আমরা দু’জনে জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা গজগজ করছি, কারণ আমাদের মতের মিল তো কোনওদিন হবে না। যদি আমরা কোনওদিন স্বামী-স্ত্রী হই, এটা তো তারই লক্ষণ। অস্কার ওয়াইল্ডের কথা মনে পড়ছে, ম্যারেজ ইজ এ পার্মানেন্ট ডিসএগ্রিমেন্ট।
এক সরল চেহারার মানুষ রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ভাবলেন আমরা ঢুকতে ভয় পাচ্ছি। সাহস দিলেন, যান না, যান, ভেতরে যান, কেউ কিছু বলবে না। মহারাজরা খুব ভাল। রাত্তিরবেলা ভোগে গাওয়া ঘিয়ের লুচি হয়। খাঁটি গাওয়া। আমি সবদিন পাই না, তবে রোজ গন্ধ পাই। ভুর ভুর ভুর ভুর। রান্নাঘরের পাশেই তো আমি থাকি। যান যান, ভেতরে গিয়ে দেখুন। জুতো সাবধান। ভীষণ জুতো চুরি হয়।
মুখে অদ্ভুত একটা হাসি ঝুলিয়ে মানুষটি চলে গেলেন। আমরা নিজেদের ঝাড়াঝাড়ি করে ভেতরে ঢুকে পড়লুম। বাঁ দিকের অফিসঘরে আর গেলুম না। সোজা দোতলার মন্দিরে। ফুলের মালা পরে মা হাসছেন। দু-চারজন ভক্ত। মুকু বেশ অভিভূত হয়ে থেবড়ে বসে পড়ল। হাত জোড় করে প্রথমেই বললে, মা, তোমার যদি ক্ষমতা থাকে মেসোমশাইকে ফিরিয়ে এনে দাও।
এই কথাটা তো আমি মাকে বলতে পারিনি। আমি আসি যাই, নিজের কামনাই জানাই। বড় স্বার্থপর আমি! মুকুর মুখের দিকে তাকালুম। অদ্ভুত একটা ভাব খেলছে। ভীষণ হিংসে হল। মুকুর মন কত পরিষ্কার। আমি কত কুচুটে! সবসময় নিজের ধান্দা। মুকু যেভাবে বসেছে, সহজে উঠবে না। ফিসফিস করে বললুম, চলো, মহারাজের কাছে যাই।
মহারাজ আগে, না মা আগে!
থমকে গেলুম। সত্যই তো, মা-ই তো সব। মাকে সব নিবেদন করে আমরা তো ফিরেও যেতে পারি। যাই হোক মুকুর দয়া হল। প্রণাম করে উঠে দাঁড়াল। আমরা তিনতলার সিঁড়ির মুখে এসে দাঁড়ালুম। ভয়ে বুক কাঁপছে। কপালে কী লেখা আছে জানি না।
দুরুদুরু বুকে মহারাজের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালুম। লাল ঝকঝকে মেঝে। চকচকে টেবিল। চেয়ারে টকটকে গেরুয়া পরে বসে আছেন মহারাজ। মুখ নিচু করে কিছু একটা লিখছেন। মুকু হঠাৎ আমাকে ঠেলে ঘরে ঢুকে গেল। মহারাজ মুখ তুলছেন। মুকু ততক্ষণে মাটিতে গড় হয়ে প্রণামে।
মহারাজ বললেন, কে তুমি? আমাকে দেখেও দেখলেন না।
মুকু সোজা হয়ে হাত জোড় করে বললে, আমি মুকু। মায়ের মেয়ে।
মহারাজ থতমত। মুখ অতিশয় গম্ভীর। এই গাম্ভীর্য ভীষণ ভয়ের। থমথমে মুখ তীক্ষ্ণ চোখ। সামনে দাঁড়ালে কেঁচো হয়ে যেতে হয়। মুকু কিন্তু নির্ভয়। এমন উত্তর মহারাজ কখনও শোনেননি, মায়ের মেয়ে।
মহারাজ বললেন, অনিশ্চিত পরিচয়কে নিশ্চিত করো। দেশ কাল-পাত্রের সীমায় বাঁধে।
