সুসময় যে কত সহজে কত দুঃসময় হয়ে যেতে পারে আমার বোধবুদ্ধিতে ছিল না। সেই গানটার মতো, যাচ্ছ তুমি হেসে হেসে কাঁদতে হবে অবশেষে। ঠিক মির্জাপুরের কাছে এসে গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। পুলিশ হাত তুলেছে। বাঁ দিকে তাকিয়েই শরীর হিম হয়ে গেল। ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছে মুকু। পাছে চোখাচুখি হয়ে যায়। আমি চোখ বুজিয়ে ফেলেছি। খট করে বাঁ দিকের দরজাটা খুলে গেল। একটা হাত আমার বুকের কাছের জামাটা খামচে ধরেছে। আমার চোখ খুলে গেল। মুকুর রুদ্রাণী মূর্তি, নেমে এসো শয়তান। নেমে এসো। মুকু জামা ধরে হিড়হিড় করে টানছে। সুরঞ্জনা ভয়ে সিঁটিয়ে আছে। মুকুর শরীরের বেশ কিছুটা সুরঞ্জনার শরীর ছুঁয়ে গাড়ির ভেতর ঢুকে এসেছে। মুকুর রং যেন ফসফরাসের মতো জ্বলছে। মুকু আর একবার ঝাঁকানি মেরে বললে, নেমে এসো শয়তান।
পেছনের সব গাড়ি আটকে গেছে। ভোঁ ভোঁ, পা পোঁ হর্ন। মহারাজ যথেষ্ট বিরক্তির গলায় বললেন, নাটক না করে এখনই নেমে যাও। রাস্তার মাঝখানে এ কী অসভ্যতা! আমার একটা মানসম্মান নেই? ছিঃ ছিঃ, তুমি তো মহা বদ ছেলে!
সুরঞ্জনার হাঁটু ঘেঁচে কোনওরকমে রাস্তায় গিয়ে পড়লুম। ভালভাবে দাঁড়াবারও অবকাশ মিলল, মুকুর প্রবল আকর্ষণে প্রায় টলে পড়ে যাই আর কী! এরই মাঝে সশব্দে দরজা বন্ধ হল, গাড়ি চলে গেল। এইবার মুকু আর আমি মুখোমুখি। মুকু দু’হাতে আমার বুকে চাপড় মারতে মারতে ক্রমান্বয়ে বলে চলেছে, শয়তান শয়তান, বলো কোথায় ছিলে, কোথায় ছিলে সারারাত!
মুকু জানে না কলকাতার মানুষ কী সাংঘাতিক কৌতূহলী! চারপাশে লোক জড়ো হয়ে গেছে। সবাই ভাবছে, কী না কী হয়ে গেছে! আমিও বুঝে উঠতে পারছি না, ব্যাপারটা কী? মুকু হস্টেলে ছিল। মুকু ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছিল, এইটুকু বুঝে নিতে অসুবিধে হল না, কিন্তু তারপর? ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন বলে উঠল, এই তো চাই। মেয়েরা না জাগলে বাঁদররা শায়েস্তা হবেনা। জুতো, জুতো, জুতো লাগাও, জুতো।
মুকু হঠাৎ ভিড়ের দিকে তাকিয়ে বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে কাঠ কাটার গলায় বললে, মজা দেখছেন, খুব মজা! যান এখান থেকে!
ভিড় একটু থমকে গেল। মুকু বীরাঙ্গনার মতো আমার হাত ধরে টানতে টানতে কলেজ স্কোয়ারে ঢুকে পড়ল। এত জোরে টানছে, আমি সামলাতে পারছি না। মনে হচ্ছে, টাল খেয়ে পড়ে যাব। পায়ে পা বেধে যাচ্ছে। ভিড়ের কে একজন বলে উঠল, এ অন্য কেস, অন্য কেস। কানে আর একটা মন্তব্য এল, বিয়ে করব বলে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল, আজ একেবারে ক্যাচ, কট, কট। বাছা ঘুঘু দেখেছ, ফাঁদ দেখোনি!
