মুকু আবার জিজ্ঞেস করলে, মেয়েটা কে?
আমি একটু রাগের গলাতেই বললুম, তোমার কী মনে হয়?
ওটি তোমার কত নম্বর?
তোমার এত সন্দেহ কেন মুকু?
মেয়েরা সহজে নিজের অধিকার ছাড়তে চায় না।
তুমি কিছুই না জেনে সন্দেহ করছ কেন? এটা খুবই খারাপ। নিজেকে ছোট করছ। মেয়েটির নাম সুরঞ্জনা। আজই পরিচয় মহারাজের আশ্রমে। সুরঞ্জনার বাবা পুলিশের বড়কর্তা। মহারাজকে নিয়ে আমরা সুরঞ্জনার বাড়িতেই যাচ্ছিলুম। ওঁদের খুব বিপদ। মাঝখান থেকে তুমি এই অসভ্যতা করলে।
আমি দেখিয়ে দিলুম, তুমি কার! আমার চোখের সামনে দিয়ে তোমাকে নিয়ে যাবে! তাও ওইভাবে? একেবারে গদগদ যেন মোহনভোগ। কোলের ওপর হাত নিয়ে কী করছিলে? ইকির মিকির চাম চিকির খেলা করছিলে? তুমি নিমেষে অত দূর এগোও কী করে?
হেসে ফেললুম, আমার মনে কোনও পাপ নেই বলে। আমার ভেতরের শিশুটাকে আমি কখনও বড় হতে দিই না। সেই কারণেই সবাই আমার সঙ্গে সহজ হতে পারে। যেমন তুমি আমাকে সবসময় বকো। যেন, আমি তোমার ছেলে।
তুমি তো এক এক সময় আমার ছেলেই। কাল সারাটা রাত দু’চোখের পাতা এক করতে দাওনি।
কাল সারারাত আমিও জেগেছিলুম মুকু। খালধারের মশা আমার বোতল বোতল রক্ত শুষেছে।
আমাদের সামনে একটা ছায়া পড়ল। ছায়ার পেছন পেছন এক মহিলা এসে দাঁড়ালেন। বুকের কাছে তোয়ালে জড়ানো কী একটা ধরে আছেন। মহিলার বয়স বেশি নয়। মুকুর বয়সিই হবেন। চেহারায় একটু অযত্নের ছাপ। চোখের কোণে কালি পড়েছে। পরপর অনেকদিন রাত জাগলে যেমন হয়। শাড়িটা কিন্তু যথেষ্ট দামি। মহিলা মুকুকে বললেন, ভাই, আমার এই বাচ্চাটাকে একটু ধরবেন? এই পাঁচ-দশ মিনিটের জন্যে। আমি একটা কাজ সেরে আসব এই কাছাকাছিই। আর চাপতে পারছি না।
মুকু স্পষ্ট জবাব দিল, সম্ভব নয়।
মহিলা একটু থতমত খেয়ে গেলেন। আমার কেমন মায়া হল। উদাসী চৈত্রের মতো চেহারা। আমি মুকুকে বললুম, ধরো না একটু। কী হয়েছে! বলো তো আমি ধরছি।
মুকু আমাকে এক ধমক লাগাল, চুপ করো। মহিলার দিকে মুখ তুলে বললে, আপনি অন্য কোথাও দেখুন, আমরা উঠে যাচ্ছি।
মুকু উঠে পড়ে বললে, চলো চলল। আমার ক্লাস আছে।
মহিলা অদ্ভুত একটা দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিছুটা এসে মুকু আমাকে বললে, তুমি সত্যিই একটা ছাগল। জগতের কিছুই বোঝো না?
কেন, এইরকম কেন বলছ?
ওই বাচ্চাটাকে সারাজীবন তুমি ধরতে পারবে?
তার মানে? মহিলার বড় অথবা ছোট যে-কোনও একটা বাইরে পেয়েছে।
তোমার মাথা। ছাগল একটা। এই বুদ্ধি নিয়ে সংসারে চলা যায়! এমনও তো হতে পারে, ও ওই বাচ্চাটাকে কায়দা করে গছাতে চাইছে। অবৈধ সন্তান, অথবা মানুষ করার সংগতি নেই।
তোমার কল্পনার দৌড় আছে মুকু। ভদ্রমহিলাকে দেখে তোমার কি সেইরকম মনে হল?
