সেই জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে বায়ু পরিবর্তনে হাজারিবাগে গেলুম। তখন তিনি ভীষণ অসুস্থ। পরে জেনেছিলুম, অনেক পরে বড় হয়ে, তার টিবি হয়েছিল। কোনও ওষুধ তখনও আবিষ্কার হয়নি। যক্ষ্মা থেকে রাজ্যক্ষ্মা, অবশেষে মৃত্যু। ডাক্তারবাবুরা বলেছিলেন স্বাস্থ্যকর জায়গায় নিয়ে যান। ভালমন্দ খাওয়ান। এ ছাড়া আর কিছু করার নেই। সেই ভয়ংকর গরমে আমরা হাজারিবাগ হাজির হলুম। আশেপাশে সুন্দর সুন্দর সব বাগানবাড়ি। বাগান, বাগানে থরেথরে ফুটে আছে গোলাপ। গাছে দুলছে পাকা পাকা পিচফল। একটা বাগানবাড়ির নাম ছিল সুরিয়া হাউস। হলদে রঙের বাড়ি। সাদা ইটের কেয়ারি। সেই বাগানে বেশ কিছু আমগাছ ছিল। সিপিয়া ল্যাংড়া। বাগানের দিকের বারান্দায় বেতের আরামকেদারায় ড্রেসিং গাউন পরে এক গম্ভীর চেহারার ভদ্রলোক বসে থাকতেন। ফরসা রং। সুন্দর স্বাস্থ্য। একদিন জ্যাঠামশাইকে বললুম, ওই বাগান থেকে আম চেয়ে আনব? জ্যাঠামশাই তখন ভীষণ অসুস্থ। বেশিরভাগ সময় শুয়েই থাকেন। মুখ শুকনো। চোয়ালের হাড় জেগে উঠেছে। চোখদুটো ঢেকে গেছে। ছোট আমি। কেমন করে বুঝব তাঁর কী হয়েছে? কী দুশ্চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে তার মনে? অফিস গেছে। বিদেশে পড়ে আছেন। কলকাতায় সংসার টানছেন হরিশঙ্কর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দাপটে পৃথিবী কাঁপছে। চিকিৎসায় জলের মতো টাকা খরচ হচ্ছে। অসুখের লজ্জায় জ্যাঠামশাই মরমে মরে আছেন। আমার কথা শুনে, জ্যাঠামশাই স্থির চোখে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। শেষে বললেন, ছি ছি বাপি, তুমি চেয়ে আম খাবে? আমরা এত গরিব হয়ে গেছি! ভিক্ষে করতে হবে?
এতই স্পর্শকাতর আমি, জ্যাঠামশাইয়ের সেই মুখ চোখ আর ছি ছি বলার ধরনে আমি কুঁকড়ে গেলুম। ছুটে বেরিয়ে এলুম ঘরের বাইরে। আমরা যে বাড়িতে ভাড়া ছিলুম, তারও একটা ন্যাড়ান্যাড়া বাগান ছিল। খুব একটা যত্নের নয়। সেই বাগানে একা একা ঘুরে বেড়ালুম অনেকক্ষণ। একটা পিচফলের গাছ ছিল। ফল ধরেছে অনেক। একটা পেড়ে খেলুম। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলুম, জীবনে জ্যাঠামশাইয়ের সামনে আর কখনও খাব না। কথা তো বলবই না। হঠাৎ আকাশের দিকে নজর গেল। রোদ ঢেকে আসছে মেঘে। কালো মেঘ হুহু করে এগিয়ে আসছে। বিনবিন একটা আওয়াজ। মেঘ তো আওয়াজ করে না। এ আবার কী? মেঘের তো ডানা থাকে না! হঠাৎ দূরে একটা শোরগোল উঠল, পঙ্গপাল পঙ্গপাল। পঙ্গপাল নামটা শোনা ছিল। দলছুট কয়েকটা আমার দিকে উড়ে এল। বিশাল বড় ফড়িঙের মতো। ভয়ে ছুটে পালিয়ে এলুম ঘরে। চারপাশ অন্ধকার। সূর্যে যেন গ্রহণ লেগেছে। ফিরফির আওয়াজে কানের পরদা কাঁপছে। বাইরে হইহই চিৎকার।
