আবার হাঁ করে তাকিয়ে রইলুম, মুখস্থ নেই।
তোমার আর সন্ন্যাসী হয়ে কাজ নেই। ধ্যায়তো বিষয়ান্ পুংসঃ সঙ্গস্তেযূপজায়তে, মনে পড়ছে?
সঙ্গাৎ সঞ্জায়তে কামঃ কামাৎ ক্রোধোছভিজায়তে।
এই তো, খোকার আমার মনে পড়েছে। এইবার চেনটা মনে করো। বিষয়ের চিন্তা করতে করতে জন্মায় আসক্তি। আসক্তি থেকে কাম, কাম প্রতিহত হলে ক্রোধ, ক্রোধ থেকে বিবেকাশ, বিবেকনাশ থেকে শাস্ত্রজ্ঞান লোপ, শাস্ত্রস্মৃতি লোপ, স্মৃতিবিভ্রম মানে সদসবিচারবুদ্ধি বিনষ্ট, বিচারবুদ্ধি গেলে রইলটা কী? পুরুষার্থের অযোগ্য। তা হলে? একটাই পথ। আমার হাতে পায়ে ধরো, প্রার্থনা করো। আমি মায়া, কিন্তু আমি যেন তোমার বিদ্যা-মায়া হই। তা হলে যদি কোনও রাস্তা হয়!
আমি কেমন করে করব? ও তো তোমার হওয়ার ব্যাপার। তুমি হবে। তুমি আমাকে বিবেক আর বৈরাগ্য দেবে।
বিবেক তোমাকে আমি অনবরতই দিচ্ছি আর বৈরাগ্যের পথ খুলে দিয়ে গেছেন মেসোমশাই। তুমি তো মহাভাগ্যবান। সংসারে তোমার কেউ নেই। সব ফাঁকা। তোমার সব বাঁধনই তো তিনি কেটে দিয়েছেন। আর আমি? মুকু খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। বাতাসে চুল উড়ল। কাঁধের কাছে। শাড়ির আঁচল কাপল। হাসিতে শান বাঁধানো ব্যঙ্গ।
মুকু বললে, যে করে তোমার আশ তাকে তো তোমার মতোই করে দেবেন ভগবান। তুমি দেবতার মতো পিতা দেখেছ। মহারাজেরও মহারাজ। তুমি সঙ্গমরত পিতা দেখেছ? বয়েসের ভারে স্থবির তবু.. মুকু হঠাৎ গান গেয়ে উঠল সুন্দর গলায়,
এখনও গেল না আঁধার, এখনও রহিল বাধা।
এখনও মরণব্রত জীবনে হল না সাধা ॥
কবে যে দুঃখজ্বালা হবে রে বিজয়মালা।
ঝলিবে অরুণরাগে নিশীথরাতের কাঁদা ॥
এখনও নিজেরই ছায়া রচিছে কত যে মায়া।
এখনও কেন যে মিছে চাহিছে কেবলি পিছে,
চকিতে বিজলি-আলো চোখেতে লাগাল ধাঁদা ॥
গান শেষ করেই মুকু বললে, আই হেট মাই ফাদার। পরিচয় দিতে লজ্জা করে। পরিচয় মুছে ফেলাও যায় না। এক জরদগব গদগদে মহিলাকে আঁকড়ে আঁকড়ে ধরছে। সে দৃশ্য সারা জীবনেও ভোলা যাবে না। প্রেম এক জিনিস, কাম আর এক জিনিস। একটা স্বর্গীয় আর একটা পাশবিক। একটা আলো আর একটা অন্ধকার। তোমার মধ্যে কাম দেখলে আমার পেটাতে ইচ্ছে করে। চলো, এই সংসারে কিছু নেই, বেরিয়ে পড়ি দু’জনে। যথা বালস্য বেতালো মৃত্যুপর্যন্ত দুঃখদঃ। অসদেব সদাকারং তথা মূঢ়মতের্জগৎ ॥ অবশ্যই মানে বুঝলে না। বুঝলে তারিফ করতে। বালকের কল্পনায় আছে ভূত। আমরণ সেই ভূত তাকে ভয় দেখায়। ঠিক সেইরকম অজ্ঞানীর কাছে এই জগৎ এক ভীষণ সত্য। মৃত্যু পর্যন্ত সে এর সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে। সোমশর্মার পিতার গল্প জানো? জানো না। কেমিস্ট্রি ছাড়া কিছুই জানেন না। একমুখী জ্ঞান। অতি দরিদ্র কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষী। দেশে তখন আকাল, দুর্ভিক্ষ। একমুঠো ছাতু কাপড়ে বাঁধা। কোনওক্রমে সংগ্রহ করেছে। ভীষণ শ্রান্ত। একটা গাছের তলায় এসে বসেছে। ছাতুর পুঁটলিটা খুলে হাতে সব ঢেলেছে। এইবার সেই ছাতুর দিকে তাকিয়ে সে ভাবছে, ছাতুটা সে বিক্রি করবে। যে-পয়সা পাবে সেই পয়সায় সে গোরু কিনবে। ক্রমে গোরুর বংশ বৃদ্ধি হবে। অনেক বলদও হবে। সেই বলদ দিয়ে হবে চাষবাস। ধনে ধানে সে তখন বড়লোক। বিশাল বাড়ি, দাস-দাসী। ঐশ্বর্য দেখে সুন্দরী কন্যার পিতা ছুটে আসবে। বিয়ে হবে। একটি ছেলে হবে। ছেলের নাম রাখব সোমশর্মা। প্রিয়পুত্র। তার অনাদর হলেই বউকে মারব এক চড়। হাতের সব ছাতু মাটিতে পড়ে, বাতাসে উড়ে গেল হুস করে। লোকটি তখন বিলাপ করতে লাগল, হা কষ্ট! আমি কী মন্দভাগ্য। এত কষ্টের সংগ্রহ আমার সব ছাতু কোনও কাজেই লাগল না। তখন শাস্ত্রকার বলছেন, অভুতাভিনিবেশেন স্বাত্মানং বঞ্চয়ত্যয়ম। অসত্যপি দ্বিতীয়েছর্থে সোমশর্মপিতা যথা। যা মিথ্যা, যা কল্পনা, তাতে মশগুল হয়ে গেলে আসল জিনিস হারাতে হয়। সব মিথ্যা। সব ভ্রান্তি। কামুক কী ভাবে জানো, আহা! কী সুন্দর ভুরু, কী সুন্দর নাক, কী সুন্দর মুখ, কী অপূর্ব চোখ, কী মোহিনী হাসি, হচরপাঁচর করে জড়িয়ে ধরলে। আসলে কী, একটা শরীর। তোমার কেমিক্যাল অ্যানালিসিসে কী বেরোবে, হাড়ের খাঁচা, মেদের স্তর, মাংসের প্রলেপ, চামড়ার আস্তরণ, লিভার, পিলে, মল, মূত্র, কফ। অবিদ্যার এই হল প্রভাব। অনিত্যে নিত্যবুদ্ধি, অশুচিতে শুচিবুদ্ধি, অনাত্মাতে আত্মবুদ্ধি, দুঃখে সুখবুদ্ধি করিয়ে ছাড়ে। মানুষকে উট করে দেয়। কাটাগাছ চিবোচ্ছে, রক্ত গড়াচ্ছে দু’কষ বেয়ে। চলো, তোমাকে আজ আকণ্ঠ মদ খাওয়াব।
মদ!
হ্যাঁ মদ। মদ খেলে মানুষের আসল প্রবৃত্তি জেগে ওঠে। আমি পরীক্ষা করে দেখব, তোমার ভেতর ঠিক ঠিক কী আছে? কে আছে?
মুকু ঝেড়েঝুড়ে উঠে পড়ল।
.১৬ We’re always too much out or too much in
মুকু বললে, সময় নষ্ট না করে ট্রামে উঠে পড়ো। শ্যামবাজারে নেমে আমরা একটা ভাল দোকান থেকে বোতলটা কিনব। আজ তোমার পরীক্ষা। দেখতে চাই শয়তান বসে আছে, না দেবতা! কে বসে আছে?
আমি প্রতিবাদ না করে পারলুম না, আমাকে কি তুমি মানুষ-গিনিপিগ ভাবলে মুকু? তোমার মাথার সব স্তু ঢিলে হয়ে গেছে। কেউ ওইভাবে মদ খায়! বেশি মদ খেলে মানুষ মাতাল হবেই। জানা কথা। ওটা কোনও পরীক্ষা নয়। পাগলামি। আমার এই দুর্দিনে আমাকে নিয়ে আর খেলা কোরো না। তুমি যেন বেড়াল, আর আমি একটা ইঁদুর। তুমি কেমন করে ভাবলে, তোমার পরীক্ষার জন্যে আমি মদ গিলব। আমার একটা মান-সম্মান নেই!
