নিরুদ্দেশের ধুম পড়ে গেছে।
মুকু আমার দিকে তাকিয়ে বললে, কী, যাবে নাকি?
যেতে পারি। আমাদের তো এখন কোনও কাজ নেই।
আমার মতলব অন্য। সুরঞ্জনাদের বাড়িতে গেলে বেশ কিছুটা সময় কেটে যাবে। মুকু যা একগুঁয়ে, আজ রাতে তা না হলে আমাকে মদ খাইয়ে দিদির সামনে একটা কেলেঙ্কারি করিয়ে ছাড়বে।
মুকু বললে, বেশ তা হলে চলো।
সুরঞ্জনা বললে, তা হলে আমি মাকে প্রণাম করে আসি। তোমরা গাড়িতে বোসো।
তুমি এসো না! আমরা এখানেই আছি।
সুরঞ্জনা হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেল। গাড়িটা রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়ে রইল।
মুকু সেই দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বললে, ভীষণ স্মার্ট মেয়ে। এর প্রেমে তো তুমি। পড়বেই। চাবুকের মতো চেহারা। হাত কেন, পায়ে ধরতেও তুমি প্রস্তুত, কী বলে?
আমি সহজে অত টলি না, মুকু।
তাই নাকি মহারাজ? গোল্লা গোল্লা চোখে তো তাকিয়ে আছ?
আমার হঠাৎ মনে হল, আসন না করলে এমন স্লিম চেহারা হয় না।
সব জরিপ করা হয়ে গেছে? ভাইট্যাল স্ট্যাটিসটিক্স?
তোমাকে আমি পারব না মুকু। তুমি আমার মনের আয়না। ধরেছ ঠিক। কী করব বলো? আমি। পারি না। বারেবারে হেরে যাই।
এসো আজ আমরা একটা কাজ করি। আমরা গাড়ির ড্রাইভারকে বলে সরে পড়ি। তোমার এই সেতুটাও পুড়ে যাক। মহারাজের কাছে তো তোমার দফারফা করে দিয়ে এসেছি। এটাও শেষ করে দিই। তা না হলে এই আকর্ষণও তোমাকে কিছুদিন ঘুরিয়ে মারবে। এই মেয়েটির নাকে দড়ি দিয়ে । ঘোরাবার ক্ষমতা আছে। এর দেহ-লক্ষণ ভাল নয়।
তোমার ওটাও কি সাবজেক্ট ছিল?
আমার মায়ের কাছে শেখা। হস্তিনী, পদ্মিনী, শঙ্খিনী। এ তোমার শঙ্খিনী। লম্বা, একহারা। পুরুষালি চেহারা। হাত পা লম্বা লম্বা। বুক তেমন উঁচুনয়। সাপের ফণার মতো গলা। ধারালো মুখ। গাদা গাদা ছেলেকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাবে। বেশ স্বার্থপর। কাজের সময় কাজি, কাজ ফুরোলেই। পাজি। যে-কোনও কাজ আদায়ের জন্যে এর ছলাকলার শেষ থাকবে না। এর পক্ষে পরপর তিন-চারবার বিয়ে করাও অসম্ভব নয়। কোনওদিনই সেই অর্থে সংসারী হবে না। এর খপ্পরে যে পড়বে। হয় তাকে আত্মহত্যা করতে হবে, না হয় সারাজীবন কেঁদে বেড়াতে হবে। ধরবে, সব শুষে নিয়ে ছিবড়ে করে ফেলে দেবে। এর আকর্ষণও হবে ভয়ংকর। ভীষণ রাগী। এখন দেখো কী করবে?
যা মনে এল, জ্যোতিষীর মতো গড়গড় করে বলে গেলে। যার এত ভক্তি, মায়ের সামনে বসে যেভাবে কাঁদে, সে কেমন করে ছেলেধরা হয় মুকু?
তুমি কেমন করে মেয়েধরা হলে প্রভু? নিজেই দেখো। তুমি নিজেই কতরকমের। কত রূপ তোমার? চলো ক্লিন সরে পড়ি।
সেটা খুব খারাপ হবে। প্রচণ্ড অভদ্রতা হবে। অশিক্ষিতের মতো কাজ হবে। তোমাকে আজ আমি এই মন্দিরের সামনে বলছি, মা আমার সাক্ষী, তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা। তুমি আমাকে বিশ্বাস করো।
ওদের বাড়ি একবার যাওয়া মানে, তুমি বারেবারে যাবে। তোমার ধর্মকর্ম, লেখাপড়া, জীবন যৌবন সব যাবে।
তোমার মাথা!
