আমি পায়ে পায়ে শহরের রাস্তায় গাঁয়ের লোকের মতো লম্বা লম্বা বারান্দা ধরে এগোলেও, মুকু একেবারেই স্বাভাবিক। তরতর করে চলেছে। যেন নিজের বাড়ি। এই বাড়ির সঙ্গে মুকুকে বেশ মানিয়ে গেছে। সুরঞ্জনা আর মুকু দু’জনেই সমানে সমান। হঠাৎ আমার মাথায় আর একটা চিন্তা খেলে গেল। সুরঞ্জনার দাদা যদি ফিরে আসেন তা হলে আমি নিজে সম্বন্ধ করে মুকুকে এই বাড়ির বউ করে দেব। যা মানাবে! সাংঘাতিক!
আমরা অবশেষে একটা বড় ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালুম। সামনের দেয়ালে, একেবারে মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত লম্বা বিশাল এক পেন্টিং। ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ সমাধিস্থ। ছবিটি দেখামাত্রই মনে হল নিজের পরিবেশ ফিরে পেলুম। ঘরে খুব কাজ করা পুরু একটা কার্পেট পাতা। কার্পেটে দশ-বারোজন মহিলা বসে আছেন বিভিন্ন বয়সের, ঘর আলো করে। শ্রীরামকৃষ্ণের ছবির একপাশে মা সারদা, অন্যপাশে স্বামী বিবেকানন্দ। সিলিং-এ একটা ঝাড়বাতি। ঠাকুরের পায়ের কাছে একটা পাথরের বেদি। ধূপ জ্বলছে। ঠাকুরের দিকে মুখ করে লম্বা চওড়া এক ভদ্রলোক উপবিষ্ট। সিল্কের ধুতি উত্তরীয়। একপাশে অর্গানে বসেছেন এক মহিলা। ব্যক্তিত্বপূর্ণ চেহারা। দেখলেই মনে হয় পাঞ্জাবি। বাঙালির এমন দীর্ঘ ওয়ালনাটের মতো চেহারা কদাচিৎ দেখা যায়। সুরঞ্জনার মুখের সঙ্গে ভীষণ মিল। সুরঞ্জনার মা-ই হবেন। আমরা পা টিপে টিপে প্রায় নিঃশব্দে কার্পেটের একপাশে বসে পড়লুম। আর সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হল আরত্রিক ভজন, খণ্ডন ভববন্ধন বন্দি তোমায়।/ নিরঞ্জন নররূপধর নিগুণ গুণময় ॥ সাদা মার্বেল পাথরের বেদি। সার সার ফিনফিনে লাল গোলাপ। ধূপের ধোঁয়ার কুণ্ডলী। অর্গানের গম্ভীর সুরেলা আওয়াজ। ইমনে বাঁধা ভজন। দখিনা বাতাস। রমণীয় রমণীকুল। স্বর্গ যেন স্লিপ করে পৃথিবীতে নেমে এসেছে। আমার একপাশে মুকু, অপর পাশে সুরঞ্জনা। একেবারে সামনে রক্তলাল ব্লাউজ পরা একটি মেয়ে। সামনে ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ। জননী সারদা। বিশ্ববিবেক বিবেকানন্দ। মাথার ওপর টিংলিং ঝাড়। বড় নেশা। জীবনের নেশা। বেঁচে থাকার কারিগরি। সবাই গাইছেন। আমি আর স্থির থাকতে পারলুম না। ধরে ফেললুম নিখুঁত সুরে। কোনও জায়গাতেই ছুট হবার সম্ভাবনা নেই। বহুবার গেয়েছি এই আরত্রিক সংগীত। আমার গলা ডি শার্পে খেলে। এঁরা ধরেছেন সি-তে। আমার কাছে মাখন। ভজন একসময় শেষ হল। ভদ্রলোক আরও কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন ধ্যানে। নিশ্চল প্রস্তরমূর্তি। একসময় সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করে উঠে দাঁড়ালেন। যেন অ্যাটলাস। অর্ধনিমীলিত চোখে একবার তাকালেন সকলের দিকে। খুব ছোট নিটোল চমচমের মতো প্রসাদ হাতে হাতে আমার হাতেও এল। অপূর্ব স্বাদ। ভুরভুরে গোলাপের গন্ধ।
সুরঞ্জনা ভদ্রলোকের সামনে আমাকে হাজির করল। পরিচয় আর কী দেবে! আমার পরিচয় আর কতটুকু জানে। নিজেকেই নিজের পরিচয় দিতে হল। কী-ই বা আমার পরিচয়। আমার পিতার পরিচয়ই পরিচয়। যেই বললুম আমার পিতার নাম শ্রীহরিশঙ্কর, তার কপালে তিনটে ভাঁজ পড়ল।
হরিশঙ্কর! স্কটিশে পড়তেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ!
