বললুম, শুনেছি। ব্যায়াম আর কুস্তির ভক্ত ছিলেন। বিশাল শরীর ছিল। বাদাম আর সিদ্ধির শরবত খেতেন কাশীর পালোয়ানদের মতো।
ওই সিদ্ধি আর পালোয়ানিই তো কাল হল। কাকার মুখে শোনোনি?
বাবা অতীতের কোনও কথাই বলতেন না।
এই কারণেই। তোমার বড় জ্যাঠামশাই আর জ্যাঠাইমা এই পরিবারের অতীতের মুখে আলকাতরা মাখিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। অতীত তো ওইটাই। ধ্বংসের অতীত।
মুকু বললে, পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ কী দিদি! অতীত কবরে আছে কবরেই থাক। এখন কাজের কথায় আসুন। এতদিন পরে আপনি কেন এলেন? কী কারণে? ভুলে যখন ছিলেন, ভুলে থাকতেই তো পারতেন।
মুকুর সত্যি মুখের কোনও আঁট নেই। কতবার শুনেছে, অপ্রিয় সত্য বলতে নেই। মহিলাকে অপ্রস্তুত করা।
দিদি কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলেন। দৃষ্টি কোন উদাসে। শ্যামলা মেয়েটির শরীরে এখনও সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে। তপঃক্লিষ্ট এক সাধিকার মতো। চোখদুটো ভারী সুন্দর। তাকিয়ে আছেন। হঠাৎ জল নামল। এক বিন্দু, দু’বিন্দু। নিঃশব্দে গড়িয়ে চলেছে গালের ওপর দিয়ে। এত খারাপ লাগছে! মুকুর স্বভাবই হল খোঁচা মারা।
দিদি আঁচলে চোখ মুছে বললেন, যার কেহ নাই, তুমি আছ তার। যে-মানুষটির কাছে আমি ছুটে এসেছি, তিনি হলেন গিরি গোবর্ধনধারী। বুঝতেই তো পারছ বোন, আমি নিরাশ্রয়। মনে করো, আমি তোমাদের একজন কাজের লোক। চব্বিশ ঘণ্টার ঝি। আমি খুব ভাল রাঁধতে পারি। বাসন মাজতে পারি ঝকঝকে করে। ঝাট দিতে পারি পরিষ্কার করে, কোনও কিছুর তলায় ধুলো না জমিয়ে। দাগ না ফেলে মেঝে মুছতে পারি। বড়ি দিতে পারি, গুল দিতে পারি। আচার তৈরি করতে পারি। সেলাই জানি, রিফু জানি। সামান্য হাঁটকাট জানি। সবার ওপরে রোগীর সেবায় আমাকে কেউ হারাতে পারবে না। টানা তিন বছর আমার মা, টানা দু’বছর আমার স্বামী বিছানায় পড়ে ছিলেন। আমি ঘৃণাকে জয় করেছি, জয় করেছি নিদ্রা। আমার আহার হল পাখির আহার। আমি যে কোনও জায়গায় ঘুমোতে পারি। যে-কোনও অপমান সহ্য করতে পারি। একটু হয়তো জল বেরোবে চোখে। বুক ফাটবে তবু মুখ ফুটবে না। আমি বঙ্গ রমণী। ঝাটা, জুতো আর লাথি জন্ম থেকেই খাচ্ছি। বেঁচে আছি শুধু মরতে পারিনি বলে। আমি বঙ্গ রমণী।
এইবার মুকুর পালা। হরিণের মতো চোখ। মা দুর্গার মতো মুখ। জল। পৃথিবীর যেমন তিন ভাগ জল, মেয়েদেরও সেইরকম তিন ভাগ জল, এক ভাগ খিলখিল হাসি। মুকুর জলের ফোঁটা অনেক বড়। দিদির হল মিহি দানা, মুকুর হল বড় দানা।
মুকু দিদির কঁধদুটো ধরে বললে, আমি ক্ষমা চাইছি। আমার রাগ হয়েছিল, আপনি আমাদের চেনেন না বলে। কেন চেনেন না? নিকট আত্মীয়দের আপনারা কেন কোনও খবর রাখেন না? জানেন না এটা স্বার্থপরতা, এ ভাল নয়। আত্মীয়দের আজ প্রয়োজন না হলেও কাল প্রয়োজন হতে পারে। মানুষের এই ভুলে থাকায় আমার রাগ হয়েছিল, যদিও এই ভয়ংকর দোষ এই পরিবারেরও আছে। এরাও কারও খোঁজখবর রাখে না।
না বোন, এদের দোষ নেই। দোষ আমাদের। বাবা মারা যাবার পর, মা শ্রাদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল না। আমাদের দু’বোনকে নিয়ে অহংকারে মটমট করতে করতে বাপের বাড়ি চলে এল। মেজকাকা ছোটকাকা সম্পর্ক রাখার বহু চেষ্টা করেছিলেন। শেষে হাল ছেড়ে দিলেন। তার সাক্ষী এই চিঠি। এইটাই ছিল ছোটকাকার শেষ চিঠি। এ-যেন সম্পর্কের শেষ খেয়া। পড়ে দেখতে পারো। এখনও পড়া যায়।
চিঠিটা সাবধানে হাতে নিলুম। কালো কালির লেখা, বাদামি হয়ে গেছে। আমার বাবার কতকাল আগের হাতের লেখা। বাবা লিখছেন,