এখন আমার মাথা তো! কয়েকদিনের মধ্যেই তোমার মাথা হবে, এইটা তুমি লিখে রাখতে পারো। এই মেয়ে তোমাকে ভালবাসবে না, তোমাকে ব্যবহার করবে, জুতোর মতো, তোয়ালের মতো, চিরুনির মতো, হাত ধোয়ার গামলার মতো, গা রগড়াবার ছোবড়ার মতো। এইবার কী করবে দেখো।
আমরা যাব। আমার পিতার শিক্ষা, ডোন্ট বি ইনডিসেন্ট। কথা দিলে কথা রাখবে। হ্যাঁ বলবে তো হ্যাঁ, না বলবে তো না। ভদ্রতা, সভ্যতা তোমার নিজের অলংকার।
তা হলে চলল। দেখা যাক তোমার বরাতে কী আছে! দেখি ইঁদুর শেষপর্যন্ত কলে পড়ে কি না!
আমাদের গবেষণা থামতে-না-থামতেই সুরঞ্জনা ফিরে এল। সামনে থেকে দেখে একবারও মনে হল না, মুকু যা বললে তা সত্যি হতে পারে! সুস্থ, সবল, চোখা একটি মেয়ে। তরোয়ালের মতো এগিয়ে আসছে। ঝকঝকে মুখ, ঝকঝকে শরীর। কবিতার মতো।
আমি বুদ্ধি করে সামনের আসনে গিয়ে বসে পড়লুম। সুরঞ্জনা কয়েকবার বললে, পেছনে আসুন, পেছনে আসুন। তিনজনে একসঙ্গে বসি। এড়িয়ে গেলুম, ও চক্করে আমি নেই। কোথা থেকে কী হয় কে জানে বাবা! দু’জনের গজর গজর লেখাপড়ার আলোচনা চলেছে। মাঝে মাঝে হাসি হচ্ছে। গাড়ি চলছে। আমি কলকাতার চলমান দৃশ্য দেখছি। সন্ধ্যা নেমেছে। পুটপুট আলো জ্বলে উঠছে। একটু পরে আলোর চোখ আরও ফুটবে। অন্ধকার আরও একটু ঘন হোক।
সুরঞ্জনাদের সাবেক বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়াল। বিশাল বাড়ি। ফটকে মার্বেল স্ল্যাব। লেখা রয়েছে, শান্তিধাম। বড় বাড়ি দেখলে ভয় করে। ভেতরে কোন অহংকারের পরিবেশে গিয়ে পড়ব কে জানে! পুলিশের বড়কর্তা মানে আই পি এস। সায়েবি মেজাজের মানুষ হওয়াই স্বাভাবিক। ড্রেসিং গাউন। মুখে পাইপ কি চুরুট। চিবিয়ে চিবিয়ে কথা। সেই মানুষের স্ত্রীর ঠাট আর ঠমক কেমন হবে তাও তো জানি না।
ভয়ে ভয়ে প্রবেশ। চকমেলানো বাড়ি। মাঝে বাঁধানো উঠোন। লাল রক। ঘর। ঘরের পর ঘর। সবই বেশ পরিষ্কার। ঝকঝকে তকতকে। কোথাও অর্গান বাজছে। গম্ভীর সুরে। চওড়া সিঁড়ি ধাপে ধাপে দোতলায় উঠছে। লোহার ঢালাই রেলিং। অর্গানের সুর আরও সুস্পষ্ট হল। দোতলার বারান্দা। আমরা এগিয়ে চলেছি। দরজার পর দরজা। সুরঞ্জনা সামনে, পেছনে মুকু, সব পেছনে আমি। বারান্দার বাহার দেখে মুগ্ধ আমি। বড়লোকরা বাঁচতে জানে। বারান্দায় চিক ঝুলছে। গোটানো। প্রয়োজনে নামানো হবে। পেতলের টবে ভাল ভাল গাছ। ফার্ন। পাম। অর্কিডও ঝুলছে ছাড়া ছাড়া। সাদা শ্বেতপাথরের মেঝে। কোথাও এতটুকু দাগ নেই। আমার মাথা ঘুরে যাচ্ছে। কী কাণ্ড রে ভাই! ক্রমশই আমি যেন ছোট হয়ে যাচ্ছি। নেংটি ইঁদুরের মতো। এই বাড়ির মেয়ে সুরঞ্জনা? আমি তার আঙুল নিয়ে খেলা করেছি! অল্প অল্প ডিগবাজি খাওয়ার ভাবও হয়েছিল। মিথ্যে কথা বলব না। ইংরেজি ফিলমের নায়িকার মতো দেখতে যাকে, সে তো টাল খাওয়াবেই।
