বাড়ি দেখছি জ্যাঠামশাই।
তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে বিশ্বরূপ শেষরাতে গৃহত্যাগ করছেন, জানলায় দাঁড়িয়ে আছে বিষ্ণুপ্রিয়া। হরি ফিরেছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
একবার মনে করিয়ে দিয়ে তো! আমি যা বলেছিলুম সেটার কী হল? রবিবার আমি অবশ্য একবার দেখা করার চেষ্টা করব।
পরেশদা ছানায় আঁক দিচ্ছেন। পরনে সেই গামছা, গোলগলা আধময়লা গেঞ্জি। রসে-ডোবা চমচমের মতো চেহারা। নীচের দিকটা তাকিয়ার মতো, ওপরদিকটা মাথার বালিশের মতো। তার ওপর একটা তিন নম্বর ফুটবল। দুটো বারকোশের মাঝখানে কাপড় জড়ানো ছানার নাদা। ছাদে উঠে পরেশদার লেফটরাইট চলছে। এক একবার চাপ পড়ছে আর সাদা সাদা জল বেরিয়ে আসছে। পরেশদা দিন দিন কী হচ্ছে! সত্যিই এর নাম ‘টনিক ময়রা। মিষ্টির দোকানে কাজ করতে পারলে, মাসখানেকের মধ্যেই মুটিয়ে যেতুম। নধরকান্তি একটি বটব্যাল।
পরেশদা, গরম রসগোল্লা কখন নামবে?
ছানার ওপর নাচতে নাচতে বললেন, ওই তো রস জ্বাল হচ্ছে। এইবার পড়বে।
দশটা নাগাদ?
এসো, দেখা যাবে।
এক সের বুক করে গেলুম। সবচেয়ে বড়টা।
বুক পেট জানি না। নামলেই নিয়ে যেয়ো।
রাত ক্রমশই রসগোল্লার মতো রসস্থ হয়ে উঠছে। সাত নম্বর বাড়িতে গানের আসর বসেছে। তবলায় চটি পড়ছে। পানবিড়ির দোকানে রেডিয়ো বাজছে। ফটফট করে আলো। বোকাদা ডিম ভেঙে সকালকে সুপ্রভাত করেছিলেন। এখনও ভেঙে চলেছেন। বিদায়রজনী হবে রাত বারোটায়। ইংরেজি মতে তখন নতুন দিন শুরু হয়ে গেছে। জবাদের বাড়ির সেই সদাহাস্যমুখ বাবুটি হাতে একগাদা প্যাকেট ঝুলিয়ে নেচে নেচে চলেছেন, রাত হল, রাত হল, দ্বার খোলো প্রমদা।
গরম রসগোল্লা রেডি হচ্ছে। রাত দশটা নাগাদ পাওয়া যেতে পারে।
দেখেছ, তোমার ইনফর্মেশন কত ভুল! এই ভুল ইনফর্মেশনের জন্যে অতবড় হিটলারের পতন হল। ইংরেজের রাজত্বে সূর্য ডুবে গেল। সত্য শ্রবণে নেই সত্য দর্শনে।
হুড়মাড় দুদ্দাড় করে কনক উত্তরমহল থেকে দক্ষিণমহলে ছিটকে এল। হাতে একটা খুন্তি। সমস্বরে প্রশ্ন, কী হল, কী হল?
