টাকাটি হাতে তুলে দিয়ে বললেন, কড়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। একটি একটি করে হাঁড়িতে তুলবে যখন, দেখবে। চোখ বুজিয়ে থেকো না। চোখ বুজিয়ে ঈশ্বরদর্শন হয়, জগৎদর্শন হয় না। টাটকা আর বাসি মিশিয়ে ছেড়ে দেবে। এ বড় শক্ত ঠাই, গুরু শিষ্যে দেখা নাই।
বিশাল উনুনে ঢাউস কড়ায় রস ফুটছে। রসে টাবুরটুবুর করছে রাশি রাশি রসগোল্লা। শর্করার গন্ধমাখা ফিনফিনে ধোঁয়া উঠছে বাঁশের বাতার দিকে। কড়ার সামনে নৌকোর হালের মতো কাঠের হাতা নিয়ে টুলে বসে আছেন পরেশদা। চোখের চেহারা দেখেই মালুম হচ্ছে দু’-চার ছিলিম চেপে গেছে। যমরাজ বসে আছেন গাট হয়ে। তপ্ত কটাহে জীবজগৎ হাবুডুবু। ভিয়েন দেখলে ব্রহ্মজ্ঞান হয়। রসে ডু ডুবিয়ে তুলে দেখে ময়রা। এক সুতো। দু’সুতো। পাঁচ সুতায় পাকা পাক। পঞ্চেন্দ্রিয় চুর হলে জীব মুক্তি পায়। সর্বং খন্বিদং ব্রহ্ম।
পরেশদা, এক সের বড় রসগোল্লা।
অপেক্ষা করো, হয়ে এসেছে।
বাঁশের খোটায় হুক লাগানো। সেই হুকে সোনপাপড়ির সুতো লাগিয়ে আর এক ভীমভবানী টানাটানি চালিয়েছে। এও আর এক খেলা। যত টানবে তত খাস্তা হবে। ততই মজবে ভাল। মাঞ্জামারা সোনপাপড়ি। রসের চাঁচর সঁতে কাটবে নাগর। নাগর শব্দটা তেমন ভাল নয়। এসব কথা কেন মনে আসছে! বালযোগী সাবধান। ক্ষুরস্যধারা।
পরেশদা হাঁক মারলেন, নিতাই, নিতাই।
ইজের-পরা নিতাই দোকানের গর্ভগৃহ থেকে বেরিয়ে এল। একসেরি হাঁড়ি আন একটা।
ভিজে হাঁড়ি জল শুষছে। পাশ দিয়ে যাবার সময় ফিসফিস শব্দ ছেড়ে গেল, বড় তৃষ্ণা, বড় তৃষ্ণা। ওজন টোজনের প্রয়োজন হল না। বড় রসগোল্লা ক’টায় এক সের হয় পরেশদার জানা।
ছোট্ট বিড়ের ওপর হাঁড়ি। মুখে শালপাতার আবরণ। পাটের দড়ি দিয়ে কায়দা করে বাঁধা। হাঁড়ি ঝুলছে ডান হাতে। ফাউ চাইলে একটা মুগের নাড়ু মিলত। লোভ জয় করে ফেলেছি। চরিত্রের কী শক্তি! ওদিকে সারি সারি পাঁচপো মাপের হাঁড়ি লাইন দিয়ে বসেছে। দুধে টইটম্বুর, সাজা দিয়ে ফেলে রেখেছে। কাল সকালে জমে দই হবে।
রাতের রাস্তায় নোক চলাচল কমে এসেছে। মধুবাবুর সাইকেল মেরামতের দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। রকে একটা কালো কুকুর শুয়ে শুয়ে গা চাটছে। বেশ গাট্টাগোট্টা চেহারা। কুকুরটা হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে, একটা ডন মেরে রাস্তায় নেমে এল। ভয়ের কিছু নেই। কে চোর, কে সাধু, চেনার ক্ষমতা কুকুরের মতো আর কোনও প্রাণীর নেই। সাধে কুকুর পাণ্ডবদের মহাপ্রস্থানের পথের সঙ্গী হয়েছিল?