সেইরকমই মনে হল। তোমার চোখ থাকলে তুমিও বুঝতে পারতে। চোখের কোলে এক পোঁছ কালি। অসংযমীর জীবন। আর জানবে, মেয়েরা যখন সাধারণ অবস্থায় সিল্কের শাড়ি পরে, তখন শেষ অবস্থা। সবই তার গেছে।
তাই হবে। মেয়েরাই মেয়েদের বেশি বুঝবে। মুকু, আমার এখনও কিছু খাওয়া হয়নি।
খাওয়া আমারও হয়নি। চলো, কোথাও খেয়ে নিই।
আমার পকেটে আছে একটি মাত্র টাকা।
একটা কেন? কাল তো অনেক টাকা ছিল। কোথায় ওড়ালে?
ওড়াইনি, পকেট মেরে দিয়েছে।
বাঃ, খুব ভাল। সংসারে শনি লেগেছে। আমার কাছে কিছু টাকা আছে। দু’জনের খাওয়া হয়ে যাবে, কিন্তু খাব না। বাইরে খাওয়া শরীরের পক্ষে ভাল হবে না, পয়সারও শ্রাদ্ধ। চলো বাড়ি যাই, গিয়ে রান্না করি। এখন থেকে আমাদের বুঝেসুঝে চলতে হবে। কত গেল?
তা শ’তিনেক হবে।
তুমি কোন ভাবে ছিলে? কার ধ্যান করছিলে?
মা কালীর। ঠনঠনের কালীমন্দিরে মায়ের আরতি হচ্ছিল। বিভোর হয়ে দেখছিলুম। আরতি শেষ হল। চোখ বুজিয়ে মাকে হৃদকমলে দেখার চেষ্টা করছিলুম। চোখ খুললুম, ট্রামে উঠলুম, ভাড়া দিতে গেলুম, পকেট ফাঁকা। ট্রামের কনডাক্টর একটা টাকা দিলেন।
যে-মা তোমার পকেট সামলাতে পারেন না, সেই মাকে ডেকে কী লাভ! বুঝতেই পারছ, একালে দেব-দেবীর কোনও ক্ষমতা নেই। অকারণ সময় নষ্ট।
মুকুর সঙ্গে আমার আর তর্কযুদ্ধে যাবার ইচ্ছা হল না। তা হলে আমি বলতে পারতুম ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কথায়, কী জানো, যার যা কর্মের ভোগ আছে তা তার করতে হয়। সংস্কার, প্রারব্ধ এসব মানতে হয়। বলতে ইচ্ছা করল না। এখনই হয়তো বলবে, রাখো তোমার শ্রীরামকৃষ্ণ। মগের দেশের মেয়ে। ঠাকুরের কথা খুব বলতে ইচ্ছে করছিল, ‘সুখ-দুঃখ দেহধারণের ধর্ম। কবিকঙ্কন চণ্ডীতে আছে যে কালুবীর জেলে গিছিল, তার বুকে পাষাণ দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু কালুবীর ভগবতীর বরপুত্র। দেহধারণ করলেই সুখ-দুঃখ ভোগ আছে। শ্ৰীমন্ত বড় ভক্ত। আর তার মা খুল্লনাকে ভগবতী কত ভালবাসতেন। সেই শ্ৰীমন্তের কত বিপদ। মশানে কাটতে নিয়ে গিছিল। একজন কাঠুরে পরমভক্ত, ভগবতীর দর্শন পেলে। তিনি কত ভালবাসলেন, কত কৃপা করলেন। কিন্তু তার কাঠুরের কাজ আর ঘুচল না। সেই কাঠ কেটে আবার খেতে হবে। কারাগারে চতুর্ভুজ শঙ্খচক্রগদাপদ্মধারী ভগবান দেবকীর দর্শন হল। কিন্তু কারাগার ঘুচল না।’ এইসব আমি বলে একটা তর্ক জুড়ে দিতে পারতুম। মনে হল, কী হবে? যার যার বিশ্বাস, তার তার বিশ্বাস। এখন তোমার বয়স কম, তায় আবার সুন্দরী। রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে, এমন কেউ নেই যে না ফিরে তাকাবে। এইমাত্র একজন সাইকেল চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। নিজের দেমাকেই মটমট করছে। তোমার সমর্পণ আসে কী করে? তবে এ কথা ঠিক, সাংঘাতিক তেজি মেয়ে। অন্য অনেক গুণ। আছে।
