চায়ের ট্রে নিয়ে ঢুকছে কাজের মহিলা। সুরঞ্জনার মা আমাদের সামনে কাপ রাখতে রাখতে বললেন, শুধুই চা। অন্য কিছু নেই। কারণ যতদিন না আমার ছেলেকে পাওয়া যাচ্ছে ততদিন অতিথি আপ্যায়ন বন্ধ।
মুকু বললে, চায়েরই বা কী প্রয়োজন ছিল কাকিমা?
এইসময় আমরা সবাই চা খাই। এটা আলাদা কিছু নয়।
ভদ্রমহিলাকে যতই দেখছি, ততই মনে হচ্ছে বাঙালি নন। মুখের গড়ন, শরীর, গায়ের রং। যদিও খুব সুন্দর বাংলা বলছেন।
চায়ে চুমুক দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, আমার ছেলের জন্যে সারা ভারতে তল্লাসি চালিয়ে কোনও সুরাহা হল না আজও। নিজের ক্ষমতার ওপর অবিশ্বাস এসে যাচ্ছে। সেই ছাত্রজীবনে হরিদা আমাকে একটা কথা বলেছিল, আজও সেই কথার জোরে অচল অটল আছি। বলেছিল, নিজের শক্তিকে একটা ওয়ালনাটের মতো হৃদয়ে ধরে রাখবে। বিক্ষিপ্ত ঘটনা যখন উলটে ফেলে দিতে চাইবে, তখন চোখ বুজিয়ে ভেবে নেবে, একটা শক্তির বেল্ট সাপের মতো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে তোমার শরীরের নীচের দিক থেকে ওপরে উঠছে। শরীরের এক ইঞ্চিও ফাঁকা থাকছে না। সোজা ওপরে উঠে গিয়ে পেছন দিক থেকে মাথার ওপর ফণা তুলে দুলছে। কী অপূর্ব! ওই প্রক্রিয়ায় আমি যে কী শক্তি পাই, বলে বোঝাতে পারব না। হি ওয়াজ এ যোগী। সেই আজ আমার গুরু। বলেছিল, মনের টালমাটাল অবস্থায় অঙ্ক নিয়ে বসবে। অঙ্কে আর ধ্যানে মন স্থির হয়। মন যত চঞ্চল হবে পৃথিবীকে ততই চঞ্চল মনে হবে। হরিদা বলত, গণিতের মতো পৃথিবীর সব সমস্যাকে বিচার দিয়ে সহজ করে নেবে। যা আসে তাই যায়। কী সুন্দর কথা! জীবনের সামনে, জীবনের পেছনে মৃত্যু। সত্য একটাই, অনস্তিত্ব। তুমি কেন, কেউই থাকবে না। থাকার একটা নির্ধারিত সময়সীমা আছে।–থাকাটাই অনির্ধারিত আকাশের মতোই অনন্ত। জীবনের হাসা আর কাদা কন্ডিশনাল। না-হাসা না কাঁদাটাই সাধনা। বি নিউট্রাল। হৃদয়বান, হৃদয়হীন, একটা নেগেটিভ, একটা পজেটিভ। হৃদয়টাকে সমর্পণ করে দাও। হিন্দি হাম আর ইংরেজি হিম প্রায় একরকম ধ্বনি। হাম মানে হিম। অ-এ আকার আ মানে আমি। আ থেকে দু’বর্ণ স্বরপার্থক্যে ই বসে আছে। ই দীর্ঘ হলেই ঈ। ঈতে ঈগল। ঈগলও ঈশ্বর। ইঁদুরের মতো জীবের অহংকার ছোঁ মেরে নিয়ে যায়। হরিদাকে আমি খুঁজে বের করবই। ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণকে সেই জন্মযোগী নিজের জীবনে একাকার করে ফেলেছে। তোমার কাছে তার ছোট ছবি আছে?
আমার মাথা নিচু। এর চেয়ে লজ্জার কী আছে? তার একটাও ছবি নেই।
ছবি নেই? ছোটখাটো কোনও ছবি?
আজ্ঞে না। তিনি ছবি তোলাতে দিতেন না।
একটা ছবি রাখোনি? আশ্চর্য। তা হলে অনুসন্ধান হবে কী করে?
