ভয়ে ভয়ে বললুম, মুকু, বাড়ি গিয়ে রাঁধতে রাঁধতে বিকেল হয়ে যাবে। পেট জ্বলছে। দশ পয়সা, কি দু’আনার ছোলাভাজা কিনব?
ছোলাভাজা ফুটো হয়, দাঁড়াও বাদামভাজা কিনি।
ফুটো হয় মানে?
মানে একশোটা ছোলার পঞ্চাশটাই পোকা ধরা। কোনওটাই নিরামিষ নয় আমিষ।
মুকুর বাদামভাজা কেনা শুরু হল। জীবনে এমন দেখিনি। প্রথমেই দর হল। তারপর দরাদরি। দরে যদিও বা পোষাল, মুকু বললে, বেছে নোব। বাদামঅলা বললে, বাদাম কি বাছা যায় দিদি?
খুব যায়। চালুনিতে ফেলে নাড়ো। বড়গুলো ওপরে চলে আসবে।
তাই হল। বাদামঅলা ওজন করতে যাচ্ছিল। মুকু বললে, দাঁড়াও, আগে খোসা ছাড়াই।
আগে ওজন করে খোসা ছাড়িয়ে দোব দিদি।
আজ্ঞে না। ওজন বেড়ে যাবে। আর তুমি ফুঁ দেবে কী! সে বাদাম আমি খাব কেন? বাদামঅলা হাঁ হয়ে গেল। এমন খদ্দের সে জীবনে দেখেনি।
২.১২ মা গো অত আদর
দূর থেকে দেখছি, বাড়ির সামনে রকের ওপর এক মহিলা বসে আছেন উদাস হয়ে। পাশে একটা ছোট টিনের সুটকেস। কোলে একটা পুঁটলি। কে? এ আবার কে? এইবার ঈশ্বর কোন খেলা খেলতে চাইছেন। একেবারে চিনতে পারছি না। জীবনে কখনও দেখেছি বলেও মনে হচ্ছে না। আমি আর মুকু একটু আগু-পিছু হনহন করে হাঁটছিলুম। মুকুর গতি শ্লথ হল। জিজ্ঞেস করলে, কে বলো তো?
ওই একই প্রশ্ন আমারও।
অন্য কোনও বাড়ির নয় তো! কিংবা বিশ্রাম নিচ্ছেন অনাথ কোনও মহিলা!
আমার তা মনে হয় না। আমাদের বাড়িতেই এসেছেন। মুকু, চলো পালিয়ে যাই। আমার লোকজন ভাল লাগছে না মনের এই অবস্থায়।
বাঃ! অসাধারণ! কোনও তুলনা হয় না তোমার! অসহায় এক মহিলাকে পথের ধারে বসিয়ে রেখে তুমি সরে পড়তে চাইছ? অনেক স্বার্থপর দেখেছি, তোমার মতো স্বার্থপর খুব কম দেখা যায়। আমি তোমার দলে নেই।
মুকু এইবার আমাকে পেরিয়ে চলে গেল। হাঁটার গতি হয়ে গেল দ্বিগুণ। বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই মধ্যবয়সি সেই মহিলা উঠে দাঁড়ালেন। কোথায় যেন এই পরিবারের মুখের সঙ্গে মিল আছে। পরে আছেন নরুন পাড় ধুতি। মুখটা কৃশ হলেও একটা আকর্ষণ আছে। চোখদুটো অসাধারণ জ্বলজ্বলে। মহিলা লম্বার দিকেই।
ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এইটাই কি হরিশঙ্করবাবুর বাড়ি?
হাতের মুঠোয় বহুকাল আগের একটা পোস্টকার্ড। দোক্তাপাতার মতো মুচমুচে হয়ে গেছে। অতি সাবধানে ধরে রেখেছিলেন সেটিকে।
বললুম, আজ্ঞে হ্যাঁ।
তোমরা কি তার ছেলেমেয়ে?
আমি ছেলে। এ আমার মাসির মেয়ে।
তোমার মায়ের তো কোনও বোন ছিল না!
আমার খুব রাগ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল বলি, অত কথার কী আছে? কোনওরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বললুম, আমার মেজো জ্যাঠাইমার বোন ছিলেন।
হ্যাঁ হ্যাঁ। মনে পড়েছে। তারা তো রেঙ্গুনে ছিলেন। আমি ছবি দেখেছি। তা আমি কে, নিশ্চয় চিনতে পারোনি?