তিনি সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। বিশাল বুকে আমি এক ঘুঘু। আমার মাথাটা তার বুকের কাছে। এত লম্বা তিনি।
আমাকে বুকে চেপে ধরে বললেন, তুমি হরিশঙ্করের ছেলে! হরিশঙ্কর আমার এক বছরের সিনিয়ার। হি নেভার স্টুড সেকেন্ড ইন এনি এগজাম। যেমন অঙ্কে তেমনি ইংরিজিতে। আমি হরিদার কাছে অঙ্ক শিখেছি। হি ওয়াজ মাই টিচার। তুমি আমার গুরুপুত্র।
আমি আর মুকু তাকে প্রণাম করলুম।
মেয়েটি কে?
আমার মাসতুতো বোন।
বেশ দেখতে তো। দেবীর মতো। যোগাসন করো?
আজ্ঞে না।
আসন করবে। অ্যান আউন্স অফ একস্ট্রা ফ্যাট। আমি, সুরঞ্জনা, আমার স্ত্রী, আমরা সবাই আসন করি। একটা দিনও ফেল করি না।
সুরঞ্জনার মা এসে দাঁড়িয়েছেন। আমরা তাকেও প্রণাম করলুম। ঠাকুরঘর ছেড়ে বসার ঘরে এসে বসলুম। দেয়াল দেখা যাচ্ছে না, সবই বই। সুন্দর একটা লাইব্রেরি। ভদ্রলোক ধুতি আর পাঞ্জাবি পরে এসে বসলেন। মেহগনি কাঠের ঝকঝকে সুন্দর টেবিল। সুন্দর টেবিলে ভীতিপ্রদ একটা জিনিস পড়ে আছে। ভয়ে ভয়ে আমাকে সেদিকে তাকাতে দেখে ভদ্রলোক বললেন, রিভলভার আগে কখনও দেখেনি, তাই না? বড় সুন্দর জিনিস। মসৃণ। শক্তিশালী। ক্লোজ রেঞ্জ থেকে একবার ট্রিগার টিপলেই ভবের খেলা শেষ। আমার দুই সঙ্গী, ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ আর এই মারণাস্ত্র। দুটোই মুক্তির পথ। জীবন্মুক্তি আর দেহমুক্তি। তোমার চোখের সামনে থেকে এটা সরিয়ে রাখব?
মুকু আমার পাশে বসে ছিল, সে বললে, থাক না। বেশ সুন্দর দেখতে। গুলি কি ভরা আছে কাকাবাবু? মুকু সম্পর্ক স্থাপন করে ফেলল। মুকুর নিমেষে এই আপন হয়ে যাবার ক্ষমতা তুলনাহীন।
হ্যাঁ মা। লোডেড। তবে লক করা আছে। এখন বলল, হরিদার জন্যে কী করা যায়? সুরঞ্জনা আমাকে বলেছিল তোমার কথা। তবে ও তো আমাকে তখন নাম বলতে পারেনি! হরিদার হঠাৎ কী হল! সে তো জীবনকে ভালবাসত। আমাদের বলত, সমুদ্রে নামলে ঢেউ তো খেতেই হবে। যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই তো করতেই হবে। ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে আমাদের সঙ্গে ব্যায়াম করত। বলত, নড়বড়ে রুণ শরীর নিয়ে ধর্ম অর্থ মোক্ষ কাম কোনওটাই হয় না। পৃথিবীটা কল্পনার জায়গা নয়, কাজের জায়গা। ঘোড়াকে দেখে শেখো। ঘোড়া কি কবিতা লেখে? অলওয়েজ অন দেয়ার লেগস। ঘোড়ার শোয়া মানেই মৃত্যু। গতি, বীরত্ব, বিশ্বস্ততা এই তিন গুণের চেহারা হল ঘোড়া। আমরা হরিদাকে কখনও বসে থাকতে, গালগল্প করতে দেখিনি। ডে ড্রিমিং-এর ঘোরতর বিরোধী। মহাত্মা গান্ধীর মতো সত্যের পূজারি। বলত, মাই এক্সপেরিমেন্ট উইথ ট্রুথ। সেই মানুষের হঠাৎ কী হল!
