দিদি কয়লা ভাঙছেন। মনকে বোঝালুম, ও কাজটা তেমন বিপজ্জনক নয়। দিদির পক্ষে ভয়ের হবে আগুন, বারান্দা কি ছাদের আলসে ভেঙে পতন, ভাঙা টিনের খোঁচা, খাবারে বিষক্রিয়া। এই ক’টা থেকে যতদূর সম্ভব সাবধানে রাখতে হবে দিদিকে। একদিনেই ভীষণ মায়া পড়ে গেছে। ভদ্রমহিলার মধ্যে অদ্ভুত একটা মায়া আছে। ভোরের আকাশের মতো। আমার মনে হল, এমন একজন মানুষকে এইভাবে সাতসকালে কয়লা ভাঙতে দেওয়া উচিত নয়। হাত থেকে হাতুড়িটা কেড়ে নিলুম।
উঠুন আপনি। এ কাজ আপনার নয়। হয় মুকু করবে, না হয় আমাদের বাড়ি যে কাজ করে সে ভাঙবে।
কেন ভাই? আমার ঠিক হচ্ছে না বুঝি!
কেন হবে না! আমার এই দৃশ্য সহ্য হচ্ছে না।
তুমি কি জানো ভাই, কিছুকাল আমি বাড়ি বাড়ি রান্না করেছি?
সে যখন করেছেন তখন করেছেন, এখন আপনি আমার দিদি। আমাদের মাথার ওপর থাকবেন, আমাদের আদেশ করবেন। উঠুন আপনি।
হাত ধরে তুলে দিলুম। একটু যত্ন করলে চেহারাটা সুন্দর হবে। তখন আভিজাত্য একেবারে ফেটে পড়বে। একদিকে মুকু, একদিকে দিদি। আবার আমাদের সংসারে পুরনো দিন ফিরে আসবে। শুনেছি, আমাদের বাড়ির দুই বউ খুব বিদূষী ছিলেন। দুই সখীর মতো। নীল সোয়েটার আর ডোরাকাটা পাম শু পরে শীতকালের রোদে বেড়াতে বেরোতেন। সঙ্গে থাকত লোমঅলা সাদা কুকুর। পিতাকে যদি ভারত ছুঁড়ে একবার ধরে আনতে পারি তা হলে তো কোনও কথাই নেই। সুখের বন্যা বইবে।
দিদি ছলছলে চোখে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে।
কাঁদছেন কেন?
কাঁদিনি ভাই। মন দেখছি মন। এ জল আনন্দের। কানের কাছে যেন দৈববাণী হল, ঠিক করেছ।
ওপর দিকে তাকিয়ে দেখি, বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে মুকু। হাসছে। বেশ পালটে গেছে। সেই চাদর জড়ানো বৈরাগীর বেশ আর নেই।
মুকু একটা ব্যাগ দোলাতে দোলাতে বললে, বাজারের ব্যবস্থা করো। দিদির আজ জন্মদিন।
ওমা সেকী? আমার জন্মদিন! তুমি কী করে জানলে! আমার জন্মদিন তো আমিই জানি না।
আমার মন বলছে, আমার দিদির আজ জন্মদিন। এখন দয়া করে দু’জনে ওই ঢ্যাবট্যাবে জায়গা ছেড়ে ওপরে উঠে এসো। আমার চা হয়ে গেছে।
দিদি আমাকে বললেন, তোমাদের নীচে একটা বাথরুম রয়েছে না? আমি বরং সেটাই ব্যবহার করি।
দিদি, আবার শুরু করলেন! ওটায় খুব বিপদে না পড়লে আমরা যাই না। তাও যাই ভয়ে ভয়ে। ওখানে অন্য অনেক প্রাণীর বসবাস। সাপও আছে। ওদের সুখের সংসারে না-ই বা হামলা করলেন। ওপরে চলুন।
সারা বাড়িটা আমার একবার ঘুরে দেখা উচিত। এই বাড়িরই কোনও একটা ঘরে আমি জন্মেছিলুম।
