।
কোনওরকমে নিজেকে মুক্ত করে ওপরে এলুম। দোতলার সিঁড়ির ওপরের ধাপে বাইশো বাইশ একটা বুট জুতো, মালিক অবশ্যই ওই ছেলেটি। ছেলে বলব, না লোক বলব? বয়েস তো বুঝতে পারছি না! মুখ বলতে তো নাক, আর কাঠবেড়ালির ল্যাজের মতো গোঁফ!
ওপরে এসে বুঝতে পারলুম, দিদি কেন নীচে নামেননি। ময়দা মাখছেন। ঠেসছেন তো ঠেসছেন! মুকু রাস্তার কাপড়ে রান্নাঘরে ঢুকবে না। আমার পিতার নির্দেশ। রান্না মানে পুজো। সবার আগে কাপড় ছাড়তে চলে গেছে। আমাকে দেখেই দিদি উঠে পড়লেন। আমার খুব কাছে এসে বললেন, ছাতের সিঁড়ির কাছে চলো।
অন্ধকারে তিন-চার ধাপের মতো ওপরে উঠে গেলুম। একটা খুরি ছিল কোথাও। গড়াতে গড়াতে নীচে পড়ে গেল। দিদি আমার খুব কাছে সরে এসে বললে, ভাই, আমি বড় অপরাধী! আমার ভীষণ লজ্জা করছে। পাগলটা খুঁজে খুঁজে ঠিক এখানে চলে এসেছে। এখন কী উপায় হবে ভাই?
এ কে?
আমার মতোই এক অভাগা। এর মায়ের স্বভাবচরিত্র ভাল ছিল না। এ যখন বছর তিনেকের, মা ফেলে পালিয়েছিল। মিশনারিদের অরফানেজে মানুষ। ও আমাকেই মা বলে জানে! ওর অনেক গুণ! বলে, আমি হলুম মানুষ কুকুর। এঁটোকাটা খেতে পারি। রাস্তার ধারে ঘুমোতে পারি। নর্দমার জল খেতে পারি চকচক করে। আর আমাকে যে ভালবাসে তার জন্যে জীবন পর্যন্ত দিতে পারি। স্কুলে দরওয়ানের কাজ করে। আজ তোমরা চলে যাবার পর এসে হাজির। বলে, কুকুর তো, গন্ধ শুকে শুকে চলে এসেছি। এখন লাথি মেরে তাড়াও, আমি বসে থাকব। মাকে ছেড়ে থাকি কী করে! কী করব ভাই! আমি তাড়াতে পারলুম না! পাগলকে বোঝাই কী করে,আমার নিজেরই চালচুলোর ঠিক নেই। আপনি পায় না খেতে শঙ্করাকে ডাক।
মাথা কি খুব খারাপ? একেবারে পাগল?
না, অল্প ছিটিয়াল! যা বলবে তাই করবে। গাধার মতো খাটতে পারে। রুগির মাথার কাছে বসে সারারাত জাগতে পারে। নিজের মুখের খাবার অপরকে তুলে দিতে পারে। লক্ষ গালাগাল দাও হ্যাঁ হ্যাঁ করে হাসবে। রাগ নেই, মানসম্মান বোধ নেই।
কী নাম?
গগন!
রান্নাঘরের কাছ থেকে গগনের গলা এল, কোথায় গেল সব? আঁচ বইছে! ময়দার তাল পড়ে আছে। গেল কোথায়? মা!
দিদি তাড়াতাড়ি তিন ধাপ নেমে গিয়ে বললে, এই তো আমি। ষাঁড়ের মতো চেল্লাচ্ছিস কেন?
তুমি থেকে থেকে কোথায় যাও মা! আঁচ বইলে কয়লা পোড়ে তা জানো কি?
জানি বাবা।
করবে লুচি আলুর দম, সেই সন্ধে থেকে খুচুর খুচুর করছ। সরো তো, আজ আমি রাঁদি! আমার রান্নার বহুত সুনাম! আমি থাকতে তুমি কষ্ট করবে কেন?
ঠিক সেই সময় মুকু এসে হাজির। তিড়িং করে লাফিয়ে উঠল, একী একী, রান্নাঘরে কেন? এটা মেয়েদের এলাকা। হাত ধোয়া নেই, পা ধোয়া নেই, কাপড় ছাড়া নেই, খাওয়ার জিনিসে হাত!
