স্বামীজি বললেন, নাও, জলখাবার খেয়ে নাও। চা ঠান্ডা হয়ে যাবে। চা অবশ্য বেশি গরম খাওয়া উচিত নয়।
ভীষণ লজ্জা করছে। অপরিসীম একটা অস্বস্তি। আমার জন্যে কেউ কিছু করলে, খাতির করলে, ভীষণ কুঁকড়ে যাই। দুঃখ, বঞ্চনা, তিরস্কার, অপমান এইসবই আমার খাদ্য। পেটে সয় ভাল। আমার জন্যে কেউ কিছু করবে কেন? মাথা নিচু করে, যেভাবে মেয়েরা অনেকের সামনে খায়, আমি সেইভাবে খেতে শুরু করলুম।
স্বামীজি তখন অন্য প্রসঙ্গে। বলছেন, ধ্যানে বসলেই মন ছটফট করবে। মনের ধর্মই সেটা। ধ্যানে বসলে মনে যেসব নিচু চিন্তা ঠেলে ঠেলে ওঠে, সে সবই হল আমাদের পূর্বজন্মের সংস্কার। মনের সঙ্গে লড়াই করে লাভ নেই। আলগা ছেড়ে দাও। দেখো কী করে! একটা চিন্তা এল। অনুসরণ করো। দেখো কোথায় যায়। কত দূর যায়। তারপরেই ফুটবলের মতো লাথি মেরে পাঠিয়ে দাও মাঠের বাইরে। আবার একটা চিন্তা আসবে, কারণ মন কখনও খালি থাকে না। সেটাকে ওইভাবে লাথি মেরে বের করে দাও। এইভাবে একদিন তোমার চিন্তাশূন্য অবস্থা আসবে। জানো তো, যোগ দুরকমের- কর্মযোগ আর মনোযোগ। যাক, সেসব কথা পরে। অযাচিত কারওকে জ্ঞান দিতে নেই। জ্ঞানের মূল্য কমে যায়। একমাত্র প্রার্থীকেই দিতে হয়। তোমার চোখ বলছে, তোমার মনের অবস্থা ভাল নয়। তোমার এই বয়সটা বড় সাংঘাতিক! আবার কোন বয়সটাই বা সাংঘাতিক নয়? আবার সাংঘাতিকের সংজ্ঞাটাই বা কী? যে যার জীবন বেছে নেয়। যে যার ঘর বেছে নেয়।
আমার খাওয়া শেষ। প্লেট কাপ ডিশ নিয়ে বিব্রত। এমনি রাখব, না ধুয়ে রাখতে হবে! এখানে নিয়মকানুন খুব সাংঘাতিক।
আমার বিব্রত অবস্থা দেখে স্বামীজি বললেন, যাও, ছাদের একপাশে রেখে দাও। হাত ধুয়ে এসো।
ধুয়ে রাখব না?
তোমাকে ওসব কিছুই করতে হবে না। নিজেকে অত অচ্ছুৎ ভাবছ কেন? তোমার মধ্যে বিশ্রী একটা মেয়েলি ভাব আছে। ওটাকে চেষ্টা করে তাড়াও তো! এফিমিনেসি।
অভিমানে বড় লাগল। ভাল ভেবে যা করতে যাই, সঙ্গে সঙ্গে একটা ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসি। এই আমার বরাত। যেখানে যা কিছু করতে যাব। পিতা হরিশঙ্করকে ভাল ভেবেই সাবধান করতে গেলুম, একজন পরস্ত্রী, সদ্য বিধবা, যুবতী, একই বাড়িতে একসঙ্গে থাকলে আপনারই নিন্দা হবে। হবে কেন, হয়ে বসে আছে। আমার নিজের কত বড় একটা ত্যাগ। মহিলার সঙ্গে কাকিমা সম্পর্কের আড়ালে আমারই আর একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। পিতা ভুল বুঝলেন। রেগে নিরুদ্দেশ। পৃথিবী জুড়ে উলটো বুঝলি রামেদের রাজত্ব।
ছাতের একপাশে একটা কল। কলের তলায় সব রেখে চলে এলুম। মহারাজ বললেন, এইবার বললো তোমার কী সমস্যা হয়েছে?
কয়েকদিন আগে বলা নেই কওয়া নেই আমার বাবা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন শেষরাতে।
কোথায় গেছেন বা যেতে পারেন বলে তোমার অনুমান?
