মুকু বললে, তোমার তো ধাতের শেষ নেই। পিত্তির ধাত, সর্দির ধাত, বাতের ধাত, অম্বলের ধাত। এখনও সময় আছে, রোজ সকালে উঠে মেসোমশাইয়ের মুগুর আর ডাম্বেল নিয়ে ভাঁজো, তা না হলে অকালে বুড়ো হয়ে যাবে।
দিদি বললেন, আমাকে সব দেখিয়ে দাও, ছোটখাটো জলখাবার একটা করে ফেলি।
মুকু বললে, এই অবস্থায় তো আপনাকে আমি খাওয়ার জিনিস ছুঁতে দেব না।
কেন? আমি কিন্তু খ্রিশ্চান হইনি।
আমাদের জাতিভেদ নেই দিদি। আপনার রাস্তার কাপড়। আগে ভাল করে চান করুন। দেখি পুঁটলিতে কী আছে!
মুকু পুঁটলিটা টেনে নিয়ে খুলতে শুরু করল। দু’খানা নরুন পাড় ধুতি, দুটো ব্লাউজ, একটা চাদর, গামছা আর একটা ঝকঝকে পেতলের ঘটি বেরোল। মুকু সব পরীক্ষা করে বললে, নাঃ, আপনার পরিষ্কার স্বভাব। গামছাটা তেলচিটে নয়, ধুতি চাদর বেশ পরিষ্কার, আর ঘটিটা ঝকঝকে। ঘটির মায়া ছাড়তে পারেননি!
না বোন, ওটা মায়া নয়। বড় কাজের জায়গায় অজায়গায় জল খাওয়া যায়। ধরতে পারলে জলটাই তো বিনাপয়সায় পাওয়া যায়। প্রয়োজনে বাঁধাও দেওয়া যায়। সোনার পরেই কাসা। এই ঘটিটা সাতবার বাঁধা পড়েছে। এক রেট, আড়াই টাকা। ভরনের কাসা। ফেলনা নয়। ঘটিটা সঙ্গে থাকলে মনে বেশ একটা বল পাওয়া যায়। ধার আর বাঁধা, এ ছাড়া বাঙালি বাঁচবে কী করে? বাপের সম্পত্তি বেচবে আর ফুর্তি করবে। চলো বোন, তোমাদের চানের জায়গাটা দেখিয়ে দাও আর এক টুকরো কাপড়কাঁচা সাবান দাও।
এখন আর কাপড়জামায় সাবান দিতে হবে না। জলকাঁচা করে দিন।
সাবান আমি গায়ে মাখব।
গায়ে মাখা সাবান বাথরুমেই আছে।
গন্ধ সাবান মাখব বোন!
বেশি আদিখ্যেতা করবেন না, বিচ্ছিরি লাগছে। যা স্বাভাবিক তাই করুন। দুঃখ নিয়ে দারিদ্র্য নিয়ে নাকে কাঁদবেন না। পৃথিবীতে কেউ দরিদ্র হবে, কেউ হবে ধনী। কেউ খেয়ে মরবে, কেউ না খেয়ে। এতে অবাক হবার কী আছে! কেউ চরিত্রবান হবে, কেউ দুশ্চরিত্র। যান, চান করে আসুন। মাথা ভেজাবেন না। নতুন জল সহ্য হবে না।
দু’জনেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমার আর একবার হা হা করে হাসতে ইচ্ছে করল। হায় ভগবান, ম্যান প্রোপোজেস গড ডিসপোজেস। হয়ে গেল। কোষ্ঠীতে একেই বলে, বন্ধনযোগ। দুই রমণীকে এখন বহে বেড়াও। ঈশ্বর এক হাতে নেন, আর এক হাতে দেন। কল্য, অহো, গতকল্য করেছে প্রস্থান/লইয়া বঙ্কিম মধু বিহারী ঈশান! আজ আমি আছি যবে, জগৎ-চষকে। প্রাণপণে প্রাণ ভরি করি সুধাপান।
