সে যাই হোক। ভাবনা তো অনেক হল, আমার কী হবে? ব্রেকডাউন গাড়ির মতো জীবনের একপাশে পড়ে থাকব! ফ্যালফ্যাল করে দেখব, হাই স্পিডে সব বেরিয়ে যাচ্ছে জীবনের রাজপথ ধরে! ঊ্যা করে জন্মে আমি কী পেলাম? সবাই ভাবলে আমি এক রেসের ঘোড়া। শিক্ষার রেসকোর্সে ছেলে আমার ডার্বি নেবে। সেই জোরে জীবিকার বিশাল মাঠে সবাইকে মেরে বেরিয়ে যাবে। সদরে মোটরগাড়ি, লোকজন, দাসদাসী। আজ ভারতে তো কাল বিলেতে! বউটি হবে ডানাকাটা পরি, ইউনিভার্সিটি ব্লু, আধুনিকা, কিন্তু চালচলনে সাবেকি। খোঁপায় তোলা ঘোমটা, বাতাসের স্বরে কথা, তুলোর পায়ে হাঁটা। পাশ ফিরতেও পারমিশন নেবে, হাসবে কিন্তু শব্দ হবে না, সাইলেন্সার লাগিয়ে হাঁচবে। রাগবে না, আবহাওয়া যেমনই হোক, বসন্তের বাতাসের মতো বইবে। এমন ছেলে কই হলাম! উঁ্যা করে জন্মে আমি কী পেলাম! প্রথমে মাসি-পিসি, এ মাসি-পিসি সেই মায়ের বোন মাসি বাপের বোন পিসি নয়, এক ধরনের ফুসকুড়ি। তারপরে ঘুংরি কাশি। স্মৃতি এখনও অমলিন। যে পারে সে পিটিয়ে যায়। সকালে কানটানা। মাস্টারমশাই ভীষণ রাগী। পড়াবেন কী? ধৈর্য নেই। কান টানাই তার মেডইজি। কান ধরে টানলে অঙ্ক বেরোবে। কান ধরে টানলে। ইংরিজি ঝরবে। তিনি ছাড়লে কী হবে! স্কুলে ডাস্টার পেটা। সহপাঠীর ল্যাং। আমি যেন এক বেওয়ারিশ মাল।
পাশের ঘরে মহিলা দু’জন ঘুমিয়ে পড়েছে। দু’জনেরই মন পরিষ্কার। কোনও ঘোরপ্যাঁচ নেই। বিছানায় পড়তে-পড়তেই ঘুমে কাদা হবে না কেন? বাইরের বারান্দায় আজ সেই শব্দ। বহুদিন পরে ফিরে এল। ভয় করে, তবু উন্মুখ হয়ে থাকি। বুঝতে পারি না। সামনাসামনি যাওয়ার সাহসও নেই। শব্দের সঙ্গে শব্দকারীকে যদি দেখে ফেলি! আমার ঘর অন্ধকার। বিছানায় পড়ে আছি মড়ার মতো। ঘুমের পাত্তা নেই। মাথার ভেতর দিয়ে সারা কলকাতা শহর সশব্দে নেচে নেচে চলেছে। বারান্দায় সেই সাবধানী পায়ের শব্দ এ পাশ থেকে ও পাশ, ও পাশ থেকে এ পাশ করছে। বহুকাল কোথাও আবদ্ধ থাকলে, সেই বন্দি মানুষ যেমন নিরুপায় হয়ে এ দেয়াল থেকে ও দেয়াল পায়চারি করে, এ যেন ঠিক সেইরকম। মনে হয় কোনও রমণী। অকালে চলে যাওয়া এ বাড়ির কোনও বধূই হয়তো! দেহ গেছে, আত্মা এখনও যেতে পারেনি মায়ার বাঁধন খুলে। আগেও দেখেছি আজ দেখছি, পদশব্দ যেন এই ঘরেই আসতে চায়। বারেবারে ফিরে এসে এই ঘরের সামনেই থামছে। থেমে থাকছে বেশ কিছুক্ষণ, তারপর ফিরে যাচ্ছে আবার। আমার শরীরের সমস্ত লোম খাড়া হয়ে উঠছে। বন্ধ দরজার বাইরে তীব্র একটা আলো জ্বলে উঠল। আলোর রেখায় হিলহিল করে উঠল দরজার সমস্ত ফঁকফোকর। আলোটা জ্বলেই মুহূর্তে নিবে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সারাঘর ভরে গেল অপূর্ব সুবাসে। এর একটাই ব্যাখ্যা, শব্দকারী জাগতিক দরজার বাধা পেরিয়ে চলে এসেছে ঘরে। এই সুগন্ধই তার প্রমাণ। ভয়ে আমার কণ্ঠ, তালু শুকিয়ে গেল। ধূপ তো কেউ জ্বালেনি! আলোর উৎসই বা কী? বারান্দার পেছনে শুধুই ঝোঁপঝাড়, বাগান। সব কিছুরই তো একটা কারণ থাকবে। পাশের ঘরের দু’জন অঘোর ঘুমে অচৈতন্য।
