ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন ভদ্রলোক। সমস্ত বাতাস কে যেন শুষে নিল। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সুরঞ্জনার মায়ের মুখে কালো একটা ছায়া দুলছে। সুরঞ্জনা আমার ডান হাত চেপে ধরেছে। হাত বরফের মতো শীতল। এত জোরে ধরেছে, কোনও খেয়াল নেই, মানুষের হাত না লোহা!
আমার ভেতরে আবার সেই বিদ্রোহ, কী হয়? ঈশ্বরকে বিশ্বাস করে লাভ কী, যে-ঈশ্বর মানুষকে রক্ষা করতে জানে না। শুধু ভক্তি নেবেন, পূজা নেবেন, ত্যাগ নেবেন, বৈরাগ্য নেবেন, দেওয়ার বেলায় কিছুই দেবেন না। তিনি কি আছেন? সেই অলমাইটি! হিজ লর্ডশিপ। God is dead! Heaven is empty, weep, children, you no longer have a father / Goie wicht is go বিশ্বাস নিয়ে গান করলেন, ধ্যান করলেন, তাদের জন্যে একটু ভাল খবর কি আসতে নেই! বিধির বিধান অতি বিচিত্র! এই সংশয়েরও উত্তর আছে। যারা আছেন মহামানবের দলে তারা জানেন। বলবেন, কী জানো, সুখ-দুঃখ দেহধারণের ধর্ম। কবিকঙ্কন চণ্ডীতে আছে যে, কালুবীর জেলে গিয়েছিল, তার বুকে পাষাণ দিয়ে রেখেছিল, কিন্তু কালুবীর ভগবতীর বরপুত্র। দেহধারণ করলেই সুখ-দুঃখ ভোগ আছে। আবার, শ্ৰীমন্ত বড় ভক্ত। আর তার মা খুল্লনাকে ভগবতী কত ভালবাসতেন। সেই শ্ৰীমন্তের কত বিপদ। মশানে কাটতে নিয়ে গিয়েছিল। আরও আছে, একজন কাঠুরে পরমভক্ত, ভগবতীর দর্শন পেলে; তিনি কত ভালবাসলেন, কত কৃপা করলেন। কিন্তু তার কাঠুরের কাজ আর ঘুচল না। সেই কাঠ কেটে আবার খেতে হবে। কারাগারে চতুর্ভূজ শঙ্খচক্রগদাপদ্মধারী ভগবান দেবকীর দর্শন হল। কিন্তু কারাগার ঘুচল না।
হাতে এক ফোঁটা জল পড়ল। তাকিয়ে দেখি সুরঞ্জনার দু’গাল বেয়ে জল নামছে। ফোঁটা ফোঁটা। একের পর এক গড়িয়ে চলেছে। প্রথামতো কিছু বাঁধা বুলি এইসময় মুখে আসতে চায়, ভাবছ কেন? বিচলিত হচ্ছ কেন? মন শক্ত করো। যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। ভাগ্যে যা থাকে তাই হয়। এখনই কেন ভাবছি তিনি নেই? এইসব ফাঁকা ফাঁকা বহু ব্যবহৃত কথা।
সুরঞ্জনা আমার পাশের চেয়ারেই বসে ছিল। ধীরে ধীরে তার মাথাটা আমার কাঁধে নেমে এল। আলতো, আলগোছে। একমাথা চুল, কিছু আমার গালে, কানের কাছে, এক স্তবক আমার বুকের কাছে, রেশমের চামরের মতো দুলছে বুকের কাছে। অদূরেই মুকু। আমার ভয় করছে। আমার শিথিল বাঁ হাত চাইছে সুরঞ্জনার মাথায় উঠে যেতে। সুরঞ্জনার মনের ভাব আমি পড়তে পারছি না।
সুরঞ্জনার মা বললেন, তোমার সঙ্গে আমার বিলুর চেহারার অনেক মিল। মুখটা তো একেবারে কেটে বসানো। ও কেমন করে বলছে, বিলু নেই! ব্রিফকেসটা কেমন করে না-থাকার প্রমাণ হয়! আমি ঠাকুরকে এত ডাকি! তবু আমার এই সর্বনাশ কেন হবে! তিনি আমার কথা শুনবেন না!
সুরঞ্জনার মায়ের মুখ উদাস, বর্ণহীন। কথাগুলো ভাবে বলছেন। স্বগতোক্তির মতো। সুরঞ্জনার বাবা ফুল-ইউনিফর্মে ঘরে এলেন। রিভলভারটা তুলে নিয়ে ভরে দিলেন কোমরের খাপে। আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, সরি! তোমাদের সব কথা শোনার সময় আমার হল না আজ। পরে শুনব। আর একদিন এসো। কী করব বলো? বড় বিপাকে পড়েছি।
সুরঞ্জনার মা বললেন, তোমার সঙ্গে যাব?
