দিদি কুটনো কুটছিলেন, মুখ তুলে বললেন, হ্যাঁরে! তোরা কি বিয়ে করবি?
মুকু বললে, সেইরকমই ইচ্ছে আমাদের।
বাঃ বেশ হবে। মানাবে ভাল। তা কাকা ঘি আর আগুন পাশাপাশি রেখে চলে গেলেন!
তার কারণ আছে। আমরা সংযমী। কুকুর বেড়াল নই।
দিদি একটা বেগুন নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন, যাক বাবা, ভালই হয়েছে। আমার একটা এক ভরির মতো সোনার বালা আছে, সেইটা ভেঙে তোকে একটা সুন্দর গয়না গড়িয়ে দোব। চল আজই কোনও স্যাকরার কাছে যাই।
একেই বলে উঠল বাই তো কটক যাই। বিয়ের এখনও দেরি আছে। আগে আমরা মেসোমশাইকে খুঁজে বের করব। তারপর আমি এম এ পাশ করব। তারপর।
দিদি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, মেসোমশাইকে খুঁজে বের করবি মানে?
আমরা দুজনে থতমত। সত্য বেরিয়ে পড়েছে। সত্যের যা ধর্ম। আর চেপে রাখা সাজে না। প্রকাশ করে দেওয়াই ভাল।
আমিই বললুম, দিদি, আপনাকে আসল কথাটাই বলা হয়নি। আমরা হাসছি, খাচ্ছি, কথা বলছি, কিন্তু আমরা আজ অনাথ। বাবা কারওকে কিছু না বলে হঠাৎ ভোররাতে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। কোথায় গেছেন আমরা জানি না।
দিদির আনাজ কোটা বন্ধ হয়ে গেল। তারার মতো চোখ মেলে বলল, সেকী রে! কাকা নেই!
আছেন। কোথাও-না-কোথাও আছেন, আমরা এখনও জানি না।
তা হলে কী হবে!
আমাদের জানা নেই। ভগবানকে মানুষ যেমন ডাকে, আমরাও মনে মনে অনবরতই তাকে স্মরণ করছি। দেখা দিন, দেখা দিন।
দিদি মাথা নিচু করলেন। পিঠের দিকটা ফুলছে। মুখ তুললেন। চোখে জল। ধরা গলায় বললেন, অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকায়ে যায়।
আপনার কোনও ভয় নেই দিদি। আমরা আপনাকে মাথায় করে রাখব।
তা তো হল, কিন্তু আমার কাকাকে ফিরিয়ে আনার কী হবে?
আমাদের দু’জনের মুখেই আর কোনও কথা সরল না। এই সুবিশাল ভারতভূমে কত গুহা, নদী, প্রান্তর, মন্দির, আশ্রম! তিনি কোথায় আছেন! জায়গার তো অভাব নেই আত্মগোপন করার। কেমন। করে জানব? দিদি মসৃণ বেগুনটা হাতে তুলে নিয়ে খুব আন্তরিক গলায় বললেন, একটা কিছু কর ভাই।
মুকু বললে, আজ রাতে আমরা পরামর্শে বসব।
মুকুকে ইশারায় ডেকে আমার ঘরে নিয়ে এলুম, আমার একটা অনুরোধ রাখবে?
বলো।
মুকু কী পরিশ্রম করেছিল কে জানে, ঘেমে গেছে! মুখটা মোমের মতো চকচক করছে। প্রাণের দীপ্তিতে চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। সারাশরীর ঘিরে থমকে আছে উষ্ণ আকর্ষণ। বড় দুর্বল মনে হচ্ছে নিজেকে।
আবার এও মনে হচ্ছে, Love’s way is life, without it humans are but bones skin-clad. প্রেমই জীবন। প্রেম ছাড়া মানুষ চামড়ার আস্তরণে হাড়ের খাঁচা।
মুকু বললে, কই বলো! কী দেখছ অমন করে? আমার অস্বস্তি হচ্ছে।
তুমি আমাকে পাগল করে দেবে দেখছি!
পাগলকে আর কী পাগল করব বলো! তোমার অনুরোধটা তাড়াতাড়ি বলে ফেলল। আমার প্রচুর কাজ।
তোমাকে আমার সঙ্গে একবার স্বামী নির্মলানন্দজির কাছে যেতে হবে।
আমাকে? আমি গিয়ে কী করব!