পূজনীয়া বড়বউদি,
এদিক থেকে এইটাই হবে শেষ চিঠি। তোমাকে বারবার অনুরোধ করা হল, নিজের সংসারে ফিরে এসো। তুমি এলে না। প্রতিটি চিঠির বিলম্বিত উত্তরে তুমি আমার বড়দা, আমাদের পরিবারকে অকথ্য গালাগালই দিয়ে গেলে। একবারও বোঝার চেষ্টা করলে না, তোমারই অহংকারে বড়দা ছিটকে গেলেন পরিবারের বাইরে। পড়তি জমিদারের অহংকারের চেহারাটা কেমন জানো, ভিজে কাঠের আগুনের মতো। আগুন নেই শুধু ধোঁয়া। সেই ধোঁয়ায় তুমি আচ্ছন্ন। নিজেকেই নিজে দেখতে পাচ্ছ না। আমাদের পরিবার আপাতত রমণীশূন্য। তুমি যদি আমাদের পাশে এসে দাঁড়াতে, সংসারজীবনের পুরো স্বাদটা পেতে। তুমি কি খুব সুখে আছ! সুখের সন্ধানে পালিয়ে গিয়ে তুমি মহা। দুঃখেই আছ। নিজের অহংকারের জন্যে ভুল সংশোধন করতে পারছ না। আমার অবস্থা ঝড়ের সমুদ্রে ফুটো জাহাজের ক্যাপ্টেনের মতো। কখনও পাম্প চালিয়ে জল হেঁচছি, কখনও স্টিয়ারিং ধরে টালমাটাল সামলাচ্ছি। দু-দুটো বউ পরপর চলে গেল। সবচেয়ে আদরের ছোটবোন কাপড় শুকোতে দিতে গিয়ে ছাতের আলসে ভেঙে পড়ে মারা গেল। আমরা দু ভাই, একটা শিশু–এই তিনটি প্রদীপ টিং টিং করে জ্বলছে। এখনও সময় আছে। এসে তোমার কর্তৃত্বের আসনে বোসো। বড়দাকে এইভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ো না। ভাইঝি দুটোকে লেখাপড়া শেখাই। ভালঘরে বিয়ে দিই। সংসারে একটা পূর্ণতা আসুক। বিষয়সম্পত্তিতেও তোমার একটা অংশ আছে। তারও একটা ব্যবস্থা হওয়া দরকার। আর অধিক কী? প্রণাম নিয়ো। ইতি,
চিঠি পড়া শেষ করে মুকুকে বললুম, একটা খাম দাও। চিঠিটা যত্ন করে রাখা উচিত।
দিদি বললে, নিজের মা যে ছেলেমেয়ের কত সর্বনাশ করতে পারে আমার মা-ই তার উদাহরণ। বুড়ো নায়েবের পরামর্শে দুম করে আমার বিয়ে দিয়ে দিলে এক আধবুড়ো অকর্মণ্যের সঙ্গে। সে তো বিয়ে নয়, আমার কাশীবাস। সাতটা বছর বেঁচে ছিল শুধু কেশে কেশে। তখন আমার ভরা যৌবন। সেই জ্ঞানপাপী বুড়ো কেবল বলে, এ বউ তো আগুন, আমার তো তেমন ঘি নেই। শ্বাস নিত যখন, মনে হত বাঁখারির খাঁচা। সবকটা পাঁজর ঠেলে ঠেলে উঠত। তার আবার একটা বখা ভাগনে ছিল। নাম তার পল্টন। মাঝে মাঝে অন্ধকারে আমাকে জড়িয়ে ধরত। মুখে ধেনোর গন্ধ। কানের কাছে মুখ এনে বলত, মামা বিয়ে করেছিল আমার জন্যে। মামা তোমাকে ভাত কাপড় দেবে, আমি তোমাকে আনন্দ দোব। তুমি আমার ঘরের মুরগি। একদিন বেশ করে ঝাটাপেটা করলুম। কর্তা আমাকে চেলা কাঠ পেটা করলে। বললে, জানিস না, ভাগনে শব্দের অর্থ? ভাগ নে। পেটে যদি আসেই, তার জন্যে তো আমি আছি। আর যেন কোনও বেচাল না দেখি। বাংলার বধূ ত্যাগের জন্যে জন্মায়, ছাত পেটাই হবার জন্যে জন্মায়। সর্বংসহা শব্দটা কি অ্যায়সি এসেছে! সেই রাতেই ভাগনে বোতল বগলে মাইফেলে এল, গাইতে গাইতে, মামি নাচবে খেমটা নাচ। মামা ধরবে পোঁ। তার পরের লাইন আমি বলতে পারব না তোমাদের। আমি পেছনের দরজা দিয়ে মাঠময়দান ভেঙে চম্পট। প্রথমে এক গির্জায় গিয়ে ফাদারের কাছে আশ্রয় নিলুম। তিনি আমার খুব করেছিলেন। পড়িয়েছিলেন, নার্সিং শিখিয়েছিলেন। বলেছিলেন, হিন্দুদের হাত থেকে যদি বাঁচতে চাও খ্রিশ্চান হও। গ্রামে রটে গেল, অপরাজিতা কুলত্যাগ করেছে। কুলটা। বুড়ো বরে শানাল না, তাই বেশ্যা হয়ে ঘর ছেড়েছে। তাকে যে বোতল বাবাজি খাবলাতে এসেছিল, সেই কথাটা কেউ একবারও মুখে আনলে না। শয়তান পুরুষমানুষগুলো আর কত হাজার বছর ধরে যে আমাদের ছিঁড়ে খাবে! এই শয়তানদের ছেলেমেয়েকে আমাদের গর্ভে ধারণ করতে হয়। পৃথিবীতে ভগবান আসবেন কী করে? শয়তানদের ছেলেরা তো শয়তানই হবে!
