মুকু হুহু করে কেঁদে ফেলল। এ কী ভাব! সুরঞ্জনার মা মুকুকে জড়িয়ে ধরলেন দু’হাতে। তিনিও কাঁদছেন। অপূর্ব দৃশ্য। অপরাধীর মতো আমি একপাশে চুপ। অপরাধী, কারণ আমার চোখে এক ফোঁটা জল নেই। আমার পিতার প্রসঙ্গে দু’জনে কাঁদছে। আমি কেন কাঁদতে পারছি না? আমি কি এমনই পাষণ্ড! সুরঞ্জনা ঘরে ঢুকল। আমার পাশে এসে ফিসফিস করে বললে, কী হয়েছে?
উত্তর দিতে গিয়ে আমার গলা দিয়ে স্বর বেরোল না। পুঁটলির মতো কী একটা আটকে গেল স্বরযন্ত্রে। জল আসছে চোখে। দীর্ঘ খরার পর বহুঁকাঙিক্ষত বর্ষণ। সুরঞ্জনা অবাক হয়ে বললে, কী হল আপনাদের?
অতি কষ্টে বললুম, কিছুই হয়নি। তেমন কিছু নয়।
সুরঞ্জনা এগিয়ে গিয়ে তার মায়ের পিঠে হাত রেখে বললে, তুমি কেঁদো না মা। শরীর খারাপ হবে। আবার তুমি বিছানায় পড়বে।
মুকু একপাশে সরে গিয়ে চোখ মুছল। ভারী গলায় বললে, আমরা তা হলে আসি আজ?
সুরঞ্জনা বললে, এখনই যাবে?
আমরা এখন বেরোলে বাড়ি পৌঁছোতে রাত দশটা বাজবে। আমাদের দিদি একলা আছেন। কাল আমরা খবর নোব। আমার গভীর বিশ্বাস, দাদা ফিরে আসবেন।
লুকিয়ে থাকার তো কোনও কারণ নেই!
হয়তো আছে, আমরা জানি না। আমার মেসোমশাইয়ের অদৃশ্য হবার কারণ কী? কেউ জানে না। আমরা রাস্তায় নামলুম। মুকু বললে, সুন্দর পরিবার! তবে কোথাও একটা পাপ লুকিয়ে আছে। সুরঞ্জনার মা মনে হয় মারাঠি মহিলা। সুরঞ্জনার বাবা তার দ্বিতীয় স্বামী। এই পয়েন্টে একটা গোলমাল আছে।
তুমি একেবারে সবজান্তা। বিকেল থেকে খুব অকাল্ট পাওয়ার দেখাচ্ছ। তোমার অত ক্ষমতা নেই।
এটা অলৌকিক ক্ষমতা নয়, চোখ। চোখ খোলা রাখলে তুমিও দেখতে পেতে।
কী দেখতে পেতুম?
একটা গ্রুপ ফটো। ছবিতে সুরঞ্জনার মা, আর একজন ভদ্রলোক ও একটি শিশু। ওই শিশুটি হল সুরঞ্জনার দাদা। প্রথম পক্ষের ছেলে।
তোমার শার্লক হোমস হওয়া উচিত ছিল।
পিয়োর ডিডাকশন মাই ডিয়ার ওয়াটসন।
ট্রাম ট্রাম বলে মুকু ধড়ফড়িয়ে ছুটল। রাতের প্রায়-খালি ট্রাম। আমরা বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলুম। একটু শীত-শীত ভাব। মুকু পাশে থাকায় বেশ একটা নির্ভরতার ভাব আসছে। মনে হচ্ছে, মায়ের একটু হাত ধরে বেড়াতে বেরিয়েছে ছেলে। পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ নিজের জীবন বয়ে বেড়াননা। সামনে কত চড়াই, উতরাই। কত বছর যে হাঁটতে হবে। চোখ বুজিয়ে ভাবছি। হঠাৎ এক চিমটি, ঘুমোচ্ছ কেন?
ঘুমোইনি তো! ভাবছি!
