মুকু নাছোড়বান্দা। অনুসন্ধানের উৎসাহে নীচে নেমে গেল। তার ধারণা, চোর এসেছিল। চুরির আগে চোর অনেক খেলা দেখায়। নানারকম তুকতাক করে। আমারও ডাক পড়ল পরক্ষণেই। মুকুর পক্ষে একলা কিছু করা সম্ভব নয়। সঙ্গে একজন অ্যাসিসটেন্ট চাই। তাকে বকবে, ধমকাবে। তবেই কাজ এগোবে। গলায় ওইভাবে চাদর বাঁধা। চুড়ো করা চুল। একেবারে অন্যরকম দেখাচ্ছে। চোর ধরব, না মুকুকে ধরব!
বললুম,তোমার এই অদ্ভুত সাজ কেন?
লাজুক লাজুক হেসে বললে, কীর্তন করছিলুম যে। মুকুরও লজ্জা আছে। কীরকম দেখাচ্ছে?
ফ্যান্টাসটিক।
একটা একতারা কিনে দেবে। রোজ সকালে দিদি আর আমি গান গাইব। লাগ গুমগুম। দিদির গলা যেমন সুন্দর, সেইরকম গানের স্টকও অনেক। সকালটা খুব জমে যাবে। আমার গলাটা কেমন?
বেশ ভাল। গানের চর্চা করো না। বাড়িতে সবই রয়েছে, হারমোনিয়ম, তানপুরা, এসরাজ, তবলা।
তাই তো করব। মেসোমশাই বলতেন, যার যা গুণ আছে, সব ফুটিয়ে তোলো। এমন মানব-জনম আর কি হবে। মন যা করো ত্বরায় করো এইভাবে ॥ কত ভাগ্যের ফলে না জানি। মন রে পেয়েছ এই মানব-তরণী ॥
মুকু সুরেই বলছে। গলা সাবলীল, হঠাৎ থেমে গেল, এই জায়গায় মন রে, বলে বিশাল একটা টান আছে, ওইটা আমি পারব না। দোতলার বারান্দার দিকে তাকাল। উদাসী ভৈরবীর মতো সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন দিদি। মুকু বললে, আপনি পারবেন দিদি?
পারব, তবে আমার এখন সুর কেটে গেছে। বড় খারাপ লক্ষণ, এই কাপড় পুড়ে যাওয়া। আমি আর বেশিদিন নেই।
মুকু বললে, কুসংস্কার ছাড়ুন তো। যত বাজে ধারণা। এই দেখুন না, কারণ আমি খুঁজে পেয়েছি। লেডি শার্লক হোমস।
মুকু নিচু হয়ে দুটো পোড়া দেশলাই কাঠি তুলে আমার চোখের সামনে ধরল, দেখেছ! যা বলেছিলুম তাই। কাল রাতে চোর এসেছিল।
ওটা কোনও প্রমাণ নয়। চোর এসে মশাল জ্বেলে জানান দেবে না, আমি এসেছি, আমি এসেছি বঁধুয়া। তারা নিঃশব্দে আসবে, নিঃশব্দে কাজ সেরে পালাবে।
কেন? তুমি শোনোনি চোর এসে আগে বড় বাইরে করে। নিশ্চয় কোথাও করেছে। খোঁজো। আমি স্যানিটরি ইন্সপেক্টর নই মুকু। চোরের বড়বাইরে খুঁজব!
এটা ইনভেস্টিগেশন। সন্দেহের শেষ রাখতে নেই। দেখছ না! দিদি কীরকম ভয় পেয়ে গেছেন। মুকু হঠাৎ নিচু হয়ে কী একটা তুলল। উৎসাহ দেখে মনে হল মানিক পেয়েছে। আমার চোখের সামনে দু’আঙুলে তুলে ধরে বললে, হোয়াট ইজ দিস?
একটা আধপোড়া বিড়ি। মুকু বললে, তুমি বিড়ি খাও। আমরা শুয়ে পড়ার পর কাল তুমি চুপকে চুপকে বিড়ি খেয়েছিলে?
না, আমার কোনও নেশা নেই।
আমি খেয়েছিলুম? দিদি?