আমি ভাবছি নিজেই একবার বেরোব। সব তীর্থস্থান ঘুরে ঘুরে দেখব। আচ্ছা আপনি বলতে পারেন, কোন সে নদী! দু’পাশে পাহাড় শ্রেণি। নদীতে জল নেই। শুধু নুড়ি পাথর। বড় ছোট নানা মাপের। হঠাৎ হুড়হুড় করে জল নামে। কূল ছাপিয়ে যায়। পরক্ষণেই আবার সেই নুড়ি। জায়গাটা খুব শীতল।
কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, মনে হচ্ছে লিডার। পহেলগাঁওতে ওই নদী। পাহাড়ের ওপরে বৃষ্টি নামলেই জলে ভরে যায়। জল গড়িয়ে নীচের দিকে চলে যাবার পরেই শুকনো। কেন বলো তো?
এমনি। হঠাৎ মনে হল তাই।
হঠাৎ টেলিফোন বাজল। ভদ্রলোক ঝটিতি রিসিভার তুলে বললেন, হ্যাললো।
২.১৭ As face reflects face in water
আমি তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। কানে রিসিভার। ওপাশ থেকে কোন সংবাদ ভেসে আসছে বোঝার উপায় নেই। তবে সুরঞ্জনার বাবার মুখের চেহারা যেন পালটাচ্ছে। টেলিফোন ধরা বা করার সময় বোঝা যায় নিজের ওপর একজন মানুষের কতটা নিয়ন্ত্রণ। সুরঞ্জনার বাবা শান্ত স্থির, সংযত। শুধু শুনে যাচ্ছেন। কোনও কথা নেই। সব শেষে স্থির গলায় একটি কথাই বললেন, আমি আসছি। ধরে রাখুন।
ফোন নামিয়ে আমাদের কাছে এসে বসলেন। পরিবারের সকলের এমন ট্রেনিং, কেউ কোনও কৌতূহল প্রকাশ করলেন না, কার ফোন, কী ফোন? সবাই কিন্তু টানটান হয়ে ছিলেন। সকলেই একটি সংবাদের প্রতীক্ষায়। কোথায় সে? নিজের মন দিয়ে অন্যের মন বুঝতে পারি! দূর থেকে যখন দেখি বাড়ির দিকে পিয়ন ভদ্রলোক এগিয়ে আসছেন, আমার হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়।
গলা শুকিয়ে আসে। সুরঞ্জনার বাবা কিছুক্ষণ বসে রইলেন স্থির হয়ে। আমরা সকলে নীরবে তাকিয়ে আছি তার মুখের দিকে। হয়তো কিছু বলবেন। সুরঞ্জনার মা কাঠের পুতুলের মতো হয়ে গেছেন। সুরঞ্জনার বাবা অবশেষে বললেন, একটা খবর এল। বিলুর ব্রিফকেসটা পাওয়া গেছে।
সুরঞ্জনার মা সামান্যতম উত্তেজনা না দেখিয়ে শান্তভাবে বললেন, আর বিলু?
কোনও সন্ধান নেই। ব্রিফকেসটা খগপুরের লেফট লাগেজে জমা পড়েছিল। টোকেন নাম্বার টু থ্রি। কেসটা কলকাতায় এসেছে। আমি একবার যাই। দিস ইন্ডিকেটস, বিলু আর নেই। তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। মোটিভ? হয় নির্ভেজাল ডাকাতি, হয় কোনও ষড়যন্ত্র। হোয়াটেভার ইট মে বি, বিলু আমাদের জীবনে আর ফিরছে না! ক্লোজড চ্যাপ্টার। ঠিক এই সময় আমি ফিল করছি হরিদার অভাব। হরিদার গিয়ার যদি আমি পেতুম! হিজ ব্যালেন্স অ্যান্ড কন্ট্রোল। তার ডাইভারশন ট্যাকটিক্স। তার বিচার।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি উঠে দাঁড়ালেন, আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, কিছু করার নেই। টেক ইট ইজি, টেক ইট ইজি। মানুষের জীবনে কখনও কখনও এইরকম হয়। অন্য পরিবারে না হয়ে আমাদের পরিবারে হয়েছে। দি চপার ফেল অন আস।