লজ্জায় অপমানে আমার চোখে জল এসে গেছে। সবচেয়ে প্রিয়জন, সকলের চোখের সামনে এইভাবে অপমান করতে পারে? এ তো প্রকাশ্য রাজপথে জামাকাপড় খুলে নেওয়ার মতো। মহারাজের শেষ কথা ছুঁচের মতো মর্মে বিধেছে, নামিয়ে দাও, নামিয়ে দাও। যেন আমি তার পাশে বসে কোনও অপকর্ম করে ফেলেছি।
মুকু টানতে টানতে আমাকে একটা নিরালায় নিয়ে এল। গাছের আড়ালে। সরোবরের জল আলোয় টলটল করছে। মুকু আমার বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে উঠল, তুমি আমাকে ফেলে কাল সারারাত কোথায় ছিলে? কোথায় ছিলে তুমি এতক্ষণ! তুমি কোথায় যাচ্ছিলে! আমার জামাটা খামচে ধরে আছে। সেটা ছাড়েনি।
যেখানে দাঁড়িয়েছিলুম সেইখানেই বসে পড়লুম ময়দার তালের মতো। প্রথমে মুকুর ওপরে রেগে আগুন হয়েছিলুম, এ কেমন ধারা অসভ্যতা! মহারাজের সামনে, সুরঞ্জনার সামনে, রাস্তার কিছু উটকো লোকের সামনে একেবারে বেইজ্জত! তার মুখ, চোখে জল, ভয়ংকর একটা আবেগ দেখে রাগের ভাবটা চলে গেল। এইবার অবাক হবার পালা। মুকু জানল কী করে, সারারাত আমি বাড়িতে নেই?
মুকু আমার সামনে বসেছে বাবু হয়ে। কোলের ওপর অলস ভঙ্গিতে পড়ে আছে ফরসা ফরসা নিটোল দুটো হাত। শিশু কান্না থেমে যাবার পর যেভাবে ফেঁপায় সেইভাবে থেকে থেকে ফুলে উঠছে। মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকাচ্ছে। দু’চোখে আকাশ। কোনও কথা বলতে পারছে না। দিঘির জলে গোটাকতক ছেলে খুব কঁপাই জুড়ছে।
অবশেষে আমাকেই জিজ্ঞেস করতে হল, তোমার হঠাৎ কী হল! সকলের সামনে এইরকম একটা বিশ্রী কাণ্ড করলে! লোকে তো আমাকে কচুরি ধোলাই দিত আর একটু হলে!
মুকু মুখ ফিরিয়ে রইল। এতক্ষণ যে এত সরব ছিল, প্রায় বাঘিনির মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল শিকারের ওপর, সে এখন শিথিল, নির্বাক। আমি বললুম, বলবে তো, কী হয়েছে? তুমি সেই হস্টেলে ঢুকলে আর বেরোলে না। আমি প্রায় দু’ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে চলে এলুম।
মুকু এইবার সরাসরি আমার দিকে তাকাল। চোখদুটো জ্বলছে। আবার রাগ আসছে। মুকু দাঁতে সঁত চেপে বললে, তুমি রাতে বাড়ি ফিরেছিলে?
না।
কোথায় ছিলে তুমি? বলো মিথ্যে বলল। অম্লান বদনে বলো, টিপের বাড়িতে ছিলুম।
তা বলব কেন? কাল আমার অনেক খোয়ার গেছে। আমি সারারাত পথেই ছিলুম।
আবার মিথ্যে কথা! তাই তোমার এই তেল চুকচুকে চেহারা? বাহারি টেরি? একটা মেয়ের হাত ধরে গদগদ হয়ে, নতুন একটা গাড়ি চেপে কোথায় যাচ্ছিলে লীলা করতে?
আমার ওপাশে মহারাজ ছিলেন, সেটা তোমার চোখে পড়েছিল?
তোমাকে আমার চিনতে বাকি নেই। তুমি ওরই মধ্যে তোমার কাজ সেরে নিতে পারো। তোমার অসীম ক্ষমতা। সেই ক্ষমতার পরিচয় আমি অনেকবার পেয়েছি!