না।
তা হলে এই বস্তুটি এমন জায়গায় এল কী করে? উত্তর দাও।
কেউ ফেলেছে।
বেশ, তা হলে একটা কারক আছে। কারক ছাড়া কার্য হয় না। ব্যাকরণের সাধারণ নিয়ম। কর্তা, কর্ম, করণ, সম্প্রদান, অপাদান, অধিকরণ।
একেবারে হরিশঙ্কর কেটে বসানো। পৃথিবীর যা কিছু তুচ্ছ, অতি তুচ্ছ, গুরু অথবা লঘু, ঘুরে যাবে শিক্ষার দিকে। দুটো গিয়ারে পৃথিবী ঘুরছে। গ্রামার আর ম্যাথেমেটিক্স। মানুষের দেহটা তো পারফেক্ট জিওমেট্রি, ইলিস, স্ফিয়ার, ট্রাঙ্গল, রেকট্যাঙ্গল, অ্যাকসিস, ফালক্রাম। পৃথিবীটা পিয়োর ম্যাথেমেটিক্স, মানুষ হল গ্রামার। একগাদা কারক একে আর-একের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মার্চ করছে।
মুকু বললে, কী হল? বোবা মেরে গেলে কেন? কর্তা ছাড়া কর্ম হয়!
কেউ বাইরে থেকে ছুঁড়ে মেরেছে।
বাইরে থেকে এত দূর ছোঁড়া যায়, একমাত্র আধলা ইট ছাড়া?
তা হলে কাকে এনেছে মুখে করে।
তোমার মুন্ডু! এখানে কাল রাতে কোনও এক ব্যাটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিড়ি ধরিয়েছিল। অন্ধকারে আন্দাজ করতে পারেনি। দপ করে ঝোলা কাপড়ে আগুন ধরে গেছে। মেরেছে চম্পট। কেস ডিটেক্টেড। এইবার চা।
মুকু তরতরিয়ে উঠে গেল ওপরে। এইবার তার কাজ শুরু হবে ঝড়ের বেগে। কোনও থামাথামি নেই। কাজের বুলডোজার চালিয়ে দেবে। দিদি উনুন ধরাবেন। নীচে এসেছেন কয়লার খোঁজে। ভাঙা একটা ড্রামে কয়লা। মুকু যতই কর্তা আর কর্ম দেখাক, আমার মনে ঘুরছে সেই এক কুসংস্কার। দিদির একটা কিছু হবেই। তারই বার্তা এসেছে ওই কাপড়ে আগুন ধরে যাওয়ার ইঙ্গিতে। দিদির দিকে তাকিয়ে মনে হল, একটা জাওলা মাছ দেখছি। যে-কোনওদিন ছাই মাখিয়ে আঁশ বঁটিতে কুটবে সে। সে কে? জানি না। মহামান্য, মহাপ্রতাপশালী তিনি। মানুষ পেছন ফিরে থাকলেও অনুভব করতে পারে। জাল ফেলে জলে বসে আছে জেলে।
দিদি টিনের দিকে হাত বাড়াতেই বলে ফেললুম, আপনি না আপনি না। আমি বার করে দিচ্ছি।
দিদি থতমত হয়ে বললেন, কেন ভাই!
আপনার হাত কেটে যেতে পারে।
হাত কাটবে কেন?
যদি যায়।
দিদি অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকালেন। সুন্দর মুখটা। অনেকটা কৃষ্ণের মতো। ভীষণ ধারালো। এমন যার টিকোলো নাক, তার নাকে রসকলি কেমন মানাবে। দিদির ঠোঁটদুটো থিরথির করে কাপল কয়েকবার। অতি কষ্টে বললেন, শেষকালে এত ভালবাসা! ঈশ্বর এতদিন যেমন কৃপণ ছিলেন, এবারে একেবারে মুক্তহস্ত। ভাই, একটু-আধটু কেটেকুটে গেলে কী-ই বা হবে! জীবনে কত চোট পেয়েছি!
আপনি জানেন না, মরচে-ধরা টিন কী সাংঘাতিক!
আমি ধুমধাম কয়েক ঢেলা কয়লা বের করে দিলাম। আমার ভয়, টিনের কাটা মানেই টিটেনাস। আর কাটবেই। একটা কিছু হবেই। স্বামী নির্মলানন্দজি আমাকে বারেবারে সাবধান করে দিয়েছেন, নেগেটিভ চিন্তা করবে না। থিঙ্ক গুড অ্যান্ড ইউ গেট পজিটিভ রেজাল্ট কোথায় কী? আমার মন মানে না। লখীন্দরকে যেমন লোহার বাসরঘরে রাখা হয়েছিল, দিদিকেও সেইরকম রাখতে পারলে কিছুটা শান্তি পাওয়া যেত। সে আর হয় কী করে! ঈগলের দৃষ্টি পড়েছে। মানুষ-ইঁদুরটিকে ছো মারবেই।