পেছনে লেজ গুটিয়ে যে ভীরু দাঁড়িয়ে আছে, আমি তার বোন। এইবার কেমন বোন? না মাসতুতো বোন। আরও এক ধাপ এগোলে, আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম এ দর্শনের ছাত্রী। এইবার আরও একটি সংযোজন, সেদিন আপনার গাড়ি থেকে জামার বুক খামচে ধরে যে-মেয়েটা ওকে টেনে নামিয়েছিল, সেই মেয়েটাই আমি। এইবার প্রার্থনা, প্রণাম করেছি, আশীর্বাদ করেননি। গম্ভীর মুখ। একটু হাসি আশা করি। আশীর্বাদ চাই, স্বামীজি ভারতীয় নারীকে যে-রূপে দেখতে চেয়েছিলেন আমি যেন সেইরকম হতে পারি। স্বামীজি বলেছিলেন, আমাদের মেয়েরা বরাবরই প্যানপেনে ভাবই শিক্ষা করে আসছে। একটা কিছু হলে কেবল কাঁদতেই মজবুত। বীরত্বের ভাবটাও শেখা দরকার। সূর্বশক্তিমত্তা, সর্বব্যাপিতা ও অনন্ত দয়া–সেই জগজ্জননী ভগবতীর গুণ। জগতে যত শক্তি আছে তিনিই তার সমষ্টিরূপিনী। জগতে যত শক্তির বিকাশ দেখা যায়, সবই সেই মা। তিনিই প্রাণরূপিনী, তিনিই বুদ্ধিরূপিনী, তিনিই প্রেমরূপিনী।
মুকু একটু থেমে মহারাজের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত মিষ্টি গলায় বললে, মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করবেন না মহারাজ?
২.১৫ There are only three things
মহারাজ চেয়ারটা আস্তে পেছনে ঠেলে উঠে দাঁড়ালেন। মুকুর প্রখর বোলচাল স্তম্ভিত। টকটকে গেরুয়া কাপড় ভাজে ভাজে খুলে পায়ের পাতা ঢেকে দিল। মুকু মেঝেতেই বসে রইল থেবড়ে। মহারাজ তাকিয়ে আছেন তার দিকে।
মুকুর মাথায় একটা আঙুল আলতোভাবে স্পর্শ করিয়ে তুলে নিলেন। বললেন, উঠে বোসো চেয়ারে। তোমার এই বীরভাব আমার ভাল লাগছে। তবে কী জানো, তোমার কাণ্ডজ্ঞানের একটু অভাব আছে। আমি সন্ন্যাসী। গাড়িতে বসে আছি। তুমি একবারও খেয়াল করলে না, পাঁচজনে কী ভাববে!
মুকু চেয়ারে বসতে বসতে পটাং করে বলে উঠল, মহারাজ, কাণ্ডজ্ঞানের অভাব নয়, আমার আবেগ। অপরাধীকে আমার চাবকাতে ইচ্ছে করে। আপনি যে গাড়িতে আছেন লক্ষ করিনি। গাড়িতে একটি মেয়ে ছিল আর আপনার এই ছেলে তার কোলের ওপর মেয়েটির হাত নিজের হাতে নিয়ে মহা আরামে বসে ছিল। যে-গাড়িতে আপনি সেই গাড়িতে এমন ঘটনা ঘটে কী করে? ইংরেজিতে একেই বলে কমপ্রোমাইজিং পজিশন।
ও! ও তো সুরঞ্জনা! সুরঞ্জনা ছিল গাড়িতে। সুরঞ্জনা তো একজন মহিলা আর ও তো একটা ছেলে। যে সন্ন্যাসী হবে সে অত ঘন হয়ে বসেছিল কেন? ঠাকুর বলে গেছেন, আগুন আর ঘি পাশাপাশি রাখতে নেই মহারাজ। ঠাকুর কত সাবধান হতে বলেছেন। বলেছেন, সর্বাঙ্গে চাদর মুড়ে মেয়েদের পাশে যেতে হয়, যদি অ্যাট-অল যেতেই হয়। বলেছেন, মেয়েদের ছবি দেখলেও চিত্ত চঞ্চল হতে পারে। যে সন্ন্যাসী হবে তার এইসব অবশ্যই মানা উচিত। এই দু’ নৌকোয় পা দেখে আমার মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছিল। তা ছাড়া তার আগের সারাটা রাত কোথায় ছিল তার কোনও সন্তোষজনক উত্তর নেই। মিথ্যা কথায়