বাড়ি তো আপনার! সময়মতো ঘুরে দেখবেন। একটাই কথা। ছাতের আলসেতে ভর দিয়ে দাঁড়াবেন না। বাড়ি পুরনো হয়েছে। তেমন আর জোর নেই।
বারান্দায় সবাই মিলে বসা হল চা নিয়ে। আমরা তিনজন কিন্তু চার কাপ। সুদৃশ্য একটা কাপ-ডিশে আলাদা করে রাখা, যেন একটু পরেই কেউ আসবেন। বড় একটা বাটিতে শুকনো মুড়ি। তুলে তুলে নাও আর খাও। খালি পেটে চা চলবে না। মুকুর কড়া নির্দেশ। বিস্কুট চলবে না। বিস্কুট হল বিলাসিতা।
জিজ্ঞেস করলুম, ওই চা কার? আমরা তো তিনজন।
কপাল থেকে বাঁ হাতে চুল সরাতে সরাতে মুকু বললে, বুঝতে পারলে না? তোমার এত বুদ্ধি! ওটা মেসোমশাইয়ের। এই সুন্দর সকালে সুন্দর বারান্দায় বসে আমরা চুমুকে চুমুকে সুগন্ধী দার্জিলিং চা খাব, আর তিনি? তাকে কে চা করে দেবে? জানো, তিনি চা কত ভালবাসতেন! দিনে সাত-আটবার চা খেতেন। আমি তার ছায়ায় আছি। চিরকাল তার ছায়াতেই বাস করতে চাই। আমি ভগবান জানি না। তিনিই আমার ভগবান! আজ হতে মোর ঘরের দুয়ার। রাখব খুলে রাতে। প্রদীপখানি রইবে জ্বালা। বাহির-জানালাতে । মুকু কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে গেল। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল স্বপ্নে-দেখা সেই নদী। উপলখণ্ডের বিস্তার। জল নেই। শিলাখণ্ডে মুখ ফিরিয়ে বসে আছেন তিনি। সেই অভিমানী।
২.১৪ The man that runs away
বড় লজ্জা নিয়ে নেমে এসেছিলুম গাড়ি থেকে। মুকু জামা খামচে ধরে টেনে নামাচ্ছে আর স্বামীজি মহা ঘৃণায় বলেছিলেন, নামিয়ে দাও, নামিয়ে দাও। ইংরেজিতে বললে বলতেন, ক্লিয়ার আউট, ক্লিয়ার আউট। ফেলে দাও, ফেলে দাও ঘৃণার মাংপিণ্ডটাকে। আনন্দ আর দুঃখের এমন দার্জিলিং-আসাম ব্লেন্ড কদাচিৎ দেখা যায়। উন্মাদ ভালবাসা, অসহ্য ঘৃণা।
আমাকে যিনি ঘৃণা করেন, আমি তার কাছে যাই না। ঘৃণার কাজ করলে ঘৃণা করুন আমি মেনে নেব, অকারণে ঘৃণা কেন! একটা দুঃখের স্মৃতি জেগে উঠছে। বয়েস পেছোচ্ছে। আমার তখন আট বছর বয়স। আমার মেজ জ্যাঠামশাই খুবই অসুস্থ। আমার সেই জ্যাঠামশাই, যাঁর স্নেহ আর ভালবাসার স্মৃতি আমাকে আমার চিতা পর্যন্ত অনুসরণ করবে। শীতের রাতে লেপের তলায় কোলের কাছে নিয়ে গল্প বলা, যতক্ষণ না ঘুমিয়ে পড়ছি। আমার ক্ষুদ্র হাতটি ধরে বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছেন খেলার মাঠে। বড়দের বলখেলা হচ্ছে, আমরা বসে আছি দু’জনে একপাশে। মাঠের উত্তর দিকের শেষ মাথায় এক বয়স্ক বেলগাছ, যে-গাছটার খ্যাতি সর্বত্র ব্রহ্মদৈত্যের আস্তানা বলে। শীতের অপরাহে ফুটবল খেলা যখন বন্ধ, তখন আমরা