আজ্ঞে না।
আমি তোমার বড় জ্যাঠামশাইয়ের বড় মেয়ে। তোমার যখন বছর তিনেক বয়স, তখন তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন।
আত্মহত্যা করবেন কেন? তিনি দোতলার বারান্দা থেকে পড়ে গিয়েছিলেন।
আমার কাছে সত্য ঘটনা শুনে রাখো, এক বদ মেয়েছেলে তাকে ওষুধ খাইয়ে পাগল করে দিয়েছিল। সেই অবস্থায় তিনি একদিন লাফ মেরেছিলেন।
মুকু বললে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে এইসব কথা না বলে ভেতরে চলুন না!
তালা খুলছি, মহিলা বললেন, ছোটকাকা কোথায়?
কিছুদিনের জন্যে বাইরে গেছেন।
আমরা একে একে ঢুকে পড়লুম। মহিলা ভয়ে ভয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে চলেছেন। বুকের কাছে দু’হাতে ধরে আছেন সেই পুঁটলি। মুকুর হাতে সুটকেস। মুকুর এই একটা গুণ, নিমেষে মানুষকে অধিকার করে ফেলতে পারে। সে এমন অধিকার যেন শিশুর আঁকড়ে ধরা পুতুল। কিছুতেই আর ছাড়িয়ে নেওয়া যাবে না নিজেকে।
মহিলা ওপরের বারান্দায় এসে বললেন, আমি তা হলে সম্পর্কে তোমাদের কে হলুম বলো তো? দিদি।
মুকু বললে, হ্যাঁ, তাই তো হলেন। দিদি।
তোমার নামটি কী ভাই! ভারী মিষ্টি মেয়ে।
মনে মনে হাসলুম, একটা ঘণ্টা যেতে দিন, তখন যেন আবার মন্তব্য বদল না হয়।
মুকু বললে, আমাকে আপনি মুকু বলেই ডাকবেন।
বাঃ, ছোট সুন্দর নাম। আমার ভায়ের নামটাও আমি ভুলে গেছি।
আমাকে বলতে হল না, মুকুই বললে, পিন্টু।
হ্যাঁ হ্যাঁ, পিন্টু।
মুকু সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করলে, দিদি, আপনার নাম?
আমার নাম পাঁচি।
মুকু থমকে গেল, এইরকম নাম হয় নাকি! আমাদের দিদিটি আবার মেঝেতে বসতে যাচ্ছিলেন, মুকু হাঁ হাঁ করে উঠল, মেঝেতে নয়, মেঝেতে নয়। চেয়ারে, চেয়ারে।
মাটির মানুষ মাটিতেই বসি বোন, আমাকে অত খাতির কোরো না। আমি অত খাতিরের নই। আমাকে একটা ঝিয়ের বেশি সম্মান দেবার প্রয়োজন নেই। যা প্রথম থেকে পেয়ে আসছি তাই যেন পাই শেষে।
পাকা পাকা কথা না বলে এই চেয়ারটায় বসুন।
মুকু এইবার বেরোচ্ছে। মুকু থেকে মুকু বেরোচ্ছে। খোল থেকে শামুক বেরোনোর মতো। হাত ধরে বসিয়ে দিল চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে বললে, ঠিক ঠিক নামটা বলুন তো!
দিদি একটু ঘাবড়েছেন। ইতস্তত করে বললেন, সে নাম শুনলে তোমরা অট্টহাসবে। তবু বলি, অপরাজিতা। সবেতেই যে পরাজিত, তার নাম অপরাজিতা!
আপনি সেই থেকে হাতে কী একটা পাঁপড়ভাজা ধরে আছেন?
ও হ্যাঁ। এটা একটা পোস্টকার্ড। সেই কোন কালে আমার কাকা লিখেছিলেন মাকে। বিজয়ার নমস্কার। আমার মাকে, মানে তোমাদের বড় জ্যাঠাইমাকে তো কেউ দেখতে পারতেন না। আর কেনই বা পারবে! অহংকারে দেমাকে মটমট করছেন। রূপের অহংকার, জমিদার বাপের টাকার অহংকার। আমার বাবাকে তো তোমরা দেখেনি। আমারও তেমন মনে নেই। মহাদেবের মতো দেখতে ছিলেন।
