গলা যেন একটু ধরাধরা। এই যে সব থাকা আর না-থাকা, আমি আছি, তোমরা নেই, এইসব বিচ্ছেদের ব্যাপারট্যাপার সংসারী মানুষকে বড় বিচলিত করে। একটু বেদান্তের দিকে সরতে পারলেই বগল বাজিয়ে ঘোরা যায়, ‘এই সংসার ধোঁকার টাটি, খাই দাই আর মজা লুটি।’ জগৎ সব ভুল, স্বপ্নবৎ। আমিতেই মেরেছে। আমির বোধেই, তোমার বোধ। নীচে আগুন জ্বলছে, হাঁড়িতে ডাল, ভাত, আলু, পটল সব টগবগ করছে। লাফাচ্ছে, আর বলছে, ‘আমি আছি’, আমি ধিন ধিনা লাফাচ্ছি। শরীর সেই হাঁড়ি, মনবুদ্ধি জল, ইন্দ্রিয়ের বিষয়গুলি ডাল, ভাত, আলু, পটল, স্ত্রী, পুত্র, পরিবার। অহং যেন তাদের অভিমান, আমি ফুটছি, ফাটছি। সচ্চিদানন্দ, তুমিই সেই অগ্নি। আহা, জগৎজোড়া কাবাবের কারখানা। থুড়ে থুড়ে কিমা। প্রশ্ন, কিমাং কিম করোতি। আসল জ্ঞান কি ব্যাকরণে আছে? আসল জ্ঞান কি গণিতে আছে? পাঁজিতে অনেক জলের কথা লেখা আছে। নিংড়োলে এক ফোঁটাও বেরোবে না। আসল জ্ঞান ফুটে ওঠে। প্রথমে একটু জ্বরজ্বর, কোমর ব্যথা, তারপর কপালে একটি গুটি, গলায় দুটি, পিঠে তিনটি! ব্যাপার কী? পক্স। ফক্সের সংসারে পক্সের মতো এইভাবেই গুটিকয়েক মানুষের মনে ব্ৰহ্মজ্ঞানের গুটি বেরোয়। বাকি সব অহংয়ের কচকচি। বয়েসফয়েস কিছুই নয়। ধ্রুব, প্রহ্লাদ, সব কঁচা বয়সেই যোগী।
পিতার শেষ কথায় পরিস্থিতি শীতল হয়ে এল। মৃত্যু, বিচ্ছেদ, শূন্যতা প্রৌঢ় মানুষদের সহজেই কাবু করে ফেলে। যুবকদের সমস্যা অনেক কম। এই যেমন আমি। কনকরা চলে যাবার পর দিন তিনেক মন হুহু করবে বাউল আর ভাটিয়ালি গানের মতো। বাথরুমে জল পড়ার ঝরঝর শব্দের সঙ্গে, মন মাঝি তোর বইঠা নে রে, আমি আর বাইতে পারলাম না মিলিয়ে, ছলছলে চোখে নাঙ্গা হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা। তাতে কনকেরও কিছু এসে যাবে না, আমারও কাঁচকলা। দশ বছর পরে দেখা যাবে কনক মা হয়ে মেয়ে কোলে কোনও এক্স ওয়াই জেডের ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। খুব। দুঃখ হবে মায়ার কিছু হলো না, মায়ার কথা যখন-তখন ভাবা উচিত নয়। মায়া আমার মাঝরাতের মালকোষ, ভোররাতের যোগিয়া।
মেসোমশাই এগিয়ে এসে পিতার হাত ধরে বললেন, ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট। যা হয়ে গেল, তা হচ্ছে প্রিন্সিপিল-এর লড়াই।
হাত-ধরা অবস্থাতেই পিতা বললেন, আজ্ঞে না, একে বলে অহংয়ের ঠোকাঠুকি। কেউ কারুর কাছে ছোট হব না। অহংয়ের বাষ্পে দৃষ্টি আচ্ছন্ন, বিচারবুদ্ধি ঘোলাটে। মোটরবাইক কীভাবে স্টার্ট নেয় দেখেছেন?
