বসে পড়লুম একপাশে। আবার যে-সে বসা নয় একেবারে পদ্মাসনে। আসলে যার কিছু হবেনা, তার বাড়াবাড়িটা তো খুব হবে। সাধে মুকু বলেছে, আমি একটা ভণ্ড! মায়ের দিকে তাকিয়ে বললুম, মা, আমার মন থেকে পাপটা বের করে দাও মা। ভয়ংকর জ্বালাচ্ছে। দগ্ধে দগ্ধে মারছে। এ এক অদ্ভুত অসুখ মা। এর কোনও ডাক্তার নেই। আমাকে শাসন করার কেউ নেই তো, প্রাণ যা চাইছে তাই করে বেড়াচ্ছি! মা, তুমি আমার হাত ধরো।
কষকষে করে চোখ বুজিয়ে আছি, যাতে খুলে না যায়। গায়ে একটা বাতাস লাগল। নতুন রকমের একটা গন্ধ। চোখ খুলে গেল। সেই মেয়েটি আমাকে আঁচলের বাতাস মেরে, আমারই সামনে গিয়ে বসেছে সোজা হয়ে। চওড়া কাঁধ, চওড়া পিঠ। না, আমি দেখব না। কিছুতেই দেখব না। মেয়েটি যদি ধ্যানে বসতে পারে, আমিও পারি। হেরে আমি যাব না। দাতে দাঁত চেপে আমি আবার চোখ বোজালুম। প্রথমেই লাঠালাঠি বেধে গেল মনে। মাকে কোথায় দেখব? মধ্যে, না হৃদয়ে, না মাথার ওপর সহস্রারে? ঝামেলা কি একটা! নানা মুনির নানা মত। মা আসতে চাইছিলেন, শেষে বসার জায়গা না পেয়ে, আসন না পেয়ে, ধুততেরিকা বলে একেবারেই বেরিয়ে গেলেন। কোনও জায়গাই খালি নেই। হৃদয়! হৃদয়ে বসে আছে মুকু। ভুরুর মাঝখানে আপাতত বসে আছে সদ্য-দেখা মেয়েটি। সেখানে, তিনজনের লাঠালাঠি চলেছে, জিরাবাই বলছে নাচব, লতা বলছে খেলব, নীলবসনা বলছে আমি পিঠ দেখাব, পাশ থেকে আমার ধারালো, একটু পুরুষালি মুখ দেখাব। আয় কে হারে, কে জেতে! একটাকে তাড়াই তো আর একটা এসে ঢোকে। জোর ধ্যান হচ্ছে! আমি হাল ছেড়ে বসে আছি। এ তত ভাল জ্বালা যা হোক! একবার পিটপিট করে তাকালুম। ঘরে আরও কয়েকজন একটি ফুল হাতে নিয়ে সংকল্প করছেন। মেয়েটি আমার চোখের সামনে খাড়া ধ্যানস্থ। একটুও বুঝতে পারছে না, সে একই সঙ্গে ওখানেও আছে, আবার আমার মধ্যেও আছে। এর মাঝে কোথাও হরিশঙ্করকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মহারাজ আমাকে সুন্দর একটা গল্প বলেছিলেন: একজন সাধু, সর্বদা তার জ্ঞানোন্মাদ অবস্থা। কারও সঙ্গেই কথাটথা বলতেন না। লোকেরা বলত, পাগল। একদিন লোকালয়ে এসেছেন। ভিক্ষে করে কিছু খাবারও জুটেছে। একটা গোদা কুকুর শুয়ে ছিল। পাগল বেশ জুত করে সেই কুকুরের ওপর বসে নিজে খাচ্ছেন, কুকুরকেও খাওয়াচ্ছেন। ভিড় জমে গেল। সবাই হাসাহাসি করছে। বলছে, পাগলার কাণ্ড দেখ! সাধু তখন গম্ভীর গলায় একটি মাত্র প্রশ্ন করলেন, বাবা, তোমরা হাসছ কেন? সবাই বললে, হাসব না? হাসছি তোমার কাণ্ড দেখে। সাধু তখন একটি শ্লোক বললেন,
বিষ্ণুপরি স্থিতো বিষ্ণুঃ
বিষ্ণু খাদতি বিষ্ণবে।
কথং হসসি রে বিষ্ণো
সর্বং বিষ্ণুময়ং জগৎ ॥
সেই গল্প আর শ্লোক একসঙ্গে মনে পড়ল, একটু অন্য অর্থে, অন্যভাবে। আমিও এক উন্মাদ। তবে জ্ঞানোন্মাদ নই। জ্ঞানপাগল নই, মেয়েপাগল। আর আমার শ্লোক হল, মুকুপরি স্থিত লতা/জিরা খাদতি লতবে। কথং হসসি রে মনো। সর্বং নারীময়ং জগৎ ।
শাস্ত্র বলছেন, বিচার করবে। রমণী কেন এত রমণীয় ভাবছ? শ্রীরামকৃষ্ণের ধমক ভেসে এল। কানে, লজ্জা হয় না! পশুর মতো ব্যবহার! লাল, রক্ত, মল, মূত্র এসব ঘৃণা করে না! যে ভগবানের পাদপদ্ম চিন্তা করে, তার পরমাসুন্দরী রমণী চিতার ভস্ম বলে বোধ হয়। যে-শরীর থাকবে না, যার ভিতর কৃমি, ক্লেদ, শ্লেষ্ম, যত প্রকার অপবিত্র জিনিস। সেই শরীর নিয়ে আনন্দ! লজ্জা হয় না!