কোনওরকমে দম ফেলে কনক বললে, আরশোলা, অসংখ্য আরশোলা। ঝাকে ঝাকে উড়ে আসছে।
পিতা মেসোমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, নাপচিয়াল ফাঁইট, বুঝলেন বিনয়দা! এখন দরকার ঝাটা ট্রিটমেন্ট। এ রোগের দাওয়াই হল ঝাটা পেটা। চলো পিন্টু।
কনকের চেয়ে আমার কিছু বেশি সাহস নেই। মাতুলক্রমঃ। সেই ঘটনাটি মনে পড়লে এখনও, আমার হাসি গুমরে গুমরে ওঠে। কলকাতার এক প্রেক্ষাগৃহে বসেছে উচ্চাঙ্গ সংগীতের আসর। সময় সকাল। মাতুল ধরেছেন গুর্জরী টোড়ি। আলাপ জমে উঠেছে। দুটো তানপুরা দু’পাশ থেকে মিঞাও মিঞাও করছে। তবলচির হাত উসখুস করছে তবলায়। গানের মুখ এলেই তেরে কেটে করে লাফিয়ে পড়বেন। ডান পাশ থেকে বাঁ পাশে ফিরর করে কী একটা উড়ে গেল। সুর বোধহয় পক্ষ বিস্তার করেছে। সুর নয় আরশোলা। পেছনের সাদা পরদায় বসে তাল খুঁজছে। কে জানত, মাতুলের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কাজ করছে। আরশোলা যাঁহাতক উড়েছে দ্বিতীয় চক্করে, তবলা, তবলচি, মাইক্রোফোন, হারমোনিয়ম, গাইয়ে সব একসঙ্গে তালগোল পাকিয়ে স্টেজ থেকে সামনের সারির দর্শকদের ঘাড়ে। গানের মুখ সবে ধরেছিলেন অব মেরে নইয়া। নইয়া পাড়ে ভেড়ার আগেই ডুবে গেল। হইহই ব্যাপার। বেনারসের ওস্তাদ চিৎকার করছেন, কেয়া হুয়া ওস্তাদজি? ওস্তাদজি, তবলচি তখন হামা দিচ্ছেন সামনের প্যাসেজে।
রান্নাঘরের আকাশে লাল বিমানবহর। সপাসপ ঝাটা চলছে। ডাইনে বাঁয়ে। মাঝেমধ্যে দু’-এক ঘা পরস্পরের পিঠেও পড়ছে। পিতা বলছেন, নেভার মাইন্ড, নেভার মাইন্ড। এক একবার চাপস মারছেন। কখনও বলছেন অস্ট্রেলিয়া থেকে কিছু বড় সাইজের টিকটিকি ইমপোর্ট করতে হবে। কখনও বলছেন, ছাতাওয়ালা গলির পিংলিংকে খবর দেবেন। এ জিনিস মেরে শেষ করা যাবে না, খেয়ে শেষ করতে হবে।
প্রেমোন্মাদ শেষ আরশোলাটিকে ঝাটায় চেপে ধরে পিতা হাঁকলেন, কনক, অল কোয়ায়েট অন দি ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট।
১.০৭ সারমন অন দি মাউন্ট
আমাদের নোনা-ধরা দেয়ালের যে-জায়গাটায় দক্ষিণ আমেরিকার মানচিত্র তৈরি হয়েছে সেখানে একটা আদ্যিকালের বদমেজাজি ঘড়ি ঝুলছে। পেন্ডুলামের চেহারাটা হেডমাস্টারের মতো। গুরুগম্ভীর মুখে দুলছে তো দুলছেই। ছন্দটা এইরকম: নো, নো, আই ওন্ট টলারেট। বাজনার সুর রসকষহীন। দুপুর রোদে হাঁকছে যেন, শিল কাটাও। বাজা-র এক মিনিট আগে জানান দেয়, খাড়াক।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পিতাঠাকুর চুলে টাকপড়া বুরুশ চালাতে চালাতে বললেন, ক্লক স্ট্রাইকস টেন। যাও, রসগোল্লা।
ক্লক স্ট্রাইকস বললে কেমন একটা রহস্যের দরজা খুলে যায়। মধ্যরাতে ঘড়ি বাজে, কবর খুলে বাদুড় ওড়ে। চশমার খাপ থেকে দশটা টাকা বের করে আমার হাতে দিলেন। স্নান সেরেছেন। বেশ তাজা দেখাচ্ছে। ছাদের ঘরে ব্যায়াম হয়েছে। ঠাকুরঘরে বসা হয়েছে। ধর্মের জন্যে নয়, একাগ্রতার জন্য। সব কাজ সারা। এইবার রাত বাড়বে, পড়া চলবে, পাতার পর পাতা। টেবিলের একধারে বইয়ের পাহাড়। কী নেই। উপন্যাস, দর্শন, গণিত, ভূবিদ্যা, জ্যোর্তিবিদ্যা, কৃষিবিজ্ঞান। স্বল্পং স্তথা আয়ু বহবশ্চ বিঘ্ন। শিশির ভাদুড়ীর মতো হাত পা নেড়ে বলেন, জ্ঞান অর্জন করে যাও, জ্ঞান অর্জন। করে যাও। এক জীবনে সব হবে না। যতটা পারা যায়, যতটা পারা যায়।
