অতিশয় পারদর্শী। গল্প তৈরিতে মহা ওস্তাদ। ওকে দেখার মতো কেউ নেই, তাই আমাকেই কড়া। হাতে শাসনের ভার নিতে হয়েছে। ওর মাথায় সদাসর্বদাই অদ্ভুত সব মতলব খেলা করে।
আমার এইবার আত্মপক্ষ সমর্থনে কিছু বলা উচিত। যেভাবে চিত্রিত হচ্ছি তাতে প্রায় চরিত্রহীনের পর্যায়ে চলে যাচ্ছি।
মাতাল লম্পটরাই রাতে বাড়ি ফেরে না। মেয়ে দেখলেই ল্যাল ল্যাল করে এগিয়ে যায়। ঘোঁতর ঘেতর করে। ও কি তাই? মহারাজ গাড়িতে আপনি আছেন, আমি একবারও লক্ষ করিনি। আমার চোখ ছিল শুধু ওদের দুজনের দিকে। আমাকে আপনি ক্ষমা করবেন আমার অসভ্যতার জন্যে। মুকু ভাবের আবেগে আমার চরিত্র আরও কিছুটা বিপর্যস্ত করে দিল। মেরামতের বদলে ভেঙে দিল অংশে অংশে, খণ্ডে খণ্ডে।
মিউমিউ করে স্বর বেরোল, যেন ছুঁচো, আমার কিছু বলার ছিল। আমি সুরঞ্জনার দিকে চেপে ছিলুম কোনও বদ মতলবে নয়, মহারাজের কারণে, পাছে মহারাজের গায়ের সঙ্গে আমার গা লেগে যায়! উনি সন্ন্যাসী আমি গৃহী।
মুকু সঙ্গে সঙ্গে বললে, দুরাত্মার ছলের অভাব হয় না।
আমি হতাশ হয়ে বললুম, দেখছেন মহারাজ? আমার কেস হাজির করার সুযোগই দিচ্ছে না।
শোনো, তোমাকে একটা অপ্রিয় কথা বলি। প্রথমে ইংরেজিতেই বলি। পুস্তু প্রবাদ,
The ungrateful son is a wart on his father’s face;
to leave it is a blemish, to cut it off is pain.
অকৃতজ্ঞ পুত্র হল পিতার মুখে একটা আঁচিলের মতো। রাখাটা কলঙ্কের মতে, কাটা যন্ত্রণাদায়ক। তুমি যদি তোমার আচরণে পিতার মান-সম্মান, পরিবারের আদর্শ ধুলোয় লুটিয়ে দাও, সেটা হবে এমন কলঙ্ক যা স্বীকার করা যাবে না, অস্বীকারও করা যাবে না, কারণ তুমি পুত্র। আমি তো দেখছি এই মেয়েটির যা তেজ, যা বোধ-বুদ্ধি, তোমার তা নেই। রাগ কোরো না, আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি তুমি এফিমিনেট, তোমার চরিত্র দুর্বল। আমি তোমার ডান পাশে বসে আছি, আর তুমি তোমার বাঁ পাশে সুরঞ্জনার হাত নিয়ে খেলা করছ? ঠাকুর বলতেন, মেয়েরা যতই ভক্তিমতী হোক, তাদের সংস্পর্শে মন টলে যেতে বাধ্য। যুবতী সম্পর্কে ভয়ংকর সাবধানতার প্রয়োজন। নির্জনে তাদের সঙ্গে ধর্মালোচনাও বিপজ্জনক! তোমার এমন দুঃসাহস, আমার উপস্থিতি সত্ত্বেও তুমি এমন কাজ করতে পারলে? তুমি তো সাংঘাতিক ছেলে!
আমার খুব রাগ হচ্ছিল। টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার মতো, চটরপটর এন্তার কথা আমাকে অকারণে দাগরাজি করে দিচ্ছে। আশ্চর্য বরাত আমার! একটু উষ্ণভাবেই বললুম, আমার মনে কোনও পাপ নেই। যে-হাত আমি ধরেছিলুম, সে হাত কোনও মেয়ের নয়, বন্ধুত্বের হাত। সুরঞ্জনার দাদা নিরুদ্দিষ্ট, আমার পিতা নিরুদ্দিষ্ট। দু’জনেরই এক অবস্থা। সেই কথাই হচ্ছিল।
মুকু সঙ্গে সঙ্গে বললে, কথা তো মুখে মুখে হয় মহারাজ। আর হাতে হাতে হয় হাতাহাতি।
আমি বললুম, সুরঞ্জনা আমার কাছে লেখাপড়ায় সাহায্য চেয়েছে। দাদা অঙ্ক দেখিয়ে দিত। আমাকে অনুরোধ করেছে, অঙ্ক বোঝাবার জন্যে।
মুকু বললে, এত শিক্ষক থাকতে তোমাকে কেন? তুমি তো কেমিস্ট্রির লোক। অঙ্কের তুমি কী বোঝো! মেসোমশাই তো তোমাকে উঠতে-বসতে ধমকাতেন। অঙ্কের মাথা তোমার মোটেই ভাল নয়।
মহারাজ বললেন, প্রসঙ্গটা আর এগোতে দেওয়া ঠিক নয়। এটা আশ্রম। তোমাদের ঝগড়া করার প্ল্যাটফর্ম নয়। কী চাও তোমরা? আমার কাজ আছে। নষ্ট করার মতো সময় নেই।
মুকু বললে, আপনি ওকে ভালবাসেন। আমিও ভালবাসি। একটা কথা ওকে আপনি বুঝিয়ে দিন, সংসারই ওর জায়গা, আশ্রম নয়। চাকরিবাকরি ছেড়ে বাড়িতে বসে থাকলে কেউ খাওয়াবে না। সন্ন্যাসী হওয়া অত সহজ নয়!
