তোমার উচিত নিজেকে চেনা। নিজেকে নিজে ঠকিয়ো না।
তা বলে আমাকে মদ খেয়ে পরীক্ষা করতে হবে?
মদ খেলে কী হয় জানো? আমি দেখেছি। কেউ ভেউ ভেউ করে কাঁদে। কেউ হোহো করে হাসে। কেউ কঁচা খিস্তি করে। কেউ ভোম মেরে বসে থাকে। কেউ তার ব্যর্থ প্রেমের কথা বলে। কেউ তার দুঃখ ও আশঙ্কার কথা বলে। কেউ পরিবারকে গালাগাল করে। কেউ তার গোপন পাপের কথা বলে গড়গড় করে। কেউ মা মা বলে চিৎকার করে শ্যামাসংগীত গায়। কেউ আবার মেয়েছেলের জন্যে খেপে ওঠে। মানুষের ভেতরটা বেরিয়ে আসে। প্লিনি সেই কোন কালে বলে গেছেন, In vino veritas. Truth is in wine. আমি একবার খুব খেয়েছিলুম। মীরাবাঈ হয়ে। সারারাত সে কী নাচ! ময় সে গরজ নিশাত হৈ কিস রূসিয়াহ কো।/ইক গুনা বেখুদি মুঝে দিন রাত চাহি এ ॥ মজা লুটতে মদ খেয়েছে কোন সে মুখপোড়া? দিবারাত্তির একটু ভুলে থাকার জন্যেই মদ খায় গালিব।
মদ নিয়ে ডিবেটের ফাঁকেই ট্রামটা গড়গড় করে ডিপো ছেড়ে বেরিয়ে গেল। ট্রামের আর কীসের মাথাব্যথা! পৃথিবীর যাবতীয় মূল্যবান সমস্যার মধ্যে আমাদের এই অদ্ভুত সমস্যা পড়ে না। খাওয়া-পরা আর মাথা গুঁজে বেঁচে থাকার সমস্যা ছাড়া পৃথিবীতে আর কোনও সমস্যা তেমন পাত্তা পায় না। আত্মার সমস্যা তো শৌখিন সমস্যা! ভরা পেট, নরম বিছানা, গরম ঘর, নিত্যানন্দ সঙ্গী, তখনই ওইসব ভুতুড়ে উপদ্রব শুরু হয়। আত্মানং বিজালিখ। জানলেই বা কী? না জানলেই বা কী! পাঁয়তাড়া কষতে কষতেই জীবন ফৌত। নচিকেতা যদি এই শতাব্দীতে জন্মাতেন, তা হলে কি মৃত্যুমহারাজের সঙ্গে অমন অপার্থিব আলোচনা হত। রাজার ছেলে ক্যাডিলাক চেপে লাসভেগাসে ঘুরে বেড়াতেন। সঙ্গে টমটম। বেলোয়ারি সুন্দরী। মার কাটারি। আত্মা তো আছেই। অবিনশ্বর। পুলিপিঠের মতো। দাঁত বসানো যায় না। পটলের মতো, টর্পেডোর মতো আকৃতি। গেলাও যায় না। যমরাজ বারকতক পাগলে উগরে দেন। অতি অখাদ্য। কনসেন্ট্রেটেড মহাজীবন। আত্মা যে দেহের ক্যাপসুলে বৈঠকখানা করেছে, সেইটাই তো সব। একবারের খেলা। একবারই হরিশঙ্করের পুত্র। একবারই মুকুর সঙ্গে মেলামেশা। কখনও তিরস্কার, কখনও ভালবাসা। সব একবার। অদূরেই কাশীমিত্রের শ্মশান। এই মুহূর্তে সেখানে দাহ হচ্ছে আত্মার খোল। নামরূপ পুড়ছে পড়পড় করে। ছেলে কাঁদছে। মেয়ে কাঁদছে। বউ কাঁদছে। সব একবার। জন্ম একবার। সম্পর্ক একবার। পরের বার যদিও আসি, পিতা হবেন না হরিশঙ্কর। মুকু আসবে না ভালবাসতে। আমি থাকব না, তবে মানুষ থাকবে। অসংখ্য মানুষ। পিতাপুত্রের সম্পর্ক থাকবে। প্রেম থাকবে। প্রেমিকা থাকবে।
ঝটিতি একটা ভাবনার স্রোত বয়ে গেল। আর খাস করে একটা মোটরগাড়ি আমাদের পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে থেমে গেল। পেছনের জানলা দিয়ে একটা মুখ বেরিয়ে এল।
সর্বনাশ! সুরঞ্জনা!
