এইবার আমার ভয়ংকর রাগ এল। অকারণে মেয়েটা আমাকে তড়পাচ্ছে। অপরাধ করল নিজে, দোষ দিচ্ছে আমাকে। অফেন্স ইজ দি বেস্ট ডিফেন্স। সেই টেকনিক। আমি একটু ঝুঁঝের গলায় বললুম, চিরকালের জন্যে তুমি আমাকে মহারাজের চোখে ছোট করে দিলে। আমার আশ্রমে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেল।
তোমার মতো চরিত্র আশ্রম-টাশ্রমে যত কম যায় ধর্মের পক্ষে ততই ভাল।
কেন বলো তো! আমার ওপর তোমার অত রাগ কেন?
রাত ন’টার সময় আমি তোমাদের বাড়িতে গিয়েছিলুম।
সেকী? কী করে?
যেভাবে সবাই যায়। বাসে করে।
তোমাকে তো পুলিশে ধরেছিল!
কোন অপরাধে? আমি চোর না ডাকাত?
তা হলে তোমাদের হস্টেলের সামনে পুলিশের গাড়ি ছিল কেন?
হস্টেলে একটা বড় রকমের চুরি হয়েছে। পুলিশ এসেছিল অনুসন্ধানে।
তা তুমি আমাকে দু’ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখলে কেন?
জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হবে, সুপারিনটেন্ডেন্টকে বলব, অনুমতি নোব, তারপর তো আসব!
সেই কথাটা আমাকে জানাতে কী হয়েছিল?
নিশ্চয় কোনও কারণ ছিল।
তা হলে আমার অপরাধটা কোথায়?
তোমার অপরাধ? তুমি একটা দায়িত্বজ্ঞানহীন স্বার্থপর। তোমার জন্যে আমাকে ট্যাক্সি করে পড়ি কি মরি ছুটতে হয়েছে, কারণ তা না হলে তুমি বাড়ি ঢুকতে পারতে না।
কেন?
বাড়ির চাবিটা কার কাছে?
সত্যিই তো চাবিটা কার কাছে? সে খেয়াল তো আমার হয়নি। মুকু বলতে লাগল, হস্টেলে প্রথমে আমাকে একটা মুচলেকা লিখে দিতে হল। আমি আমার দায়িত্বে হস্টেল ছেড়ে আমার মেসোমশাইয়ের বাড়িতে যাচ্ছি। রাত ন’টার সময় ওই ভয়ংকর ভৌতিক বাড়ির দরজা খুলে অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে দোতলায় উঠলাম। হঠাৎ সমস্ত বাড়ির আলো ফিউজ হয়ে গেল। না। আছে একটা দেশলাই, না আছে একটা হ্যারিকেন। কোনও কিছুই হাতের কাছে নেই। তোমার বাবাও গেছেন, ঘরের লক্ষ্মীও চলে গেছেন। না আছে হাতের কাছে একটা টর্চ। এদিকে যাই তো চেয়ারের সঙ্গে ধাক্কা, ওদিকে যাই তো টেবিলের সঙ্গে ধাক্কা। উত্তরের বারান্দায় ধপাস করে কী একটা পড়ল। ভাগ্যিস ম্যাও করে ডাকল।
তুমি রান্নাঘরে গেলে না কেন? ছাতের সিঁড়িতেই তো হ্যারিকেন, তেলের বোতল সবই ছিল।
তোমাকে আর উপদেশ দিতে হবে না। তোমাদের বাড়ির ওই দিকটায় যেতে আলো থাকলেও বুক কাপে তো অন্ধকারে! তাও আমি গেলুম। উঁচু উঁচু চৌকাঠ। এখানে বালতি, ওখানে মগ। ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। সিমসিম করছে গাছপালা। যাও বা একটা দেশলাই পেলুম, কাঠি নেই। ভোলা উনুনের ঝিকে লেগে শাড়ির তলাটা ফেঁসে গেল। বেড়ালটা ওত পেতে বসে আছে। অন্ধকারে চোখদুটো ধকধক করছে। আবার হাতড়াতে হাতড়াতে ফিরে এলুম। একটা ছুঁচো উঠে এসেছিল নীচে থেকে। চিক চাক করে পায়ের ওপর দিয়ে ছুটে পালাল। আমার অবস্থাটা তুমি একবার ভাবো! ঠোক্কর খেতে খেতে নেমে এলুম নীচে। তালা লাগালুম। দুটো ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে বেরোতে দেখে এক কলি গান বেরোল। আমি গ্রাহ্য করলুম না। সোজা বিটুদার দোকানে। দোকান ছেড়ে সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমার সঙ্গে চলে এলেন। দেশলাই আর মোমবাতি নিয়ে। সেই অন্ধকারে তিনি ফিউজ পালটে দিলেন। আলো আবার জ্বলে উঠল। বিষ্টুদা বললেন, একা তুমি থাকবে কেন, চলো আমাদের বাড়িতে। আমি বললুম, দেখি, এইবার হয়তো ফিরবে। দশটা তো বাজল। বিষ্টুদা বললেন, তোমার ভয় করবে না? বললুম, করলেও উপায় নেই। বিষ্টুদা চলে গেলেন। ওই ফাঁকা বাড়িতে আমি একা বসে আছি। দশটা বাজল, এগারোটা বাজল। তোমার পাত্তা নেই। বিষ্টুদা আবার এলেন টিপকে নিয়ে। তোমার জন্যে আমাদের সে কী দুর্ভাবনা! কী হল, আসছে না কেন? কোনও অ্যাক্সিডেন্ট হল! সারাটা রাত আমরা তিনজনে জেগে বসে রইলুম। তোমার একবারও মনে হল, বাড়ি ফিরে দেখি সেখানে কী হচ্ছে! সারাটা রাত তুমি আঘাটায় ফুর্তি করলে। দশটা বাজল, সকাল দশটা। তখনও তোমার পাত্তা নেই। শেষে ধ্যাততেরিকা বলে বেরিয়ে পড়লুম। চাবিটা রেখে এলুম বিষ্টুদার কাছে। এইবার বলো, তোমাকে কী করা উচিত! ফুল বেলপাতা দিয়ে পুজো! সারারাত তুমি ছিলে কোথায়! ওই মেয়েটা কে, যাকে জাপটে ধরে বসে ছিলে?
তুমি এখানে কী করছিলে?
ইউনিভার্সিটির সামনে লোকে কী করে?
তুমি আমাকে ওইভাবে টেনে হিঁচড়ে নামালে কেন? এতে কার সম্মান বাড়ল? তোমার না আমার? মহারাজ কী ভাবলেন? আর আমি কোনওদিন ওঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারব?
আমি তো সেইটাই চাই, যাতে তুমি দাঁড়াতে না পারো, যাতে তুমি ধর্মের ভণ্ডামি ছেড়ে কর্মে আসতে পারো।
তোমার ধর্মের ওপর এত রাগ কেন মুকু?
ধর্মের ওপর রাগ নয়, রাগ তোমার ধর্মের ওপর। তুমি হলে কলির কেষ্ট। যেখানে যাচ্ছ সেইখানেই নববৃন্দাবন লীলা। তোমার গুণের তো ঘাট নেই!
এইবার আমার কাহিনিটা একটু শুনবে?
কী হবে শুনে? নব্বই ভাগ মিথ্যে, দশ ভাগ হয়তো সত্য।
এরপর আর কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে না। যে যার নিজেরটাকেই বড় করে দেখে। এমন একটা মেয়ের সঙ্গে জীবন গাঁথার চেয়ে, কোনওক্রমে সরে পড়াই ভাল। মনে হচ্ছে, মাথার। অসুখ আছে। সংসারে থাকলে, যেখানেই থাকি কাঁক করে ধরবে। গোখরার কামড়। সন্ন্যাসীই হতে হবে। তবে স্বামী নির্মলানন্দজির কাছে গেলে, তিনি আমাকে দূর করে দেবেন। তিনি মুকুকে চেনেন না। মুকুর সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক তাও জানেন না। বোঝাতে গেলেও শুনতে চাইবেন না।