আমি চলেছি। পেছন পেছন কুকুর চলেছে ফোঁস ফোঁস করতে করতে। চলতেই হবে, আমি যে ধর্মপুত্তুর যুধিষ্ঠির। মহাপ্রস্থান করার সময় তোকে নিয়ে যাব রে ভুলো। পেছন ফিরে তাকিয়ে একটু সন্দেহ হল। ভুলো আমার সাত্ত্বিক চরিত্রকে অনুসরণ করে আসছে বলে মনে হচ্ছে না তো! ডান হাতে ঝোলানো হাঁড়িটা শুঁকতে শুঁকতে আসছে।
এতে রসগোল্লা আছে মানু। মাংস নেই। গরম রসগোল্লা।
ভুলো রাসকেলের এই মতলব ছিল কে জানত! সামনের দু’পা তুলে মারল টান। হাত ছেড়ে হাঁড়ি পড়ল রাস্তায়। ভটাস করে একটা শব্দ। ঘটাকাশ আর চিদাকাশ এক হয়ে বন্ধনমুক্ত জীবের মতো সাদা সাদা রসগোল্লা। আমরা চললুম পিন্টু, ভুলোর মুখ দিয়েই স্বর্গদ্বারে পৌঁছোব, তোমার পিতৃদেবকে বলে দিয়ো। উপবাসী শয়তান কাবাব জ্ঞানেই রসগোল্লা খেতে লাগল। ন্যাজটি কিন্তু নাড়তে ভোলেনি। শয়তান হলেও কুকুর তো! অন্ধকার রাস্তা। দোকানপাট সব বন্ধ। নর্দমার ধার থেকে আর একটি ছায়ামূর্তি প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে এল। এইবার প্রেতের হাসি। খিলখিলে শব্দ। এ সেই মণিপাগলি। কুকুরটা একটা চাপা গর্জন ছাড়ল। আনন্দমঠের দুর্ভিক্ষের দৃশ্য। পাগলি উবু হয়ে বসে রসগোল্লা খাচ্ছে। প্রায় উলঙ্গ।
মণি কত বড় বাড়ির মেয়ে। দেখতে দেখতে চোখের সামনে কীভাবে পাগল হয়ে গেল! একসময় কী সুন্দর চেহারা ছিল। ভাল ফুল তো ফোঁটার উপায় নেই। মানুষ এসে ছিড়বেই৷ মণিকে যারা শেষ করে গেল, তারা এখন কোন ফুলে গিয়ে বসেছে কে জানে। ডাসা ডাসা ভোমরা উড়ছে। যৌবনের পরাগ ঝরে ঝরে পড়ছে। ভাগ্যিস মেয়েছেলে হইনি। ভাদ্র মাসে ভুলোরা শেষ করে দিত। হে ভারত ভুলিয়ো না তোমার নারীজাতির আদর্শ।
মণিপাগলিকে দেখে মনের জোর বেড়ে গেল। রসগোল্লার বদলে বকুনি খাবার জন্যে আমি এখন প্রস্তুত। প্রমাণ সহ পিতার সামনে উপস্থিত হতে হবে। প্রমাণ ছাড়া তিনি কিছু বিশ্বাস করেন না। ঈশ্বরকে প্রমাণ করা যায় না, সুতরাং তিনি নাস্তি। মাটির হাঁড়ির একটা টুকরো রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নিলুম। ভুলোর একটা টুকরো নিতে পারলে ভাল হত।
মণি গান ধরেছে, হরে কৃষ্ণ, হরে রাম, পেটের ছেলের বড় দাম।
শূন্য হাতে ফিরতে দেখে পিতা বললেন, কী এখনও নামেনি নাকি?
আজ্ঞে হ্যাঁ নেমেছে। আনতে আনতে কুকুরে ছিনিয়ে নিলে। এই যে ভাঙা হাঁড়ির টুকরো। ভুলো আর মণিপাগলি ভাগাভাগি করে খেয়েছে। নির্ভীক স্বীকারোক্তি। বুক ফুলিয়ে সত্যভাষণ। জর্জ ওয়াশিংটন তো তাই করেছিলেন। পিতার শখের গাছ তলোয়ারের এক কোপে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, পিতা, এই অপকর্ম আমি করিয়াছি।
মেসোমশাই মেয়েকে পড়াচ্ছিলেন। মুখ তুলে বললেন, ভগবানের ইচ্ছে নেই হরিদা। আপনি চেষ্টা করলে হবে কী?
