মনে মনে ভাবলুম, সে আর বলতে!
সুরঞ্জনা বলতে লাগল, আমরা ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্ত। দাদাকে কত চেষ্টা করেছি এই পথে আনতে হেসে উড়িয়ে দিত। বলত ওসব বুড়ো বয়সে হবে, যখন শরীর ঝুলে যাবে, দাঁত পড়ে যাবে। মহারাজের কাছে একবার এনে ফেলতে পারলে, এই অবস্থা হত না।
মনে মনে ভাবলুম, কিছুই কি হত! আমার কি কিছু হয়েছে! ভেতরে ঠিকই সে নড়ছে। সে আমার প্রবৃত্তি। যে-প্রবৃত্তিতে সুরঞ্জনার পাশে দাঁড়িয়ে থাকাটা স্বর্গসুখের মতো মনে হচ্ছে।
শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তদের একদিন কথায় কথায় বলছিলেন, মনে করলেই ত্যাগ করা যায় না। প্রারব্ধ, সংস্কার- এসব আবার আছে। একজন রাজাকে একজন যোগী বললে, তুমি আমার কাছে বসে থেকে ভগবানের চিন্তা করো। রাজা বললে, সে বড় হবে না; আমি থাকতে পারি, কিন্তু আমার এখনও ভোগ আছে। এ বনে যদি থাকি, হয়তো বনেতে একটা রাজ্য হয়ে যাবে। আমার এখনও ভোগ আছে।
সেই ভোগ আমারও মনে হয় আছে। আমার এই ভোগের প্রবৃত্তি কোথা থেকে এল? উড়ে তো আর আসেনি। এসেছে জন্মসূত্রে। কার রক্তের ধারায় প্রচ্ছন্ন ছিল এই প্রবৃত্তি? পিতার? মাতামহের? একটু সত্য কথা, একটু মনের কথা সাহস করে কেউ বলবেন কি? একটা স্বীকারোক্তি! পিতা কেন। বারেবারে সাবধান করতেন, দেখো, তোমার মাতুল বংশের দিকে যেয়ো না। অনেক ভাইস।
মহারাজ বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। অপূর্ব দেখাচ্ছে। নিপাট টকটকে গেরুয়া। কাঁধে ভাজ করা চাদর। মাথায় গেরুয়া টুপি, চোখে সোনার চশমা। বেরিয়ে এসেই বললেন, চলো চলো। সময় খুব কম।
সাদা রঙের গাড়ি। মহারাজই ঠিক করে দিলেন, কীভাবে বসা হবে। পেছনের আসনে একধারে মহারাজ, আর একধারে সুরঞ্জনা। মাঝখানে আমি। কামিনীর স্পর্শ থেকে সন্ন্যাসীকে দূরে রাখার দায়িত্ব আমার। আমার বাঁ দিকে, আমারই পা ছুঁয়ে সিল্ক-ঢাকা মসৃণ জঙ্ঘা। তার ওপর লম্বা লম্বা আঙুল। অনামিকায় জ্বলজ্বল করছে আংটির বেদানার দানার মতো পাথর। মসৃণ কাঁধে ছুঁয়ে আছে। আমার কাধ।
