মহারাজই বাঁচালেন। বললেন, বোসো মা সুরঞ্জনা!
আমি আমার বাঁ পাশের চেয়ারে নিজেকে তুলে বসালুম। সুরঞ্জনা আমার চেয়ারে বসল। গা থেকে মিষ্টি একটা গন্ধ বেরোচ্ছে। শাড়িটা সিল্কের। হাতে একটা সোনার বালা ঝিলিক মারছে। বিশাল বড়লোকের মেয়ে। কোনও সন্দেহ নেই। চেহারায় একশো ভাগ আর্য।
মহারাজ আমাকে বললেন, বুঝলে পলাশ, অনেকটা তোমার মতোই কেস। তোমার বাবা, এর দাদা। বোম্বাইতে ট্রেনে চেপেছিল এইটুকু নিশ্চিত খবর, তারপর সবই অনিশ্চিত।
সুরঞ্জনা যেন ব্যথার ব্যথী পেল। আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বললে, আপনার বাবা!
মুখটাকে করুণ থেকে করুণতম করে বললুম, কয়েকদিন হল আমার বাবা হারিয়ে গেছেন।
মহারাজ বললেন, হারিয়ে গেছেন বোলো না, বলো নিরুদ্দেশ হয়েছেন।
সুরঞ্জনা বললে, আপনি কী করছেন?
মহারাজ উত্তর দিলেন, কিছুই তেমন করা যাচ্ছে না। তিনি একজন নামী মানুষ, পণ্ডিত মানুষ, বিচক্ষণ মানুষ, স্বেচ্ছায় গৃহত্যাগ করেছেন, অনেকটা হঠাৎ বানপ্রস্থের মতে, এ-ক্ষেত্রে থানা-পুলিশ, কাগজে বিজ্ঞাপন করা মানেই তাকে হেয় করা। ঘটনাটা মেনে নিতে হবে। সইয়ে নিতে হবে। এইরকম হয়। হঠাৎ বৈরাগ্য এসে যায়। অনেকে পরবর্তীকালে এইভাবেই মহাপুরুষ হয়েছেন। আমাদের হিমালয় এক বিস্ময়কর মায়াবী স্থান। মানুষকে ঘর থেকে ঘুম ভাঙিয়ে তুলে নিয়ে যায়। এইজন্যেই ভারত এক মহাপীঠস্থান, পুণ্যভূমি, পরমযোগের স্থান।
সুরঞ্জনার বা কনুইটা আমার ডান কনুইয়ে ঠেকে আছে। পুলক, শিহরন সবই চলেছে যুগপৎ। আমি একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছি। মনে হচ্ছে খুব কারেন্ট আছে। অনেকের শরীরে এইরকম থাকে। শুদ্ধ সত্তা হলে এমন হয়। আমি শুনেছি, আজ অভিজ্ঞতা হল।
সুরঞ্জনা আবার আমার দিকে তাকাল। মনে হয় আমার করুণ মুখ দেখে তার করুণা হয়েছে। তার মুখও খুব করুণ গম্ভীর। এত কাছ থেকে এমন একটা ধারালো মুখ দেখলে শরীর কেমন করে। মনে নেমে আসে আরব্য রজনীর রাত। বাগদাদের বাজারে ঘুরছি। দেয়ালে দেয়ালে মশাল জ্বলছে। ছোট ছোট কুপিতে আলো। থরেথরে সাজানো বেদানা, আঙুর, খেজুর, কিসমিস, আখরোট, খরমুজ, খুবানি। হঠাৎ সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে বোরখা-পরা সুন্দরী। আমি তার পায়ের গোড়ালি দেখতে পাচ্ছি। বোরখার ঝালর তুলে এক নজর যেই তাকাল, মনে হল ছুরি চালিয়ে দিলে বুকে আমার। মনে হয় শীতের রাতে একই আলোয়ানের তলায় আমরা দুজনে। আমি আর সে। বসে আছি যমুনার তীরে। শীত-শীত পূর্ণিমা রাত। দূর থেকে ভেসে আসছে ঠুংরির চরণ। এইসব মনে হয় আমার। এ একটা অসুখ। দুরারোগ্য ব্যাধি। মাঝে মাঝে মনে হয় কোনও এক জন্মে আমি নবাব ছিলুম। এই অসুখের মনে হয় একটাই ওষুধ, বেধড়ক ধোলাই।
সুরঞ্জনা বললে, আপনি আমার বাবাকে একবার বলে দেখতে পারেন। উনি তো ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি কমিশনার। ভেতরে ভেতরে অনুসন্ধান চালিয়ে একটা কিছু করতে পারেন, যা আপনার বাবার পক্ষে অসম্মানজনক হবে না।
আমি একটু কুঁচকে গেলুম। পুলিশ অফিসারের মেয়ে! কোনও চালাকি চলবে না। আমি হ্যাঁ না কিছুই না বলে একটু সরে বসলুম। গায়ে গা না লেগে যায়! সুরঞ্জনা মহারাজকে বললে, অনুগ্রহ করে আমাদের বাড়িতে আজ একবার যাবেন? বাবা বিশেষ করে অনুরোধ করেছেন। আপনি না গেলে আমার মাকে সামলানো যাচ্ছে না। আমি গাড়ি এনেছি।
মহারাজ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, তোমার বাবা আমার সহপাঠী ছিলেন। বন্ধুর অনুরোধ তো রাখতেই হবে। পলাশ, তুমিও চলো আমার সঙ্গে। কোনও কাজ নেই তো?