হঠাৎ মনে হল, আমার এত ভয় কেন! কীসের ভয়! কাকে ভয়! ভয় পেয়েছি ঠিকই। দেহ অসাড় কিন্তু যুক্তি কাজ করছে। ভয় মৃত্যুকে। মরে যাওয়ার ভয়। এতদিন তা হলে বৃথাই গুনগুন করেছি, ‘আমি ভয় করবনা ভয় করব না। দু’বেলা মরার আগে মরব না ভাই মরবনা।।’ এই তো সেই পরীক্ষার সময়। আমি তো মরতেই চাই। আর একবার ভাল করে জন্মাতে চাই। এবারের সব ভুল-ত্রুটি শুধরে নিয়ে উজ্জ্বল, প্রোজ্জ্বল এক জীবনের প্রত্যাশী। যে-জীবনে কাম বলে কোনও আকাঙ্ক্ষা থাকবে না। রমণীর জন্যে থাকবে না কোনও ব্যাকুলতা। ওইটাই তো এইবারের জীবনে কাল হয়ে উঠেছে।
ঝেড়েঝুড়ে উঠে বসলাম বিছানায়। দেখি ধ্যান লাগাই। চেষ্টা করি আলো আর সুগন্ধের উৎসটাকে ধরার। মনে হয় আমার মা এসেছেন। এসেছেন আমার পিতার খবর নিতে। শুনেছি, তিনি অতিশয় প্রেমিকা ছিলেন। জীবনকে ভয়ংকর ভালবাসতেন বলেই পঁচিশের আগে মৃত্যু নিয়ে গেল হাত ধরে। তিনি এসেছেন ফেলে যাওয়া লন্ডভন্ড এই সংসার দেখতে নিতান্তই এক পর্যবেক্ষকের মতো। ছেলেটা কত বড় হল! পিতা হরিশঙ্কর উপস্থিত থাকলে জিজ্ঞেস করতেন মন দিয়ে মনে, এখনও তোমার শেষ হল না কর্তব্য! জীবননদীর ওপারে আর কতকাল আমাকে দাঁড় করিয়ে রাখবে একা? চলে এসো। চলে এসো। তুমি বৃদ্ধ হয়েছ, নিঃসঙ্গ সংগ্রামী। রাখো তোমার ধনুর্বাণ। জীবনেরে কে রাখিতে পারে?/আকাশের প্রতি তারা ডাকিছে তাহারে। চলে এসো মহাসিন্ধুর এপারে। সমুদ্রস্তনিত পৃথী, হে বিরাট, তোমারে ভরিতে। নাহি পারে। তাই এ ধরারে। জীবন-উৎসব-শেষে দুই পায়ে ঠেলে। মৃৎপাত্রের মতো যাও ফেলে ।
মনে মনে বিছানাটাকে মন্ত্র দিয়ে ঘিরলুম। এখন আমি গণ্ডির ভেতরে। এইবার মন স্থির করে দেখি কী হয়! কী পাই! কে আসেন! আজ এসপার ওসপার। স্থির হয়ে বসলুম। ছেলেবেলার সেই। মন্ত্রটাও আওড়ে নিলাম, অধিকন্তু ন দোষায়, বুকে আছে রামলক্ষ্মণ ভয়টা আমার কী! এই হল। মানুষ। আমার মা যদি এসেই থাকেন আমি তার ছেলে, ভূত ভেবে ভয় পাচ্ছি কেন? মানুষ মারা গেলে জীবিতের পৃথিবীতে তাঁর ফিরে আসার অধিকার নেই! ধীরে ধীরে আমার চোখ বুজে এল। তীব্র হল ঘুরে ঘুরে বেড়ানো সুগন্ধ। বুদ্ধি স্তব্ধ। ব্যাখ্যা অপহৃত। There are more things in heav en and earth Haratio/ Than are dreamt of in your philosophy.