দিদির পুঁটলিটা খোলা পড়ে আছে মেঝেতে। একটি ধুতি, একটি ব্লাউজ, চাদর, ঘটি। ছোট টিনের সুটকেসে কী আছে জানি না। এত বছর সংসার করে এই মাত্র সম্বল! কী করতে মানুষ আসে এখানে! মাঝে মাঝেই আমার মাথায় একটা গানের লাইন খেলে যায়–্যা করে জন্মে আমি কী পেলাম! একটু কৃশ হয়েছেন ঠিকই, তবু চেহারায় অভিজাত শ্রেণির ধার। পরিচ্ছন্ন। যে-জীবনই কাটিয়ে আসুন, নিজেকে ধরে রেখেছেন, ভেসে যেতে দেননি। দরিদ্র, কিন্তু দারিদ্র্য দাঁত ফোঁটাতে পারেনি। একেই বলে, গ্রেট ফাঁইটার। ঈশ্বর যেন উদাহরণ ভেট পাঠালেন, দেখো পিন্টু! সামান্য এক মহিলা! কোন শক্তিতে আজও যোদ্ধা! তুমি হলে কী করতে? অবশ্যই আত্মহত্যা। দেখে শেখো। দুটো দিক, শ্রুতি আর দর্শন। শুনে শেখা আর দেখে শেখা।
২.১৩ ট্যাঁ করে জন্মে আমি কী পেলাম
বেশ রাত। দেয়াল ঘড়ি সময়ের পায়ে টকাস টকাস হাঁটছে। মহাকাল যেন হাইহিল জুতো পরে সানবাঁধানো পৃথিবীতে বেড়াতে বেরিয়েছেন, কিংবা প্রজাদের কাছে খাজনা আদায়ে। খাজনা হল দিন। একটা করে দিন তুলে দিতে হবে তার হাতে। ভাবতে বেশ রোমাঞ্চ হয়, আমি একটা গাছ। অনেক পাতা। রোজ একটা করে পাতা খসে পড়ে যাচ্ছে। একদিন শেষ পাতাটি পড়ে যাবে; তখন আমি বলতে পারব, আমার কথাটি ফুরোল, নটে গাছটি মুড়োল।
পাশের ঘরে মুকু আর দিদি একই বিছানায় পাশাপাশি শুয়েছে। দু’জনে খুব গজর গজর করছে এখনও। মেয়েদের কথা সহজে শেষ হয় না। রাতের রান্না দিদিই করলেন। কথাটা ঠিকই, অসম্ভব ভাল রাঁধেন। প্রথমে ঠিক হয়েছিল, ডিমের কারি আর রুটি হবে। মুকু হঠাৎ বললে, আজ থেকে এ বাড়িতে নিরামিষ হবে। দিদি খাবে না, আমরা মাছমাংস খাব, তা হতে পারে না। অসম্ভব।
দিদি বলেছিলেন, তা কেন? তোমরা মাছমাংস খাও না! আমি আমিষ রান্নাও খুব ভাল পারি। আমার জন্যে তোমরা কেন সব ত্যাগ করবে?
মুকু বলেছিল, তাতে আমাদের খাওয়া হবে, কিন্তু আনন্দটা কমে যাবে। একসঙ্গে বসে খেতে পারব না। পাশাপাশি দুটো আলাদা ব্যবস্থা। হৃদয়হীনতার চূড়ান্ত। একধরনের অসভ্যতাও। ওরকম দুই দুই এ বাড়িতে আমি অ্যালাউ করব না। আমি যা বলব তাই হবে। কোনওরকম তর্ক চলবে না।
দিদি হাঁ হয়ে বসে রইলেন। নীল চৌখুপ্লি শাড়ি পরে মুকু হনহন করে চলে গেল। দিদি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এমন মেয়ে তো দেখিনি। যেমন রূপ, তেমন তেজ। তেমন মন তেমন হৃদয়! এ কে! তামারও তো সেই একই প্রশ্ন, এ কে? এ যে দেখি হরিশঙ্করের নারী সংস্করণ। হরিশঙ্করের গুণাবলির মধ্যে কয়েক পোয়া মমতা মিশিয়ে দিলেই মুকুর অন্তঃকরণ। নিখাদ এমন আবেগ, আবার এমন বিচার ও পরিচ্ছন্নতা সহসা দেখা যায় না। আবার এমন স্বার্থশূন্যতা!
বড় নেশাতে পড়েছি শ্যামের বাঁশিতে। জামা ধরে যখন গাড়ি থেকে টেনে নামিয়েছিল, ভেবেছিলুম মুখদর্শন করব না। নিদারুণ অসভ্যতা। পরে চিন্তা করে দেখলুম, যাকে আমি অসভ্যতা ভাবছি, সেটা আসলে আবেগ। মুকু যা কিছু করে তার মধ্যেই জীবন-মরণ একটা নিষ্ঠা কাজ করে। অদ্ভুত এক আন্তরিকতা। কোনও ফাঁকি নেই। সেইটা ধরতে না পারলেই মনে হবে মেয়েটা বুঝি পাগলি।