না না, তুমি কোথায় যাবে? আগেই খারাপটা ভাবছ কেন? তোমরা বোসো। অন্য প্রসঙ্গ করো।
একেবারে অন্য একজন মানুষ। সেই কোমল ভাব অদৃশ্য। ঋজু, কঠিন। স্প্রিং-এর মতো বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে। সুরঞ্জনা এগিয়ে গেল পেছন পেছন। আমি মুকুকে তৎক্ষণাৎ ইশারা করলুম, চলো, আমরাও উঠি।
মুকু হাতের ইশারায় বললে, আর একটু!
সুরঞ্জনার মা উদ্দেশ্যহীনভাবে সারা ঘরটা একবার ঘুরে এলেন, তারপর টেবিলের সামনে পঁড়িয়ে বললেন, এখন আমি কী করি? আমার ভেতরটা যে ভীষণ ছটফট করছে। মনে হচ্ছে ফেটে যাবে।
মুকু বললে, জপ করুন! স্থির হয়ে বসে নিরবচ্ছিন্ন জপ!
অ্যাঁ, তুমি তো ঠিক বলেছ! কেমন করে বললে? এইটুকু মেয়ে, তুমি জানলে কী করে? তুমি কি দীক্ষিতা!
আমার একজন গুরু আছেন। তিনি কোথাও লুকিয়ে আছেন আমাদের পরীক্ষা নেবার জন্যে। একলা আমরা পথ হাঁটতে পারি কি না দেখার জন্যে। যাঁর খোঁজে আজ আমরা এখানে কাকাবাবুর কাছে এসেছি। আমার সব শিক্ষা তার কাছে। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ভেতরে আলো জ্বালাতে পারলে বাইরে আর অন্ধকার থাকে না। কোনও দিনই মেঘলা নয়। সেই দিনই মেঘলা যেদিন তাকে স্মরণ করা হয় না। একদিন দুপুরে খুব মন খারাপ করে বসে আছি জানলার ধারে, তিনি এসরাজের খোল সেলাই করছিলেন, আমাকে কাছে ডাকলেন, কী হয়েছে তোমার? বললুম, আমার কেউ নেই, থেকেও নেই। আমি অনাথ। তিনি বললেন, তোমার এই বিশ্বাস নেই, পৃথিবীতে কেউ অনাথ নয়? আমরা সবাই রাজা, সেই রাজার রাজত্বে। বলতে পারছ না, যার কেহনাই তুমি আছ তার? আমারই বা কে আছে? কিন্তু আমি আত্মসমর্পণ করেছি। যথার্থ আত্মসমর্পণ। তিনি আমাকে একটা উদাহরণ দিলেন, জনক রাজার। তিনি অষ্টাবক্রের কাছে আধ্যাত্মিক বিষয়ে উপদেশ চাইতে গিয়েছিলেন। উপদেশলাভের পর জনকরাজা যখন ফেরার জন্যে ঘোড়ায় চড়তে যাচ্ছেন, এক পা জিনের পাদানিতে রেখেছেন, সেই সময়ে অষ্টাবক্র বললেন, কই, আমার গুরুদক্ষিণা দিলে না যে! জনক বললেন, আমার সর্বস্ব আপনাকে দিলাম। আমার রাজ্য, আমার বলতে যা কিছু আছে সব, এমনকী নিজেকে পর্যন্ত গুরুদক্ষিণারূপে আপনাকে দিলাম। অষ্টাবক্র সে দক্ষিণা গ্রহণ করলেন। রাজা জনক। এক পা পাদানিতে রাখা অবস্থাতেই দাঁড়িয়ে রইলেন, ঘোড়ার পিঠে চড়তে পারলেন না। কিছুক্ষণ। পর অষ্টাবক্র তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী হল, ঘোড়ায় উঠছ না কেন? মিথিলায় ফিরবে না? জনক বললেন, যাই কী করে? আমার সর্বস্ব তো আপনাকে সমর্পণ করেছি, আমার নিজের বলতে কিছুই তো নেই। কাজেই নিজের ইচ্ছা বলতেও কিছু নেই আর। ঘোড়ায় চড়ার ও মিথিলায় ফিরে যাবার শক্তিই আমার নেই। অষ্টাবক্র তখন জনককে সব ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, আমার হয়ে তুমি রাজ্যশাসন করো। এরই নাম যথার্থ আত্মসমর্পণ! তুমি সব দিয়ে দাও তাকে, দেখবে তোমার সবকিছু ফিরে আসবে। কেউ নেই মানে? তিনি আছেন, ভয়ংকরভাবে আছেন। আছ অনল-অনিলে চিরনভোনীলে ভূধরসলিলে গহনে/ আছ বিটপীলতায় জলদেরি গায় শশী-তারকায় তপনে ॥ অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে। সে পায় তোমার হাতে। শান্তির অক্ষয় অধিকার। কিছুতে পারে না তারে প্রবঞ্চিতে। শেষ পুরস্কার নিয়ে যায় সে যে। আপন ভাণ্ডারে।
