ভয়ের ভাবটা ধীরে কেটে আসছে। শরীর শিথিল হচ্ছে। ভারী হচ্ছে ক্রমশ। যেন দেবে বসে যাচ্ছে বিছানার গদিতে, শ্বাসপ্রশ্বাস ক্ষীণ হয়ে আসছে। শরীরের উত্তাপ কমছে। হৃদস্পন্দন মৃদু থেকে মৃদুতর। ধ্যান জমছে। সমস্ত লক্ষণ সুস্পষ্ট। বেশ ভাল লাগছে। কিছুই যে পারে না, সে একটা অতিশয় কঠিন জিনিস পারছে। যে পারায় ধন-জন-বিত্ত-অর্থ কোনও কিছুই লাভ হবে না। শুধু একটা আত্মতৃপ্তি, ভিন্নতর একটা জগতের উপলব্ধি হবে। মনটাকে নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে দিয়েছি। তুলোর মতো ভেসে যাক। যেখানে যেতে চায়, যাক চলে। দেহ কোনও বাধা হবে না। দৃষ্টিকে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছি জমধ্যে। সেইখানেই আছে আমার তৃতীয় নয়ন। তৃতীয় নয়নেই দেখা যায় হৃদয়-আকাশ। সেই আকাশের বর্ণ আর আলো সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের।
আমার দেহের নিম্নভাগ থেকে একে একে সব অদৃশ্য হতে লাগল। পা গেল, উদর গেল, বুক গেল, হাতদুটো গেল। নেই। কোনও অনুভূতিই আর রইল না। শুধু আমার মুণ্ডটা ভাসতে লাগল। অন্য ধরনের একটা ভয় এল। মরে যাব না তো! একটা মাথার অনুভূতি ছাড়া আর কিছু রইল না। ভীষণ একটা শৈত্যের বোধ। কপালের সামনে শিশিরে বোনা একটা পরদা দুলছে। মা বলে চিৎকার করতে ইচ্ছে করল। নড়ে বসতে চাইছি। ঝাড়া দিয়ে উঠতে চাইছি। পারছি না। আমি আর আমার হাতে নেই। মুণ্ডটা বেলুনের মতো দুলছে। হঠাৎ দৃষ্টি-পরদায় একটা চিড় ধরল। শিশিরের দানা ঝরে পড়ল ঝরঝর করে। জ্বলজ্বল করে উঠল একটা দৃশ্য:
একটা শুকনো নদী। জল নেই। শুধু নুড়ি-পাথর। কিছু দুধের মতো সাদা, কিছু শ্যাওলা সবুজ, কিছু নীল। অজস্র উপলখণ্ড, এ পাশ থেকে ও পাশে চলে গেছে। পরপারে পাহাড়। পাহাড় শুধু পাহাড়। স্পষ্ট দেখছি, একটি শিলাখণ্ডে নিবিষ্ট মনে উপবিষ্ট হরিশঙ্কর। আমি তার মুখের একটা পাশ দেখতে পাচ্ছি। চোখে সেই সোনালি চশমা। শুভ্র বাস। দু’হাতে হাঁটুদুটি ধরে বসে আছেন। আমি তার পায়ের কাছে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলুম, সঙ্গে সঙ্গে তিনি সরে গেলেন অসীম দূরত্বে। আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে। আমি টাল খেয়ে বিছানার ওপর পড়ে গেলুম। সংবিৎ ফিরে এল। ভোর হচ্ছে। একটা পাখিই কোনওক্রমে বাসা ছেড়েছে। মৃদু মৃদু ডাকছে। পাশের ঘরে মৃদু স্বরে গান ধরেছেন দিদি। হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ। একেবারে বাঁশির মতো গলা।
কোনওক্রমে উঠে বসলুম। আর একটু হলেই খাট থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেতুম। সামনের দাঁতদুটো অবশ্যই ভাঙত। হা হয়ে গেলুম, একী! ঘরের দরজাটা হাট খোলা। আমার বেশ মনে আছে, দরজা আমি ভেতর থেকে বন্ধ করে শুতে গিয়েছিলুম। কোনও কারণই খুঁজে পেলুম না। হয়তো ভুল হয়েছিল। বাতাসে খুলে গেছে। ছিটকিনি হয়তো সত্যই দিইনি। খাট থেকে মেঝেতে নেমে এলুম। ছোট্ট পাখির ডিমের মতো জিনিস ভেঙে কুচোকুচো হয়ে পড়ে আছে। ভোরের আলোয় তার অপ্রাকৃত চেকনাই। সবকিছুই আমার কাছে অপ্রাকৃত মনে হচ্ছে আজ। এই লৌকিক জগৎ আর পারলৌকিক জগতের মধ্যে মাকড়সার জালের মতো যে সূক্ষ্ম ব্যবধান, সেই ব্যবধানে আমি একটু ছুঁচ ফোঁটাতে পেরেছি অন্তত। সামান্য এক ছিদ্র। সেই ছিদ্রপথে আমি দেখেছি, আলোর কী নীলিম ঔজ্জ্বল্য, বাতাসের কী সূক্ষ্মতা, বস্তুর কী ভারহীনতা!