আমার সম্মান বাঁচাবে।
তোমার অসম্মানের কী হল?
আমার জামা খামচে ধরে তুমি আমাকে গাড়ি থেকে টেনে নামাচ্ছিলে, তিনি ভীষণ ঘৃণায় বলেছিলেন, নামিয়ে দাও, নামিয়ে দাও। যেন আমি কত খারাপ, চরিত্রহীন যুবক। আসল ব্যাপারটা তাকে জানানো দরকার।
না জানালে?
আমার যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে চিরকালের জন্যে।
যায় যাবে। তাতে তোমারই বা কী, আর আমারই বা কী!
ও কথা বোলো না। আমি কোন জলের মাছ জানো?
খুব জানি। গভীর জলের মাছ। তুমি গাছেরও খাবে, তলারও কুড়োবে।
তুমি একটা অধার্মিক, নাস্তিক।
তোমার মতো আস্তিক হওয়ার চেয়ে নাস্তিক হওয়া ভাল।
তুমি তা হলে যাবে না?
অবশ্যই যাব। কখন যেতে হবে বলো?
বিকেলের দিকে।
বেশ তাই হবে।
মুকু চলে গেল। কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইলুম। অদ্ভুত একটা আলস্য এসে যাচ্ছে। নিজের ভবিষ্যতটাকে কেমন তিল তিল করে নষ্ট করছি! কেবল ভাবছি। ভেবেই চলেছি। চাকরিবাকরি লাটে উঠে গেল। পড়াশোনা গোল্লায়। নিজেকে কখনও শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবছি, কখনও বিবেকানন্দ। আর বুকে হাত মুড়ে গোল্লা গোল্লা চোখ করলেই কি স্বামীজি হওয়া যায়! সংস্কার চাই, প্রারব্ধ চাই। পৃথিবীতে কত রকমের ইডিয়েট আছে? আমি একটা রকম। যা হতে পারব না, তা হবার চেষ্টায় মরছি। নিজের সম্মান বাঁচাবার চেষ্টায় একবার থানায় গেলুম না। কী? না, লোক জানাজানি হয়ে যাবে। সবাই বলবে, ছি ছি, ছেলের জন্যে বাবা গৃহত্যাগী। মাসতুতো বোনকে এনে ফুর্তি লুটছে। ভগবানের অসীম কৃপা। কোথা থেকে এক দিদিকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। বদনামের হাত থেকে কিছুটা বাঁচা যাবে অন্তত।
বেলা চারটের সময় আমরা আশ্রমে গিয়ে পৌঁছোলুম। আশ্রমের দরজার সামনে কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে রইলুম দুজনে। স্বামীজির সামনে গিয়ে দাঁড়ালে তিনি কী বলবেন! কঠিন তিরস্কার? মুকু বললে, কবে যে তোমার জড়ভরত ভাবটা যাবে! চলো না। যা হবার তা হবে। চিবিয়ে খেয়ে ফেলবেন না তো! বড়জোর বলবেন, গেট আউট। বেরিয়ে চলে আসব। ঈশ্বর তো কারও একার সম্পত্তি নয়। নিজেদের চেষ্টাতেই তাকে ধরব। গেরুয়া পরলেই কি তাকে পাওয়া যায়? অত সহজ নয়! শুনবে, তুলসীদাসজি কী বলছেন, তুলসী দিনে হরি মেলে তো, মেয় পেঁদে কুঁদা আউর ঝাড়। পাথর পুজনে হর মেলে তো ময় পুজে পাহাড়। তুলসীর মালা পরলে যদি জগদীশ্বর লাভ করা যায় তা হলে গলায় আমি তুলসীগাছের একটা কুঁদো ধারণ করি, কি তুলসীর একটা ঝাড় ঝুলিয়ে রাখি। আর যদি মনে করে থাকো একটা শিলার অর্চনা করলেই মহেশ্বরকে পাওয়া যাবে, তা হলে আমি একটা পাহাড়কেও পুজো করতে প্রস্তুত আছি। যা চাইছ তা অত সহজ নয়। চেলা মিলে লাখ তো গুরু মিলে এক।