দেখলেও খেয়াল করিনি।
পিতা হাত মুক্ত করে নিলেন। দু’হাতে মোটরসাইকেলের হাতল। সামনে শরীর একটু ঝুঁকে আছে। বাঁ পা স্টার্টারে। ফার্স্ট ফিক, সেকেন্ড, থার্ড কিক। ভটভট, ভটভট। একেই বলে অহংয়ের। লাথি।
মেসোমশাই, কনক দু’জনেই হেসে উঠলেন। যাক বাবা, আবহাওয়া ময়ান দেওয়া ময়দার মতো মোলায়েম হয়ে গেল। দুই ব্যাঘ্র চলে গেলেন বারমহলে। ছায়াছায়া বারান্দায় কনককে কী সুন্দর দেখাচ্ছে। বুলবুল গান গায় নার্গিস বনে। বিচিলি রঙের শাড়ি। সাদা ব্লাউজ। ধারালো চেহারা। চকচকে কালো চুল। চোখে আলো পড়লে নীল সাগরে ভেসে থাকা কালো মণি ঝলসে ঝলসে উঠছে।
কনক দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললে, তোমার একজন বোন থাকলে বেশ হত।
তুমি তো আছ।
আমি আর কদিন বলো?
তা ঠিক। যদিন আছ তদিনই বাড়ি জমজমাট। তারপর সংসার চলবে শেষবেলার জলের চাকার। মতো। চাষার ক্লান্ত হাতে চাকা জলে নামছে, ঘুরে ঘুরে, ধীরে ধীরে উঠছে। সরষে-খেতে জল পড়ছে ছিড়িক ছিড়িক করে।
থাক আর কাব্য করতে হবে না। এখন লুচি, ছোলার ডাল, আলুর দম। ঘড়ির কাটা কোথায় গেছে দেখেছ!
ডাক উঠল, পিন্টু, পিন্টু। এক মিনিট দেরি করার উপায় নেই। আজ্ঞে বলে ক্যানেডিয়ান ইঞ্জিনের মতো দৌড়োতে হবে। দুই পিতাই আবার চেয়ারস্থ। বেশ ভাব হয়ে গেছে দু’জনের। প্রসঙ্গটা কী জানি না। মেসোমশাই খুব কাকুতিমিনতি করছেন, ওসব হাঙ্গামার দরকার নেই হরিদা। খাদ্যতালিকা যা তৈরি করেছেন যথেষ্ট।
এ ব্যাপারে আপনার কথা বলার কোনও অধিকার নেই বিনয়দা। আপনি আমার সম্মানিত অতিথি। আমাদের বংশের একটা ধারা আছে। . বংশই নেই তো বংশের ধারা! শেষ বাতিটি কে জ্বালাবে! আমি তো আজ আছি কাল নেই। গুরু পেলেই বৃন্দাবন। তখন তো অনেক কথাই ফিরিয়ে নিতে হবে, যেমন দুষ্ট গোরুর চেয়ে শূন্য গোয়ালই ভাল। পিতা বললেন, একটা কাজ করতে পারবে?
আজ্ঞে হ্যাঁ, কেন পারব না!
পরেশের দোকানে গরম রসগোল্লা কটার সময়ে নামে?
রাত বারোটা নাগাদ।
তুমি ঘোড়ার ডিম জানো।
আমি সেইরকমই শুনেছি।
কার কাছে?
কে যেন বলছিল। ওই পেটের গোলমাল হয়েছিল। রাত বারোটায় গিয়ে পরপর তিন দিন ছ’টা করে রসগোল্লা খেয়ে সেরে উঠেছে।
সে তোমার কোনও গেঁজেল বন্ধু। আমি জানতুম, তোমার দ্বারা চুলের কেয়ারি ছাড়া অন্য আর কিছু হবার উপায় নেই। আমিই যাচ্ছি। কতক্ষণ লাগবে? যেতে তিন মিনিট, আসতে তিন মিনিট।
আমি তো যাব না বলিনি!
তবে যাও। বলে এসো রাত দশটার সময় এক সের গরম রসগোল্লা চাই। সবচেয়ে বড় সাইজের যেটা সেইটা।
মেসোমশাই আর একবার মৃদু গলায় বললেন, কেন হাঙ্গামা করছেন হরিদা?
এটা আমাদের ব্যাপার বিনয়দা। যাও, তুমি আবার তানানানা করছ কেন?
গরম হাওয়া পেলে বেলুন ফুস করে ঠেলে আকাশে ওঠে। রাস্তায় পা রেখে মনে হল আমারও সেই অবস্থা। বাড়ির দিকে তাকিয়ে ফিরে ফিরে দেখছি। খোলা জানলায় আলো ফটফট করছে। মানুষের ছায়া নড়ছে দেয়ালে। বাইরে থেকে দেখলে মনেই হবে না, গরাদহীন উন্মাদ আশ্রম! পাশ দিয়ে যেতে যেতে কে যেন বললেন, কী দেখছ হে ঘুরে ঘুরে? আমাদের পাড়ার বিধুজ্যাঠা। পাটের দালাল। বেশ ভোগীর চেহারা। বগলে একটা ব্যাগ। চোখে সোনালি চশমা।
