বসে থাকতে থাকতে মনে হল বারাণসী যাব। সেই দশাশ্বমেধ ঘাট। সেই বাড়িটা খুঁজে বের করব, যে বাড়িতে যৌবনে আমার পিতা, পিতামহের সঙ্গে কিছুকাল বাস করেছিলেন। যে বাড়িতে বাঁদরের তাড়ায় ছাদের খাড়া সিঁড়ি বেয়ে পড়ে গিয়ে, নাকের ওপরে, কপালে অর্ধচন্দ্রাকৃতি একটি ক্ষতচিহ্ন তৈরি হয়েছিল। যেন মহাদেবের কপালের শশাঙ্ক তিলক। প্রতিজ্ঞাটা তা হলে এই হল, রাত যাকে প্রলোভন দেখায় তাকে দিনের সুরে বাঁধতে হবে। সন্ন্যাসই তার আদর্শ। কাটাপেরেকের মতো ভেতরে গজগজ করছে কদিচ্ছা। রাতে কতরকম যুক্তি খাড়া করি! সকালে শঙ্কর, রাতে খৈয়াম। এমন ছেলেই বংশের মুখে চুনকালি মাখায়।
হঠাৎ পেছন দিক থেকে মাথার ওপর আলতো একটা হাত এসে পড়ল। চমকে ফিরে তাকালুম। গেরুয়া বসনের প্রান্ত। মুখ তুলে তাকালুম। স্বামীজি। স্বামী নির্মলানন্দ। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। অতিশয় অপবিত্র হয়ে আছে আমার এই দেহ। স্পর্শমাত্রই তিনি অনুভব করবেন। পড়ে ফেলবেন আমার চিন্তা। এঁদের সামনে মানুষ কাঁচ হয়ে যায়। আমি দাঁড়িয়ে উঠে প্রণাম করলুম নিচু হয়ে।
তিনি বললেন, কী ব্যাপার, এই সময়ে তুমি এইখানে বসে?
প্রসন্ন স্নিগ্ধ গম্ভীর মুখ। পরিষ্কার টকটকে গেরুয়া। একটু ইতস্তত করে বললুম, কাল সারাটা রাত আমি পথেই কাটিয়েছি।
সেকী? কেন? অ্যাডভেঞ্চার?
আজ্ঞে না, সে অনেক কথা।
চলো চলো, আশ্রমে চলল।
মহারাজ তরতর করে হাঁটতে লাগলেন। ভীষণ দ্রুত হাঁটেন। তাল রাখা শক্ত। কাছেই আশ্রম। সকালে প্রাতভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিলেন নিমতলা। শুনেছি রোজই তিনি এই পথপরিক্রমা করেন। বাগবাজারের ঘাটে অল্পক্ষণ দাঁড়িয়ে ফিরে যান আশ্রমে। তিনতলার ঘরে। সেখানে সারাদিন জ্ঞান-তপস্যা। পত্রিকার সম্পাদনা।
কোনও দিকে তাকাবার অবকাশ নেই। পেছনে পেছনে চলেছি। সিঁড়ি। মহারাজ তরতর করে উঠছেন। ফরসা পায়ের ওপর টকটকে গেরুয়া,কী সুন্দর শোভা! টেবিলের সামনে চেয়ার টেনে বসে আমাকে বললেন, বোসো।
ভয়ভয় করছে। স্বামীজির বিশাল ব্যক্তিত্বকে আমি ভীষণ ভয় পাই। আবার ভীষণ আকর্ষণও বোধ করি। মনে হচ্ছে পাহাড়ের সামনে থম মেরে বসে আছি। স্বামীজি হাড়ের ছুরি দিয়ে একটা খামের মুখ কাটতে কাটতে বললেন, আমার যতদূর মনে হচ্ছে, তোমার মুখ ধোয়া, প্রাতঃকৃত্য সবই বাকি আছে।
আজ্ঞে হ্যাঁ।
স্বামীজি স্প্রিং-এর মতো চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন। এমন এনার্জি আমি একমাত্র হরিশঙ্করের ভেতরেই দেখেছি। কিছু একটা করার সময় একেবারে ছিলে-ছেঁড়া ধনুক। স্বামীজি আলমারি খুলে একটা ভোয়ালে বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, আগে প্রাকৃতিক কর্ম সারো। তারপর সব কথা শোনা যাবে। ইতস্তত ভাব এল, আপনার বাথরুম, আপনার তোয়ালে! হাসেন যখন একেবারে ছেলেমানুষ! সে হাসি আবার কড়া সুরে বাঁধা। বললেন, কর্মটা একই। আশা করি পশ্চিমি পরিচ্ছন্নতাটা জানো? সেইভাবেই ব্যবহার কোরো। আর তোয়ালে? ওটা তোমার। নারীসুলভ লজ্জা ছেড়ে পুরুষমানুষের মতো চলে যাও। একেবারে স্নান সেরে বেরিয়ে এসো।