দু’জনে ওই মাঠের মাঝখানে এসে বসতুম। চারপাশে জোড়া জোড়া পুকুর। শেষবেলার শীতে জল কালো হয়ে গেছে। বিদেশি হাঁসের দল উড়ে এসেছে আরও কোনও শীতের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে। কেউ জলে মাথা গুঁজছে পেছন উলটে। কেউ জল থেকে শরীর সামান্য উঁচু করে ডানার জল ঝাড়ছে। প্রান্তর পেরিয়ে ছুটে আসছে শীতের শীতল বাতাস। আমার মাথার রঙিন টুপি কান পর্যন্ত টেনে নামিয়ে দিচ্ছেন জ্যাঠামশাই। গলার মাফলার ঠিকঠাক করে দিচ্ছেন। সবে এসেছি পৃথিবীতে। সবই আমার চোখে তখন নতুন। চারিদিকে ছড়ানো পৃথিবীর যাবতীয় বিস্ময়। একপাশে বিশাল খড়ের গাদা, মাথায় চড়ে নাচছে চড়াই শালিক ছাতারে। দুগ্ধধবল দুটি গাভী রোমন্থনে নেশাতুর। আমারই মতো সদ্য-আগত দুটি ছাগশিশু সামনের দুটি পা তুলে নেচে নেচে উঠছে। জ্যাঠামশাই বসে আছেন। আমি সারামাঠে ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছি। আমি ছুটছি, আমার পেছনে ছুটছে ছাগলছানা। হঠাৎ ঘাসের মধ্যে থেকে কুড়িয়ে পেলুম নিটোল গোল, মসৃণ একটা গুলি। পোড়ামাটির গোল গুলি। একটি শিশুর কাছে কী বা মাটি, কী বা হিরে, একটা কিছু পাওয়াটাই মহা বিস্ময়ের! কুড়িয়ে পাওয়া সেই অসাধারণ গুলি আমার কাছে বহুদিন ছিল। সেই গুলির নির্মাতাও আমার শ্রদ্ধেয় ছিল। অমন নিটোল, অমন মসৃণ কেমন করে করা সম্ভব হয়েছিল! আমার জ্যাঠামশাইও ছিলেন অদ্ভুত এক মানুষ। বয়স্ক এক শিশুর মতোই। গুলির আনন্দে তিনিও বিভোর। অমন একটা জিনিস কে করেছে, কীভাবে করেছে! পোড়াবার পর একটুও ফাটেনি কেন! মহা গবেষণার পর গুলিটা নিজের পকেটে রেখে বললেন, রবিবার ওইরকম একশোটা গুলি তিনি আমাকে করে দেবেন পুকুর থেকে এঁটেল মাটি তুলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই মাঠ থেকে আবিষ্কার করলুম আর এক বিস্ময়। গোলাপি মাঞ্জা দেওয়া অনেকটা ঘুড়ির সুতো পড়ে আছে। কড়কড়ে তাজা! হাতের আঙুলে গুটিয়ে আমার হাতে দিয়ে জ্যাঠামশাই বললেন, একে বলে চ্যঁ-ভোঁ মাঞ্জা। শিশুর কল্পনা বুড়ি হয়ে ঘুড়ি হয়ে উড়ে গেল আকাশে। একের পর এক প্যাঁচ লড়ে যাচ্ছি। সবাই ডোকাটা হয়ে যাচ্ছে। আমি নীল আকাশের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক। সেই বিকেলেই জ্যাঠামশাই আমাকে একটা নীল ঘুড়ি কিনে দিলেন। পাতলা কাগজ কাপকাঠি আর বুককাঠির বাঁধনে টানটান। কাগজের কী সুন্দর গন্ধ! ঘুড়িটা হাতে নিয়ে মনে হয়েছিল, নিজের টানটান হৃদয়টাকেই যেন ধরে আছি। সেই কতদিন আগের কথা। আজও মনে আছে। স্মৃতি এক অসাধারণ ব্যাঙ্ক।