মানুষ কিছু ভোলে না। বেঁচে থাকাটা আর কিছুই নয়। অভিজ্ঞতার সঞ্চয়। গাছে যেমন ফল ধরে, মানুষে তেমনি স্মৃতি ধরে। শেষকালে মানুষ একেবারে নুয়ে পড়ে। বিশাল একটা কেতাবের মলাট বন্ধ হয়ে যায়। জীবিতের সংসারের একপাশে পড়ে থেকে থেকে একদিন কীটদষ্ট বিস্মৃতি। জ্যাঠামশাই হাজারিবাগে এসেছিলেন হেঁটে হেঁটে, ফিরে চললেন স্ট্রেচারে শুয়ে। এই বাড়ির দক্ষিণের ঘরে তিনি বিছানা নিলেন। দরজার পাশ থেকে উঁকি মেরে মেরে দেখি। সংসার একেবারে এলোমেলো। অনবরতই ডাক্তার-বৈদ্যের আসা-যাওয়া। বড়র বড়, তারও বড়। গম্ভীর মুখে আসেন, ফিরে যান গম্ভীরতর মুখে। গোটা বাড়িতে ফিনাইল আর কার্বলিকের গন্ধ। মহা আহ্লাদে আমি ঘুরি। শাসন নেই কোনও। জ্যাঠামশাইয়ের ঘরের পাশে খোলা বারান্দায় ক্যারামবোর্ড পেতে সমবয়সি ইয়ারদের সঙ্গে সারাদুপুর পিটি। কোনও দৃকপাত নেই। কে মরে আর কে বাঁচে। এক কিশোরের সঙ্গে জীবনমৃত্যুর কী সম্পর্ক? হাজারিবাগের অভিমান কলকাতায় এসে যেন দুধে-ফোলা পাউরুটি! কেন জ্যাঠামশাই আমাকে ডেকে বললেন না, বাপি, রাগ কোরো না! বোধের কী অভাব! একবারও বুঝলুম না। জ্যাঠামশাইয়ের তখন কথা বলার কোনও ক্ষমতা নেই। তরী ভেসে চলেছে নিঃশব্দে জীবনমৃত্যুর মোহানার দিকে। একদিন ক্যারামের আসর খুব জমেছে, ক্ষীণ একটা ডাক কানে এল, বাপি।
কী আনন্দ! আমার সবচেয়ে প্রিয়জন অবশেষে ডেকেছেন। স্ট্রাইকার ফেলে ছুটলুম। জ্যাঠামশাই চিত হয়ে শুয়ে আছেন। ঠোঁটদুটো অল্প ফঁক। চোখদুটো ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। জ্যাঠামশাই, বলে কাছে ছুটে গেলুম। তিনি তখন বহু দূরে চলে গেছেন। জীবনের ধনুক থেকে প্রাণের তির ছিটকে বেরিয়ে গেছে। বহু, বহু দূর থেকে ডাক ভেসে এল, বাপি, তোমার সঙ্গে ভাব হয়ে গেল। তবে এখানে নয় ওখানে। তোমার খেলা শেষ করে এসো। বাকি কথা হবে পরে।
সেই অভিমান! আজও আমি অতিশয় অভিমানী। জীবনের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে পারিনি। স্বামী নির্মলানন্দ? আমি কী করি? আপনার কাছে যেতে চাই। আমার অভিমান টেনে ধরে আছে। তবে আমি আর কিশোর নই। পোড়খাওয়া এক যুবক। আমি যাব। আমার হৃত গৌরব উদ্ধার করতে। সঙ্গে হরণকারিণীকেও নিয়ে যাব।
কোমরে আঁচল জড়িয়ে মুকু রান্নাঘরের কাছে বীর দর্পে ঘোরাঘুরি করছে। দিদি ঘরের ভেতরে। টুংটাং খুটখাট নানা শব্দ, সংসারের শব্দ। মুকু আবার মাঝে মাঝে গান গাইছে, হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হল, ঘোল খাওয়ালে মোরে!
মুকু, শেষটা হল পার করো আমারে।
সে কথাটা এই আমার কাঁচা বয়সে বলি কী করে! জীবনের কত সাধ আহ্লাদ বাকি আছে ভাই। এখনই যাই কী করে! আমার সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তোমাকে জ্বালিয়ে তারপর যাব, যতদিন না তোমার মুখ দিয়ে বেরোচ্ছে লোহারই বাঁধনে বেঁধেছে সংসার, দাসখত লিখে নিয়েছ হায়!