.১০ I do none of the things I promised I would
একটা মিষ্টি বাতাস বয়ে আসছে গঙ্গার দিক থেকে। ঝঝালো মধুর মতো রোদে ঝলমল করছে দিন। সেগুন কাঠের ঝকঝকে টেবিল। চৌকো একটা কাঁচ পাতা রয়েছে। মহারাজ বসে আছেন। চেয়ারে। চোখের সামনে পরপর তিনটি ছবি। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ, শ্রীশ্রীমা, স্বামীজি। র্যাকে আলমারিতে অজস্র বই। বেদান্ত, উপনিষদ, গীতা-ভাষ্য, শ্রীরামকৃষ্ণ সাহিত্য, সংস্কৃত মহাভারত, রামায়ণ, আরও কত কী! মহারাজের উলটো দিকের চেয়ারে আমি বসে আছি। স্নান করলেও একটা অস্বস্তিতে ভুগছি। জামাকাপড় অন্তর্বাস বদলানো হয়নি।
স্বামী নির্মলানন্দজি আমার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, যাও, নীচে গিয়ে মায়ের মন্দিরে মাকে প্রণাম করে এসো। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসবে। ছটফট করবে না। তারপর চরণামৃত নিয়ে, ওপরে আসবে।
একটা ব্যাপার আমি লক্ষ করেছি, ধর্ম ধর্ম করি বটে, আমার ভক্তিটা কিছু কম। মহারাজের নির্দেশে সিঁড়ি দিয়ে তিনতলা থেকে দোতলায় নামছি বটে, মনে তেমন কোনও উৎসাহ নেই। বরং একটা বিরক্তির ভাব। জোর করে আমাকে লোক-দেখানো বসে থাকতে হবে অন্তত পনেরো মিনিট চোখ উলটে। কতই যেন ধ্যান লেগেছে! সমাধি হল বলে। চোখ বোজাতে আমার ভয় করে। যাকে ভাবব, তিনি আসবেন না। আবোলতাবোল নানা দৃশ্য ভেসে আসবে। অদ্ভুত অদ্ভুত সব চিন্তা দুধের মতো মনে উথলে উঠবে। অবস্থাটা হবে এইরকম, ঝোলার ভেতর থেকে বেড়ালটা বেরিয়ে আসতে চাইছে, তাকে জোর করে চেপে ধরে আছি। থলেতে জায়গায় জায়গায় ফুলে ফুলে উঠছে। না আসে চোখে জল, না, জাগে মনে পুলক! বড় শুকনো লাগে। মনে হয় বসে আছি ডেন্টিস্টের চেম্বারে দাঁত তোলাবার জন্যে।
শ্বেতপাথরের ঝকঝকে মেঝে। প্রশস্ত ঘর। সামনেই কাঠের বেড়া। বেড়ার ওপাশে সিংহাসন। সিংহাসনে মায়ের বিশাল পট। সামনেই পূজার আয়োজন। ধূপের গন্ধ বাতাসে পাক মারছে। মায়ের মূর্তির দিকে চোখ পড়ার আগেই, চোখের এমনই ট্রেনিং, চলে গেল অন্য দিকে। আটকে গেল আকাশি রঙের পিঠে। চওড়া একটি পিঠ। সামনে ঝুঁকে চরণামৃত নিচ্ছে একটি মেয়ে। মুকুর বয়সি। চোখ কেড়ে নেবার মতোই চেহারা। পরনে আকাশি রঙের ফিনফিনে শাড়ি। জিভ দিয়ে মানুষের লালা পড়ে। যদি চোখ দিয়ে পড়ত, আমার বুক ভিজে যেত। কী ভয়ংকর দুর্বল আমার মন! এই মন নিয়ে তো বেশি দূর যাওয়া যাবে না। মেয়েটি চরণামৃত খেয়ে হাত ধোয়ার জন্যে উঠে গেল। আমার চোখও পায়ে পায়ে চলল লেজ-তোলা বেড়ালের মতো। মনে মনে নিজেকেই নিজে ঠাস করে একটা চড় হাঁকড়ালুম। রাসকেল, চরিত্রহীন!