বুকের ভেতরটা চাপা আগ্নেয়গিরির মতো গুমগুম করে উঠল। পিঠ দেখছি পিঠ। পিঠে কী আছে? কিছুই নেই। মন তুমি বিচার করো। পিঠ হল যে-কোনও মানুষের শরীরের একটা অংশ। মেয়েদের পিঠ চওড়া। বেশ একটা ভরভরতি শোভা আছে। এর বেশি তো কিছু নয়। পিঠ তো আর পীঠস্থান নয়। এইবার পিঠের উলটো দিক, মানে পিঠের অপর পিঠ। সেখানে? মন একটু থমকে গেল। বিচার কতক্ষণ চলত কে জানে! আর সেই বিচারে মন কতটা সরে আসত না আরও ঢুকে যেত, তাই বা কে জানে! হঠাৎ একটা চাপা কান্নায় চোখ খুলতে হল। মেয়েটি কাঁদছে। মনে মনে খুব লজ্জা পেলুম। পৃথিবীতে কত মানুষ কত দুঃখ নিয়ে ফিরছে। তার কোনও খবরই আমি রাখি না। আমি কেবল আমার তালেই ঘুরছি। মনে মনে সম্ভোগ করছি। মানুষের মন না দেখে দেহটাই দেখছি। আরে ছিঃ ছিঃ। মাথায় আঙুলের স্পর্শ। মহারাজ আমার পেছনে। ইশারা করলেন, উঠে পড়ার।
মহারাজের ঘরে আর একটা ছোট টেবিলে খাদ্য অপেক্ষা করছে। চা ধোঁয়া ছাড়ছে ফুস ফুস। মহারাজ প্রশ্ন করলেন, ধ্যান তা হলে বেশ ভালই জমেছিল?
ঠোঁটের কোণে যেন সামান্য মুচকি হাসি। ইস্পাতের মতো ধারালো কঠিন চেহারা। অন্তর্ভেদী চোখ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রির ফার্স্ট ক্লাস ফাস্ট। সব ছেড়ে সন্ন্যাসী। ধন জন বিত্ত মান। এক মহান সন্ন্যাসীর সংস্পর্শে জীবন ঘুরে গেল সংসার থেকে সন্ন্যাসে। সর্বশাস্ত্রে পারদর্শী। বিজ্ঞানের মানুষ সংস্কৃতে কেমন করে এমন সুপণ্ডিত হলেন? আসলে ব্রহ্মচারীর পক্ষে সবই সম্ভব। পিতা হরিশঙ্কর বারেবারে আমাকে বলতেন, শিশ্নবান হও। সমস্ত সাফল্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে ওইখানে।
সহসা হ্যাঁ বলতে পারলুম না। আমার সত্য-মিথ্যা জ্ঞান অতিশয় কম। কথায় কথায় মিথ্যা ঢুকিয়ে দিই। একবারও মনে হয় না, ছি ছি, মিথ্যা বললুম। স্বামীজির ক্ষুরধার চোখের দিকে তাকাবার সাহস হচ্ছে না। ধরা পড়ে যাব।