আমি সম্পূর্ণ অন্ধকারে। আমাদের আত্মীয়স্বজন এমন কেউ নেই যেখানে তিনি যেতে পারেন। বন্ধুবান্ধব দু-একজন থাকলেও তিনি যাবেন না, কারণ তার নেচারটাই একটু অন্য ধরনের।
তোমার মুখেই শুনেছি, ভেরি আপরাইট। তেজস্বী পুরুষ। তুমি কী অ্যাকশন নিয়েছ?
আমি শুধু ভাবছি।
বাঃ বাঃ, আর পথে পথে ঘুরছ, আর মানুষের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছ! বাঃ! শাবাশ বাঙালি!
আমি কী করব বলুন? থানায় ডায়েরি করলে তাকে ছোট করা হয়।
মহারাজ টেবিলের দিকে তাকিয়ে সামান্য সময় ভাবলেন। মুখ তুলে বললেন, কথাটা তুমি ঠিকই বলেছ। একজন শিক্ষিত, বিচারশীল, বিবেকসম্পন্ন মানুষ যা করেন, ভেবেচিন্তে পূর্বপরিকল্পনা মতোই করেন। এ তো খেয়ালের ঘর ছাড়া নয়। এ একধরনের বানপ্রস্থ।
মহারাজের কথা বন্ধ হয়ে গেল। ঘরে সেই মেয়েটি ঢুকছে। নীচে মায়ের ঘরে যার দিকে তাকিয়ে আমার ধ্যান মাথায় উঠেছিল। চোখদুটো ছলছলে হয়ে আছে। ইরানি ছুরির মতো চোখ। ভীষণ ধার। এইরকম একটা পূত সংস্পর্শে বসেও মন প্রজাপতি হয়ে গেল। এ একেবারে অন্য রকমের, অন্য ধারার মেয়ে। লম্বা ছিপছিপে, চাবুকের মতো চেহারা। কাধ, বুক, পিঠ পুরুষের মতো চওড়া। অ্যাথলিটদের এইরকম চেহারা হয়। চলনে বলনে কোনও জড়তা নেই। আমার লজ্জা, আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
মহারাজ বললেন, এসো, এসো সুরঞ্জনা এসো। কেমন আছ তোমরা?
মেয়েটি নিচু হয়ে প্রণাম করল। প্রণাম করতে করতেই বললে, ভাল আছি মহারাজ।
কোনও খবর পেলে?
নাঃ, কোনও খবর নেই।
আশ্চর্য ব্যাপার। একটা জলজ্যান্ত ছেলে স্রেফ উবে গেল!
সবাই বলছে খুন করে ফেলে দিয়েছে। মেয়েটির চোখে জল এসে গেল। কান্নার কোনও শব্দ নেই। কুলকুল করে জল গড়িয়ে চলেছে দু’গাল বেয়ে।
মহারাজ বললেন, একেবারে একফ্রিমটা ভাবছ কেন? হঠাৎ খুনই বা করতে যাবে কে!
আপনি তো জানেন, আমার বাবার অনেক শত্রু আছে। তাদেরই কেউ চরম প্রতিশোধটা নিয়ে নিলে। পুলিশ তো তিন মাস ধরে হন্যে হয়ে খুঁজেও কিছু করতে পারলে না।
মেয়েটি একেবারে আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আমার অস্তিত্বটাই যেন সে ভুলে গেছে। শাড়ির আঁচল কখনও আমার মুখে, কখনও মাথায়। শরীরের উত্তাপ, ঘ্রাণ সবই আমার অনুভূতিতে। মুঠোয় ধরা যায় এমন কোমর ঠিক আমার ডান কনুইয়ের পাশে। একবার আড়চোখে তাকিয়েছিলুম, দৃষ্টি সোজা গিয়ে ঠেকল নাভিতে। একে আমি পেটরোগা প্রেমিক। যাকে দেখছি তারই প্রেমে পড়ে যাচ্ছি, তারই বরাতে এই গেরো! উঠে যেতেও পারছি না। মহারাজ ভাবকেন, মনে পাপ পুষছে বাইরে পুণ্যের ভেক। আমার তো স্ত্রী-পুরুষ জ্ঞান থাকা উচিত নয়। আমি তো ভাল ছেলে! ধর্মে মতি, দ্বিজে ভক্তি, মহা গুণবান।