সুরঞ্জনার দাদা হল প্রথম পক্ষের ছেলে। তিনি তার বাবার কাছে ফিরে গেছেন, কারণ সেই মানুষটি মহারাষ্ট্রের কোনও শহরে নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছেন! এক নারীর বিশ্বাসঘাতকতায় সমস্ত নারীর প্রতি তার ঘৃণা! মেয়েদের সাধারণত মাথার ঠিক থাকে না। জানো তো, আবেগও একটা বেগ।
মুকু হঠাৎ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললে, তোমার চশমা?
আমার চশমা? চশমা আমার চোখে নেই? চোখে হাত দিলুম। ফাঁকা।
তোমার চোখে চশমা আছে কি নেই বুঝতে পারছ না?
তাই! তাই ভাবছি, আলোগুলো কেমন যেন ছেতরে গেছে! মানুষের মুখগুলো বড় বড় আর অন্ধকার।
কোথায় ঘুচিয়ে এলে প্রভু!
এখন মনে পড়ছে। তখন চোখে জল এসে গিয়েছিল। চোখ মোছার জন্যে চশমাটা খুলে টেবিলেই রেখে এসেছি।
বেশ করেছ। আবার নামো। আবার ফিরে চলো। একটা কাজ যদি সুষ্ঠুভাবে হয়! বিরক্তি!
ট্রাম আট-নটা স্টপ চলে এসেছে। আমরা নেমে পড়লুম। উলটো দিকের ট্রাম ধরে আবার সুরঞ্জনাদের বাড়িতে। সদর দরজা বন্ধ। কলিং বেল টিপে দাঁড়িয়ে আছি। সুরঞ্জনাই দরজা খুলল। বেশবাস পালটে গেছে। আমাদের দেখে অবাক, কী হল? ফিরে এলেন?
আমার চশমা, আপনাদের ওপরের টেবিলে। যদি দয়া করে এনে দেন।
ভেতরে আসবেন না?
আর না। সেই কোথা থেকে ফিরে আসছি!
ছি ছি, আমারই লক্ষ করা উচিত ছিল।
মুকু বললে, যার চশমা তারই যদি খেয়াল না থাকে, আমরা কী করতে পারি! ফ্যাশনের চশমা। সুরঞ্জনা চলে গেল। দরজার মাথার ওপর ঘষা কাঁচের শেডে আলো জ্যোৎস্নার মতো ছড়িয়ে গেছে। আমরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। বাড়িটা বড় বেশি নির্জন। যেন সব ঘটনা থমকে গেছে! একটা গাড়ির হেডলাইট আমাদের ওপর দিয়ে ঘুরে গেল। বাঁক নিচ্ছিল। দরজার সামনে এসে থামল। পেছনের দরজা খুলে সুরঞ্জনার বাবা নামছেন। মুকুর কী হচ্ছে জানি না। আমি পাথর হয়ে গেছি। কী খবর বাড়িতে ঢুকছে কে জানে!
ভদ্রলোক এগিয়ে এসে অবাক হলেন, কী ব্যাপার! তোমরা দাঁড়িয়ে?
মুকু বললে, কাকাবাবু, কী খবর?
মুকুর পিঠে হাত রেখে হাসিমুখে ভদ্রলোক বললেন, ওটা আমার ছেলের ব্রিফকেস নয়, নামটা যদিও এক। ভেতরের কন্টেন্টসও সব অদ্ভুত। সিগারেটের প্যাকেট, দেশলাই। বিলু স্মোক করে না। একটা ময়লা রুমাল। কিছু চিঠি। ছোট্ট একটা নোটবুক। লোহালক্কড়ের হিসেব। একই নাম আর টাইটেলের কত লোক আছে!
সুরঞ্জনা এসে গেছে। হাতে চশমা। মুকু বললে, কী বলেছিলুম সুরঞ্জনা? ওটা দাদার ব্রিফকেস নয়। আমি একটা কথা বলব কাকাবাবু?
বলো মা।
কিছু মনে করবেন না?
কেন করব?
দাদাকে খোঁজ করুন তার বাবার কাছে।
ভদ্রলোক একেবারে স্তব্ধ। সুরঞ্জনা চশমাটা এগিয়ে দিল আমার হাতে। হাত কাঁপছে।
ভদ্রলোক নিজেকে সহজ করে নিয়ে বললেন, তুমি এই সিক্রেটটা জানলে কী করে মা? কেউ বলেছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ। একটা গ্রুপ ফটো। দেয়ালে ঝুলছে।