এটা টিকটিকির ডিমের চূর্ণ আবরণ না অন্য কিছু, মুক্তোও তো হতে পারে! অ্যানালিসিস হবে পরে, আপাতত তুলে রাখি সাবধানে। পাশের ঘরে দুই মহিলাই কীর্তন শুরু করেছে। ওদের মধ্যে কে একজন টিংটিং করে কী একটা বাজাচ্ছে। সম্ভবত কাসার গেলাসের গায়ে হাতের বালা ঠুকে শব্দটা তুলছে। বেশ ভালই লাগছে। মনে হচ্ছে কোনও এক আশ্রমে ঘুম ভাঙল।
বারান্দায় বেরিয়ে এসে চক্ষু স্থির। খুব মিহি, ধূসর কিছু ছাই পড়ে আছে। বাতাসে ঘুরপাক খেয়ে তালগোল পাকিয়ে লম্বা লম্বা সাপের মতো, কিছু এখানে কিছু ওখানে, কিছু যেন ছাড়া ছাড়া শুয়ো পোকা। ঠিক আমার ঘরের দরজার বাইরে। বুকটা হুঁত করে উঠল। ব্যাপারটা কী!
যার সাহায্যের কথা প্রথমেই মনে এল, সে মুকু। বেশ জোর গলায় ডাকতে হল। ওরা গান গাইছে গেলাস বাজিয়ে। মুকু আর দিদি দু’জনেই বেরিয়ে এল। মুকুর পোশাক দেখে অবাক। একটা সাদা চাদর দু’বগলের তলা দিয়ে ঘুরিয়ে সামনে এনে আড়াআড়ি বুকের ওপর দিয়ে নিয়ে গিয়ে ঘাড়ের পেছনে একটা গাঁট বাঁধা। বাউলের মতো দেখাচ্ছে মুকুকে। অদ্ভুত এক মজার মেয়ে। একদিনেই দিদিকে অনেক তাজা দেখাচ্ছে। অনিশ্চয়তা কেটেছে আপাতত। একটা নির্ভরতার ভাব এসেছে।
মুকু মেঝের দিকে তাকিয়ে বললে, এসব কী?
সেইজন্যেই তো তোমাদের ডেকেছি। মনে হচ্ছে কোনও কিছুর পোড়া ছাই। বললুম না কাল রাতের দেখা তীব্র আলোর কথা।
মুকু উবু হয়ে বসে বললে, দাঁড়াও, গোয়েন্দাগিরি করি। আঙুল দিয়ে একটা ছাইয়ের নুড়ি নাড়াচাড়া করে বললে, এ তো মনে হচ্ছে ন্যাকড়াপোড়া ছাই। কে কী পোড়াল? কালও তো কিছু ছিল না শুতে যাবার সময়।
হঠাৎ দিদি লাফিয়ে উঠলেন, আরে, আমার থান ধুতিটা কী হল। কাল যে শুতে যাবার সময় এইখানে ঝুলিয়ে দিয়ে গিয়েছিলুম।
মুকু উঠে দাঁড়াল, সেকী? সে আবার কী! ধুতিতে আপনা-আপনি আগুন ধরে গেল!
আমি চুপ মেরে গেলুম। অতীত ইতিহাস মনে পড়ল। সেই প্রথম ঘটনা। দেখিনি। শুনেছি। আমার মায়ের শাড়ি এইভাবেই জ্বলে গিয়েছিল। আমার মা তারপরে মাত্র তিনমাস বেঁচে ছিলেন। এরই নাম ‘ইল ওমেন। মেনে নিতে ইচ্ছে করে না। যুক্তিবাদী মন ভৌতিক ক্রিয়াকলাপে বিশ্বাসী নয়। কিন্তু এই তো আর একবার ঘটল সেই একই ঘটনা। এদের সামনে অতীত প্রসঙ্গ তুলে মনোবল ভেঙে দিতে চাই না।
