লক্ষ করছি, মুকুর ফরসা মুখ ক্রমশই লাল হয়ে উঠছে। গোলাপের মতো।
মুকু বললে, আপনি এই সংসারে আপনার মর্যাদায় থাকবেন। এত সব কাণ্ড যখন হচ্ছে, তখন আপনার ছোটকাকাকে কেন জানালেন না? তার মতো মানুষ এককথায় সব ঢিট করে দিতেন।
আমি তো তখন কিছুই জানতাম না বোন। আমার তখন উথালপাথাল অবস্থা। লম্পটের শিকার ফসকেছে। হায়নার মতো আমাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে।
কেন, এইসব লোকের জন্যে তো সব জায়গাতেই ঘর আছে!
ও, সে বুঝি জানো না, ব্যাটাছেলেদের অদ্ভুত একটা মজা আছে, ঘরের বউকে খারাপ করে পথে বের করার আলাদা একটা আনন্দ আছে। আমি ওদের হাড়ে হাড়ে চিনে গেছি বোন। সেই ফাদার। আমাকে রাতের অন্ধকারে হুগলির গির্জায় পাঠিয়ে দিলেন। আর সেই ভাগনেচন্দ্র চার বছরে মামার যা কিছু ছিল সব ফুকে দিয়ে সরে পড়ল। তারপর হল ধর্মের কল বাতাসে নড়ল। একদিন দেখি। অন্ধকার মাঠের ওপর দিয়ে সাদা একটা পুঁটলি গড়াতে গড়াতে আসছে। প্রথমে ভেবেছিলুম ভূত। তারপর দেখি আমার সোয়ামি। ওগো! আমি এলুম। আমার যে কেউ নেই। তুমিই যে আমার সব। সেকী? আমি তোমার সব কী গো! আমি যে কুলত্যাগী, বেশ্যা গো! পুঁকতে ধুঁকতে বললে, তুমি দেবী, তুমি অন্নপূর্ণা। সে একেবারে পায়ে পড়ে আর কী! বলে কিনা, আমি তোমার সন্তানের মতো। আর মেয়েদের মন! জানোই তো! মেয়েদের মনে মায়ের বাসা। একবার মা বললে আর রক্ষে নেই। মানুষটাকে দেখে চোখ ফেটে জল এল। একেবারে জরাজীর্ণ। একটুখানি বাতাসের জন্যে শ্বাস টানছে, মনে হচ্ছে হাপর চলছে। নিজের শরীরস্বাস্থ্যের দিকে তাকিয়ে লজ্জা হচ্ছিল; আমি এত সুস্থ, লোকটা এত অসুস্থ! যতই হোক আমার স্বামী। সংস্কার যাবে কোথায়! জীবন আবার ঘুরে গেল পুরনো খাতে। নতুন জীবনের সন্ধান পেয়েও হারাতে হল একটা কারণে। জানো তো ভাই, বরাত জিনিসটা আগেই। তৈরি হয়ে থাকে, পথের মতো। অদৃশ্য ভগবান ঠিক করে রাখেন কে কোন পথে হাঁটবে।
মুকু বললে, ভগবান-টগবান সব বাজে। আসলে যা হয়, তাই হয়। মানুষ ভগবান ভগবান বলে। চেঁচায়। মানুষের যতরকমের দুর্বলতা, তারই নাম ভগবান! এ তো সবাই জানে, পৃথিবীটা লড়াই। করার জায়গা। লড়তে গেলে অস্ত্র চাই। প্রথম হল শরীর, দ্বিতীয় হল শিক্ষা, তৃতীয় হল মনের জোর, চতুর্থ হল বিচার, পঞ্চম হল নীতি, ষষ্ঠ হল বুদ্ধি, সপ্তম হল মাত্ৰাজ্ঞান, অষ্টম হল সম্পর্ক তৈরি, নবম হল চেতনা, দশম হল সাহস। মা দুর্গা দশভুজা; কারণ এই দশ অস্ত্র ছাড়া লড়াই জেতা অসম্ভব। পৃথিবীতে সবাই অসুর। সবাই ভগবান ভাবলে মরতে হবে।
দিদি বললেন, জীবনে ভিক্ষে ছাড়া সবই করেছি। হয়তো বরাতে সেটাও লেখা আছে।
আবার বরাত!
