মুকু বললে, ও চাইছে ওর বাবাকে কপি করতে। ওর কম্পিটিশন তত মেসোমশাইয়ের সঙ্গে। অসম প্রতিযোগিতা! জীবনে যা পারবে না কোনওদিন। শেয়াল কোনওদিন বাঘ হতে পারে, না পারবে?
রাগে আমার গা জ্বালা করছে। মুকু আমাকে একবার করে তুলছে, একবার করে ফেলছে। আছড়ে আছড়ে আমাকে মেরে ফেলতে চায়।
মুকু বলেই চলেছে, ও ভীষণ নিজের প্রশংসা শুনতে ভালবাসে। ও যে একটা কেউকেটা, জগৎকে দেখাতে চায়। আপনার মতো মহারাজ হবে। সবাই শ্রদ্ধা করবে, ঢিপ ঢিপ প্রণাম করবে। কী? না সন্ন্যাসী হয়েছেন!
মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলুম, মুখে আর নয়, এইবার কাজে। এক ঝটকায় নিজেকে বের করে নিয়ে চলে যাব। একজনের পরিবার বললে, অমুক লোকের ভারী বৈরাগ্য হয়েছে, তোমার কিছু হল না! যার বৈরাগ্য হয়েছে, সে লোকটির যোলোজন স্ত্রী, এক-একজন করে তাদের ত্যাগ করছে। স্বামী নাইতে যাচ্ছিল, কাঁধে গামছা, বললে, খেপি! সে তোক ত্যাগ করতে পারবে না, একটু একটু করে কি ত্যাগ হয়? আমি ত্যাগ করতে পারব। এই দেখ, আমি চললুম। সে বাড়ির গোছগাছ না করে, সেই অবস্থায় কাঁধে গামছা, বাড়ি ত্যাগ করে চলে গেল। এরই নাম তীব্র বৈরাগ্য। জ্ঞানই হবে আমার আশ্রয়। আমি যদি জ্ঞানী হতে পারি, আমার আচরণে দুটো লক্ষণ দেখা যাবে। আমার কূটস্থ বুদ্ধি হবে। সে বুদ্ধি আবার কেমন বুদ্ধি, হাজার দুঃখ কষ্ট, বিপদ-বিঘ্ন হোক– নির্বিকার, যেমন কামারশালার লোহা, যার ওপর হাতুড়ি দিয়ে পেটে। আর দ্বিতীয়, পুরুষকার খুব রোখ। কাম-ক্রোধ আমার অনিষ্ট করছে তো একেবারে ত্যাগ! কচ্ছপ যদি হাত-পা ভিতরে সাঁদ করে, চারখানা করে কাটলেও আর বার করবে না।
মহারাজ আমার চিন্তাকে টেনে নিয়ে গেলেন, বললেন, বৈরাগ্য দু’প্রকার। তীব্র বৈরাগ্য আর মন্দা বৈরাগ্য। মন্দা বৈরাগ্য হচ্ছে হবে– ঢিমে তেতালা। তীব্র বৈরাগ্য–শাণিত ক্ষুরের ধার–মায়াপাশ কচকচ করে কেটে দেয়। এইবার নিজের অবস্থা নিজেই বিচার করো। ফেরিঅলার মতো দোরে দোরে ঘুরো না। প্রচারধর্মী হয়ে সন্ন্যাসের আদর্শকে হাস্যকর করে তুলো না। অবিশ্বাসকারীর সংখ্যা কম নয়।
আমি খুব বিনীতভাবে বললুম, মহারাজ, আজ তা হলে আমরা আসি।
এসো। তোমার চেয়ে এই মেয়েটিকে আমার বেশি ভাল লেগেছে। ভেতরে একটা ফায়ার আছে। কী নাম মা তোমার?