মহারাজ টেবিলে দেহের ভার রেখে দাঁড়িয়ে ছিলেন এতক্ষণ। এইবার চেয়ারে বসলেন আবার। মুখ থমথমে। মুকুর দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার পক্ষে সন্ন্যাস ছাড়া অন্য কোনও পরামর্শ দেওয়া সম্ভব নয়। যে-পাখি যে-গান গায়, যে-বাদ্যযন্ত্র যেমন আওয়াজ করে! এই ভোগের পৃথিবীতে আমিও একজন গৃহী হতে পারতুম। এই চেয়ারে গেরুয়া পরে বসে না থেকে কোনও এক বড় কোম্পানির চেয়ারে সুট-বুট-টাই পরে বসে থাকার যোগ্যতা আমার ছিল। আমার যৌবনে আমি এক মহাপুরুষের সংস্পর্শে এসেছিলুম। সে আমার ভাগ্য। তিনি আমাকে প্রথম যে কথা বলেছিলেন, ভারী সুন্দর। বলেছিলেন, পৃথিবীতে একবারই এসেছ, মেয়েদের আঁচল ধরে না ঘুরে, ঈশ্বরের হাত ধরে ঘোরো। হয়তো পাবে না কিছুই, যতই না পাবে, তত পেতে চাবে, ততই বাড়িবে পিপাসা আমার, ওগো ফুরাবে না তুমি, ফুরাব না আমি, তোমাতে আমাতে হব একাকার। তিনি অনন্ত। অনন্ত হয়েছ, ভালই করেছ, থাকো চিরদিন অনন্ত অপার। ধরা যদি দিতে ফুরাইয়া যেতে, তোমারে ধরিতে কে চাহিত আর। ভুলায়েছ যারে তব প্রলোভনে, সে কি ক্ষান্ত হবে তব অন্বেষণে? না পায় না পাবে, যায় প্রাণ যাবে, কভু কি ফুরাবে অন্বেষণ তার? এই অন্বেষণই জীবন। চিদানন্দের চেয়ে বড় আনন্দ পৃথিবীতে আর কি কিছু আছে? কিন্তু? একটা মহা কিন্তু আছে, সংসারদুঃখজলধৌ পতিতস্য/কামক্রোধাদিনক্রমকরৈঃ কবলীকৃতস্য। দুর্বাসনানিগড়ি তস্য নিরাশ্রয়স্য/চৈতন্যচন্দ্র মম। দেহি পদাবলম্বমা। আমি সংসারে দুঃখসমুদ্রে পড়েছি। পড়েছ তো ওঠার চেষ্টা করো। চেষ্টা করব। কী? কাম ক্রোধ প্রভৃতি হাঙর কুমির আমায় গিলে ফেলেছে। তাতে কী হয়েছে, বেঁচে তো আছ, নাড়াচাড়া দাও তা হলেই তো ওরা উগরে দেবে। সে তো জানি, কিন্তু আমি যে নিজের দুর্বাসনায় নিজেকে শৃঙ্খলিত করেছি। অন্যে বাঁধলে নাড়াচাড়া দিয়ে ছাড়ানোর চেষ্টা করা যেত। এ যে নিজেই নিজেকে জড়ানো। তা হলে অন্য কোথাও যাও। কোথায় যাব? আমি যে নিরাশ্রয়। তুমি ছাড়া আর কোনও আশ্রয়স্থল নেই আমার। বেশ, তা হলে আমার চরণ ধরো! প্রভু! আমি বদ্ধ। আমি যাব কী করে! তুমি এসো। এসে তোমার চরণ-তরী দিয়ে আমায় উদ্ধার করো। শ্রীরামকৃষ্ণ মম দেহি পদাবলম্বম্ ॥ আমি এই জানি। তা তুমি যদি অন্যরকম জানো তো তাই জানো। যার যার জীবন, তার তার জীবন। এখানে তো জোরজবরদস্তির কোনও ব্যাপার নেই। কে তোমাকে সন্ন্যাসী হতে বলেছে! কেনই বা হবে! সৎ গৃহীই হও না। ঠাকুর বলেছেন, গৃহদুর্গে থেকে সাধনভজন, সে তো খুবই ভাল কথা। সকলকেই সন্ন্যাসী হতে হবে এমন তো কোনও কথা নেই। সন্ন্যাসী হতে হলে, তোমাকে অনেক কিছু ত্যাগ করতে হবে। সবচেয়ে বড় ত্যাগ হল কামিনীকাঞ্চন। মনে মুখে এক হতে হবে। ভীষণ একটা রোখ চাই। আমাকে পেতেই হবে। মিনমিনে ম্যাদামারা হলে হবে না। হাজার বই, হাজার উপদেশেও কিছু হবে না। ক্ষুরধার বুদ্ধি দিয়েও হবে না। নায়মাত্মা বলহীনে ন। লভ্য। কে তোমাকে সন্ন্যাসী হতে বলেছে বাপু!