নিমেষে দরজা খুলে নেমে এল সুরঞ্জনা। গাড়িটা একটু এগিয়ে গিয়ে রাস্তার ধার ঘেঁষে দাঁড়াল। খেল দেখাল মুকু। আমি মুকুর ভয়েই কাঠ হয়ে দাঁড়িয়েছিলুম। মুকু প্রায় ছুটে গিয়ে সুরঞ্জনাকে জড়িয়ে ধরল, সুরঞ্জনা, আমার নাম মুকু। আমিই সেদিন তোমার গাড়িতে হামলা করেছিলুম। আমি একটু পাগলি আছি তো। তুমি কিছু মনে কোরো না।
রাস্তার মাঝখানে সুন্দরী সম্মেলন। আমি বললুম, সরে এসো, গাড়ি চাপা পড়বে।
দু’জনে প্রায় জড়াজড়ি অবস্থায় পাশে সরে এল। ফরফর করে দখিনা বাতাস বইছে। সুরঞ্জনার সিল্কের শাড়ির আঁচল উড়ছে। আজ যেন সেদিনের চেয়ে সুন্দরী দেখাচ্ছে। সুরঞ্জনা মুকুর চেয়ে লম্বা। বিলিতি ফিগার।
সুরঞ্জনা বললে, সেদিন খুব রাগ হয়েছিল। এই মুহূর্তে সব রাগ জল হয়ে গেল। তুমি ওঁর কে হও?
মাসতুতো বোন।
তাই নাকি? সেদিন ভেবেছিলুম অন্যরকম। ইন ফ্যাক্ট ওঁর ওপর আমার একটা খুব খারাপ ধারণা হয়ে গিয়েছিল। কোন অপরাধে তুমি অমন খামচাখামচি করে নামালে?
ওনার মাথায় ঢুকেছে সন্ন্যাসী হবেন। মাঝে মাঝেই বিবাগী হয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। সাধুসন্ন্যাসীদের আখড়ায় গিয়ে পড়ে থাকে। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া হয় না। আর আমরা ভেবে মরি। একে মা-মরা ছেলে, তায় আবার পিতা নিরুদ্দেশ। গত কয়েকদিন বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল। সেদিন পড়বি তো পড় আমার সামনে। পাছে পালায় তাই চেপে ধরেছিলুম। তুমিই বলো, আমি কিছু অন্যায় করেছিলুম?
অবশ্যই না। তুমি যা করেছিলে আমিও তাই করতুম। এত বড় ছেলে, তার কোনও বোধবুদ্ধি থাকবে না?
তুমিই বলো ভাই, আমাকে বিশাল একটা বাড়িতে একা ফেলে রেখে উনি উধাও হয়ে গেলেন। সেই বাড়িতে আবার ভূত আছে।
একদিন আমাকে নিয়ে যাবে তোমাদের বাড়িতে।
আজই চলো।
আমি যে মহারাজের কাছে যাচ্ছি। তোমরা যাবে না?
আমরা তো ঘুরে এলুম। মহারাজ আজ ভীষণ ব্যস্ত লেখা নিয়ে। মুখ তুলে কথা বলার সময় নেই। কারওকে দেখলেই ভীষণ বিরক্ত হচ্ছেন।
তা হলে?
তা হলে আজ আর বিরক্ত না করাই উচিত।
সুরঞ্জনা আমার দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ ভাবল। শেষে বললে, তোমরা আমাদের বাড়িতে চলো! আজ বাবা বাড়িতে আছেন, ওঁর পিতার নিরুদ্দেশের ব্যাপারে কথা বলা যাবে। একটা কিছু করা দরকার তো?
মুকু বললে, তিনি কীভাবে সাহায্য করতে পারেন?
তিনি তো পুলিশের বড় অফিসার। আমার দাদাকেও তো পাওয়া যাচ্ছে না।