২.১১ As certain as stars at night.
আমার অবস্থা কিঞ্চিৎ শোচনীয়। একপাশে সুরঞ্জনা, আর একপাশে মহারাজ। এক পাশে সন্ন্যাস, অপর পাশে সংসার। মহারাজের দিকে চাপতে পারছি না। সংকোচ হচ্ছে। ভাববেন, আমাকে একেবারে ঠেসে ধরছে। সুরঞ্জনার স্পর্শ বাঁচাবার চেষ্টাও করতে হচ্ছে। ভাববে, সুযোগ নিচ্ছে। সিল্ক-জড়ানো ওই শরীরের স্পর্শ যে কী সাংঘাতিক, তা আমার বয়সি একটি ছেলেই কেবল জানে! বাতাস ছুটে আসছে উলটো দিক থেকে। কাঁধের আঁচল মাঝে মাঝে অবাধ্য হয়ে আমার ঘাড়ে সুড়সুড়ি দিয়ে যাচ্ছে। দু-এক গুছি চুল খেলে যাচ্ছে বা গাল ছুঁয়ে। কোনও ভাবেই বাঁ দিকে তাকাতে পারছি না। সিল্ক বড় অবাধ্য। জুতসই হয়ে বুকের ওপর থাকতে জানে না। বাঁ দিকে ঘাড় ঘোরালেই সুরঞ্জনা সচেতন হয়ে একটু চাপাচুপি দেবার জন্যে ব্যস্ত হচ্ছে। আমার বাঁ পাশে বড় অশান্তি। মহারাজ ভাবস্থ। তার ধারণাই নেই, এক আঙুল তফাতে জীবনের কোন চোরাস্রোত বইছে। যতটা সম্ভব ছোট হয়ে বসে থাকার চেষ্টা করছি আমি। একেই বলে ছোট হওয়ার সাধনা। দেহের অবস্থা আমার মনেরই মতো। ত্যাগ আর ভোগের মাঝখানে কুঁকড়ে বসে আছি। নিজের মনেই হাসছে জ্ঞানপাপী। স্বামী বিবেকানন্দের কথা মনে পড়ছে। অনেকে মনে করে, মেয়েমানুষ না দেখলেই হল। মেয়েমানুষ দেখে ঘাড় নিচু করলে কী হবে? যতক্ষণ আমার কাম, ততক্ষণই স্ত্রীলোক, তা না হলে স্ত্রী-পুরুষ ভেদ-বোধ থাকে না। শিশুদের তো নারী-পুরুষ ভেদ থাকে না। বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের কোথা থেকে কী একটা বেরিয়ে আসে, আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় বাঘের খেলা।
মহারাজ নির্দেশ দিলেন, গাড়ি যেন কলেজ স্ট্রিট ধরে যায়। কলেজ স্ট্রিটের আলাদা একটা আভিজাত্য আছে। গাড়ি সেই মতোই চলেছে। সুরঞ্জনা মৃদু গলায় কথা শুরু করল, অঙ্ক আপনার কেমন আসে?
খুব একটা খারাপ নয়।
বাবা তো অর্থনীতির। দাদা আমাকে অঙ্কটা দেখিয়ে দিত। ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাসটা আমার একেবারে মাথায় ঢোকে না। বেশি না, সপ্তাহে একদিন আমাকে দেখিয়ে দেবেন?
কেন দেব না? আজ আমার বাবা থাকলে আপনার কোনও ভাবনাই থাকত না। তার মতো অঙ্কে পাণ্ডিত্য, শুধু অঙ্ক কেন সব শাস্ত্রে, আমি খুব কম দেখেছি। আমাকে একেবারে নিঃস্ব করে দিয়ে চলে গেলেন।
এইবার আমার কান্না আসছে। বুকের ভেতরটা মথিত করছে অপরিসীম এক নিঃসঙ্গতা। শেষ প্রিয়জনকে হারাবার বেদনা। হঠাৎ সুরঞ্জনা আমার হাতে হাত রাখল। আমার শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। একেই বলে নারী!
সুরঞ্জনা বললে, আপনার আর আমার একই দুঃখ। কী আর করা যাবে বলুন! মৃত্যু যেমন সকলকে সমান করে, ডেথ দি ইকোয়ালাইজার, দুঃখও সেইরকম। সুরঞ্জনার মুখে এইরকম একটা কথা শুনে ভারী ভাল লাগল। মনের দিক থেকে এরই মধ্যে কতটা কাছে সরে এসেছে আমার। এই মুহূর্তে ঈশ্বরে বিশ্বাস ফিরে আসছে। তিনিই সব করান। আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইনি/বাহির পানে চোখ মেলেছি, আমার হৃদয় পানে চাইনি /আমার সকল ভালবাসায় সকল আঘাত সকল আশায়/তুমি ছিলে আমার কাছে/তোমার কাছে যাইনি ॥
সুরঞ্জনা ডান হাত দিয়ে আমার বাঁ হাতটা ধরে রেখেছিল। অনেক ইতস্তত করে মহারাজের দিকে একবার আড় চোখে তাকিয়ে আমার ডান হাতটা তার হাতের ওপর রাখলুম। মনে হল, জীবনটা যদি এই রকমেরই একটা নিশ্চিন্ত চলা হত! প্রথম অনুভূতি নিয়ে। পাশ দিয়ে বিপরীতে ছুটবে জগৎ জীবন। আমরা নিশ্চেষ্ট। ঘাটে বসে আছি আনমনা, যেতেছে বহিয়া সুসময়।