তা কী হবে! আমার তো বিদ্যাবুদ্ধি নেই। মাঝবয়সি এক মেয়েছেলে। কিছুকাল খ্রিস্টানদের মধ্যে ছিলুম বলে, জড়ভরত ভাবটা তেমন নেই। আর বলতে পারি কইতে পারি, সে আমার বংশাবলির ধারা। আমার মায়ের বাক্যির শেষ ছিল না।
তা হলে দিদি শুনুন, মনু কী বলে গেছেন। পৃথিবীতে যে নাচতে পারে সে নাচবে, যে গাইতে পারে সে গাইবে, যে পড়তে পারে সে পড়বে, যে যুদ্ধ করতে পারে সে যুদ্ধ করবে, যে কাপড় কাঁচতে পারে সে কাপড় কাঁচবে, ব্রাহ্মণ, শূদ্র, মুচি, মেথর বলে কিছু দেগে দেওয়া নেই। নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী বৃত্তি বেছে নিয়ে মানুষেরই সেবা করে মানুষকে বাঁচতে হবে। পৃথিবীতে কোনও তোলা-সিস্টেম নেই যে আরামে গড়াব, সকালে রাজবাড়ি থেকে ভারে ভারে তত্ত্ব আসবে। যে ডাকাত সে ডাকাতি করবে, যার অনেক রূপ যৌবন, সে মনোরঞ্জন করবে। যে ব্যাবসা বোঝে সে ব্যাবসা করবে। তা হলে শুনুন দিদি বাইবেল কী বলছেন:
He shall be like a tree
Planted by the rivers of water,
That brings forth its fruit in its season,
Whose leaf also shall not wither
And Whatever he does shall prosper.
ফাদারদের কাছে বাইবেল তো অনেক শুনেছেন দিদি, নিতে কি কিছু পেরেছেন?
তুমি এত জানলে কী করে?
খুব সোজা। বইয়ের শেষ নেই। পড়ো আর কপচাও। আমি তো দর্শনের ছাত্রী। তবে কথাটা খুব সুন্দর।
বলো শুনি। শুনে আর কী হবে! মরণকালে হরিনাম।
সে হবে গাছের মতো। কে? মানুষ। বীজ পুঁতেছে নদীর জল। নদীর জলে বীজ ভেসে এসেছে। ঢেউয়ের ধাক্কায় সেই বীজ ডাঙায় উঠেছে। অঙ্কুরিত হয়ে ক্রমশ একটি বড় গাছ। ঠিক সময়ে বছর বছর তাতে ফল ধরবে। আর গাছটা কেমন? না, তার পাতা কখনও শুকোবে না। পাতা হল মানুষের সৎকর্ম। আর তার কর্তব্য কী? না, সে যা-ই করুক তাতে যেন মঙ্গল হয়। উন্নতি হয়। মানুষকে হতে হবে গাছ। গাছের মতো সহিষ্ণু, ফলপ্রদ। কত সুন্দর সুন্দর কথা মানুষ বলে গেছে, লিখে গেছে।
ও কিছু না। শয়তানে মাঝে মাঝে ভগবান ভর করে। পৃথিবীটা কিন্তু শয়তানেরই।
বিরক্ত হয়ে বললুম, মুকু, আমরা কিন্তু এখনও উপোস করে আছি।
একা তুমি নেই, আমরাও সবাই আছি। দিদি, আপনি ক’দিন উপোসে আছেন? সত্য বলবেন।
একেবারে নির্জলা দেড়দিন। আর আধপেটা কদিন আমার মনে নেই।
শুনলে তো! আর খাইখাই কোরো না। বেলা চারটের সময় কেউ ভাত খায় না।
তা, যা হয় টুকটাক তো একটু কিছু হবে। পিত্তি পড়ে গেল। আমার আবার পিত্তর ধাত। সত্যিই আমি আর থাকতে পারছি না। পেটে চো চো শব্দ হচ্ছে।