আমার ডাক নাম মুকু, মহারাজ।
বাঃ বেশ সুন্দর নাম।
মহারাজ পর মুহূর্তেই লেখায় মুখ নামালেন। আমি অপরাধীর মতো, মুকু বীরের মতো, বেরিয়ে এলুম দু’জনে। মুকু রাস্তায় নেমে বললে, তোমার কেসটা মোটামুটি ড্যামেজ করতে পেরেছি। মেরামতের বাইরেই চলে গেছে ধরে নাও। এবার একা-একা এলে তোমার যা রিসেপশন হবে, ভাবা যায় না। তবে হ্যাঁ, আমি এলে অন্যরকম হবে। বুঝতেই পারছ, এখন থেকে সংসার ত্যাগ করতে হলেও তোমাকে আমার সাহায্য নিতে হবে। রাম লক্ষ্মণ সীতা, দৃশ্যটা একবার কল্পনা করো। যার কাছে এসেছিলে তার কথাতেই বলি। তোমার তো কিছু মনে থাকে না। ভাসাভাসা পড়া। পড়লে আর ভুললে।
আমরা বেড়াতে বেড়াতে হাঁটছি। গঙ্গার দিকে, ট্রাম ডিপো লক্ষ্য করে। সামনেই কালীবাড়ি। বহু প্রাচীন। সেখানে এক জ্যোতিষী মায়ের সামনে বসে এক মহিলার হাত দেখছেন। আমারও ইচ্ছে করছিল হাতটা মেলে ধরি। মুকু ধমকাবে, কুসংস্কার! বলবে, পুরুষকারই ভাগ্য। বলবে, মেসোমশাই বলতেন, রোজ সকালে পরপর সাত দিন দুটো করে হাফবয়েল চালাও, ভাগ্যবিশ্বাস চলে গিয়ে পুরুষকারে বিশ্বাস ফিরে আসবে।
আমরা এক ঝলক গঙ্গাদর্শনের জন্যে জল ঢোকার সুইস গেটের দিকে এগিয়ে গেলুম। মুকু বললে, এসো একটু বসি দু’জনে। ধর্ম আলোচনা করা যাক।
জায়গাটা তেমন পরিষ্কার নয়। একটু ইতস্তত ভাব হচ্ছিল। মুকুর শাড়িটা একেবারে পাটভাঙা। আবার এক দাবড়ানি, অত পিটপিটে স্বভাব হচ্ছে কেন? এই নাও ফুঁ দিয়ে ধুলো উড়িয়ে দিলুম, বোসো।
বসেই পড়লুম, যা থাকে বরাতে! মুকু হাত দুয়েক তফাতে বসল। সূর্য ডুবে গেছে। পশ্চিম আকাশের তলার দিকটা ঘোলাটে। গঙ্গার জলে অন্ধকার গুলছে। নৌকো যাচ্ছে অলস গতিতে, হরি দিন তো গেল র ছন্দে।
মুকু বললে, শোনো, ছোট মুখে বড় কথা শোনো। জীবাত্মা আর পরমাত্মার মধ্যে এক মায়া-আবরণ আছে। এই মায়া-আবরণ সরে না গেলে পরস্পরের সাক্ষাৎ হয় না। পরস্পর মানে জীবাত্মা আর পরমাত্মা। যেমন আগে রাম, মধ্যে সীতা আর পেছনে লক্ষ্মণ। রাম হলেন পরমাত্মা আর লক্ষ্মণ হলেন জীবাত্মা, মধ্যে জানকী মায়া-আবরণ হয়ে রয়েছেন। যতক্ষণ মা জানকী মধ্যে থাকেন, ততক্ষণ লক্ষ্মণ রামকে দেখতে পান না। জানকী একটু সরে পাশ কাটালে তখন লক্ষ্মণ রামকে দেখতে পান। শোনো, আমি হলুম সেই মায়া। তোমার আর তোমার ঈশ্বরের মাঝখানে আমি আঁচল মেলে দাঁড়িয়ে আছি। হয় আমাকে সরতে হবে, না হয়, না হয় কী?
প্রশ্নের উত্তর না-জানা বিব্রত ছাত্রের মতো আমি হা করে তাকিয়ে রইলুম। তা হলে কী?
মুকু অসাধারণ একটা হাসি ছাড়ল। উদাস, মিষ্টি। আমার সতীমা ধ্যান ভেঙে যাবার পর ঠিক এইরকম আধ্যাত্মিক হাসি হাসতেন। মুকু বললে, পারলে না তো সমস্যার সমাধান করতে! বৃথাই হল তোমার পড়া লেখা। খনার মতো তোমাকে আমি সবেতেই হারিয়ে দিচ্ছি। আবার শোনো, ট্র্যান্সফর্মেশন, রূপান্তর, তোমার কেমিস্ট্রিতে আছে। মায়ার দুটো রকম– বিদ্যা আর অবিদ্যা। তার মধ্যে বিদ্যা মায়া আবার দু’প্রকার বিবেক এবং বৈরাগ্য। আর অবিদ্যা মায়া ছ’প্রকার কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য। বিদ্যা মায়াকে আশ্রয় করলে তুমি ঈশ্বরের সন্ধান পেলেও পেতে পারো। আর যদি অবিদ্যা মায়াকে আশ্রয় করো তা হলে বুঝতেই পারছ, আমি আর আমার করতে করতেই মরবে। কামের শেষ নেই। সেও এক ভিশিয়াস সার্কল। এক থেকে আর এক। গীতা নিশ্চয় পড়া আছে? দ্বিতীয় অধ্যায়ের বাষট্টিতম শ্লোকটা বলল।