আজ্ঞে না।
তোমার অফিস?
সেখানেও গোলমাল মহারাজ।
তোমার গ্রহ খুব বেঁকেছে পলাশ।
আজ্ঞে হ্যাঁ। বিদিগিচ্ছিরি সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি।
ঠাকুরকে ডাকো। জীবনের কাছ থেকে বাঁচার শিক্ষা নাও। আচ্ছা, তোমরা দু’জনে ছাদে যাও। আমি তৈরি হয়ে নিই।
ছাদের আলসের ধারে গিয়ে দাঁড়ালুম দু’জনে। চারপাশে গিজিগিজি বাড়ি। বাগবাজার যে কত ঘিঞ্জি এই ছাদে দাঁড়ালেই জানা যায়। আমার থেকে হাত দুয়েক দূরে দাঁড়িয়ে আছে সুরঞ্জনা। একটু পুরুষালি চেহারা, কিন্তু কী ভয়ংকর আকর্ষণ! ভীষণ মন খারাপ হচ্ছে, ঈশ্বরলাভের সাধনা না করে এই মেয়েটিকে জীবনে পাওয়ার সাধনাই তো ভাল। কোনও পাহাড়ে, নিরালা কোনও নদীর ধারে, ঢেউ-ভাঙা সমুদ্রের কিনারায় দু’জনে পাশাপাশি বসে থাকা। গিরিশ গেয়েছিলেন, ‘জুড়াইতে চাই কোথায় জুড়াই। কোথা হতে আসি কোথা ভেসে যাই’। যেখান থেকে আসি আর যেখানেই ভেসে যাই, এসেছি, এইটাই বড় কথা। এমন সুন্দর পৃথিবী! নদী, পর্বত, সমুদ্র, বনানী, সুন্দরী রমণী, ঘুরন্ত ঘাগরা, দুরন্ত নিতম্ব, চপল চরণ। গঙ্গার মৃদু বাতাসে সুরঞ্জনার দু’-এক গুছি চুল কপালে এসে কাঁপছে। সুরঞ্জনার কণ্ঠস্বর অনেকটা বেগম আখতারের মতো। একটু ঘষাঘষা। তার ফলে আরও আকর্ষণীয়।
সুরঞ্জনা প্রশ্ন করলে, আপনি কি ছাত্র?
না, আমি একজন কেমিস্ট।
বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন কোন কলেজে?
স্কটিশে। আপনি?
আমি এখনও ছাত্রী। বিজ্ঞানেরই। এবছর আমার ফাঁইনাল। পড়াশোনা তেমন কিছুই হচ্ছে না।
এই ঘটনাটার জন্যে?
হ্যাঁ। দাদার কী যে হল! অমন একটা ছেলে! গতবছর শিবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বেরোল। সাংঘাতিক ভাল ছাত্র। তেমনি খেলাধুলোয়। দাদাই তো আমাকে পড়াত। আমার চেয়ে ঠিক দু বছরের বড় ছিল। একেবারে বন্ধুর মতো। বড় একা হয়ে গেছি। বাড়িতে যতক্ষণ থাকি কেবল দাদার কথা মনে পড়ে। সব জায়গায় দাদার স্মৃতি। জানেন তো, আমার গভীর বিশ্বাস, এর পেছনে বাজে একটা মেয়ে আছে। ফেরোশাস। একই সঙ্গে গোটাদশেক ছেলেকে খেলাচ্ছে। এই নিয়ে এক বছর বাড়িতে খুব অশান্তি হচ্ছিল। দাদাও একটু অন্যরকম হয়ে যাচ্ছিল। মা আর বাবাকে চড়া চড়া কথা শোনাত। আপনিও আমার দাদার বয়সি। আপনার সঙ্গে আমার দাদার চেহারার ভীষণ মিল। ঠাকুরঘরে আপনাকে দেখে চমকে উঠেছিলুম। আপনাদের এই বয়েসটা খুব সাংঘাতিক।
