বিবাদী তোর দেহে সকল
অহর্নিশি করছে রে গোল,
যথা যাবি, তথায় পাগল করবে তোরে ॥
নারী ছেড়ে জঙ্গলে যায়,
স্বপ্নদোষ কি হয় না তথায়,
সাথের বাঘে সবারে খায়,
তখন আর কে ঠেকায় রে ॥
সঙ্গে আছে রিপু ছয়জন,
তারা সদাই করে জ্বালাতন,
কোন দেশে যাবি মনা চল দেখি যাই।
আমি দেখব, কোথায় পির হও তুমি রে,
তীর্থে যাবে সেখানে কি পাপী নাই রে ॥
হঠাৎ কানে সুর লেগে গেল। খারাপ ভাবটা শীতের পাতার মতো খুস করে ঝরে পড়ল। মনে হল আমিও একটু গান গাই। কিন্তু আমাকে কি গাইতে দেবে? পরেশদার কানে কানে বললুম, আমাকে গান গাইতে দেবে? পরেশদা বললেন, সেকী, তুমি গান জানো?
অল্প অল্প।
দাঁড়াও, ব্যবস্থা করে আসি।
পরেশদা উঠে গিয়ে ওস্তাদজির কানে কী বললেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে গান থামিয়ে বললেন, আইয়ে আইয়ে। উঠে গেলুম। তিনি হারমোনিয়মটা ঠেলে দিলেন আমার দিকে। প্রথমে একটু ভয়ভয় করছিল। গুরুকে স্মরণ করে নিলুম চোখ বুজিয়ে। ওস্তাদজিকে নমস্কার করলুম। তিনি খুব খুশি হলেন। রাত ভোর হয়ে আসছে। ভৈরবীটা আমার গলায় আসে ভাল। ভৈরবীর পরদা লাগালুম। সুর ঝলমল করে উঠল। মনে মনেই বললুম, আহা! ওস্তাদজি আমার মাথার পেছনে হাত বুলিয়ে দিলেন একবার। ধরে ফেললুম সেই বিখ্যাত গান, দয়ানী ভবানী। তিন সপ্তকে গলা বলছে। নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছি। ছেলের মাথায় আপেল বসিয়ে বাবা তিরবিদ্ধ করেছিলেন। আমার অনেকটা সেই অবস্থা। গলির ভেতর বস্তি, সেই বস্তির আধময়লা বিছানায় একটা মেয়ে, সেই মেয়েটিকে ভৈরবী দিয়ে মন থেকে ফেঁড়ে ফেলে দিতে হবে। ভবানী, তুমি দয়া করো। যাক, ভোর হয়ে আসছে। অন্ধকার ফিকে হয়েছে। বেশ ভাল লাগছে এই ভেবে, যুদ্ধে জয়লাভ করেছি। ওস্তাদজি দয়া করে হারমোনিয়ম ছেড়ে না দিলে, আংটিটা শেষপর্যন্ত টেনে নিয়ে যেত পাপের পথে। খোঁচা মেরেছিল। চল চল করেছিল, আরে আমি তো আছি আঙুলে!
রাজা রীক্ষিতের কথা মনে পড়ে গেল। তারই কীর্তি। আমার তো কিছু করার নেই। পরীক্ষিতের সঙ্গে দেখা হল। প্রথমে চিনতে পারেননি। কে এই বিকট দর্শন পুরুষ! হাতে দণ্ড, চোখ ক্রোধে রক্তবর্ণ। ঘোর কৃষ্ণবর্ণ। একটি বৃষ ও একটি ধেনুকে নির্দয় প্রহার করছে। বৃষ ও ধেনুটিকে দেখে রাজা আরও অবাক হলেন। এ কেমন বৃষ! সুন্দর ধবল বর্ণ, কিন্তু তার একটি মাত্র পা। প্রহারে জর্জরিত ধেনুটির চোখে জলের ধারা। রাজা প্রশ্ন করলেন, বর্বর, তুমি কে?
আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি কলি। আমি এসে গেছি।
রাজা স্তম্ভিত হলেন। আমার রাজ্যসীমায় কলি! কী স্পর্ধা! রাজা তখন প্রশ্ন করলেন বৃষকে, তুমি কে?
বৃষ বললেন, আমি ধর্ম।
আপনার এই অবস্থা কেন ধর্মরাজ?
মহারাজ, কলিতে ধর্মের এই অবস্থাই হবে। কলিযুগ অধর্মের যুগ। ধর্মের তিন ভাগ চলে গিয়ে থাকবে মাত্র এক ভাগ। তাই আমার একটি মাত্র পা।
রাজা ধেনুকে প্রশ্ন করলেন, আপনি কে?
ধেনু বললেন, আমাকে চিনতে পারলে না পরীক্ষিত! আমি মাতা ধরিত্রী। আজ আমি ভাগ্যহীনা। আমারই বুকে সংঘটিত হবে যত অনাচার। দুবৃত্তরা নৃত্য করবে। সাধুসজ্জন নিপীড়িত হবে। রাজা পরীক্ষিত গর্জন করে উঠলেন, তুমি কলি! তোমার সংহার হবে আমার হাতে। রাজা অস্ত্র ধারণ করলেন। মহাতেজা পরীক্ষিত। কলি ভীষণ ভয় পেলেন। রাজা পরীক্ষিতের সঙ্গে লড়াই করার শক্তি তার নেই। তিনি করজোড়ে আশ্রয় চাইলেন, মহারাজা, কালের নিয়মে আমাকে আসতেই হবে। না এসে উপায় নেই। আমাকে শুধু একটু থাকার স্থান নির্দেশ করুন।
বিচক্ষণ রাজা বুঝলেন, কালকে হনন করা যায় না। রাজা তখন কলির স্থান নির্দেশ করলেন। কোথায় থাকবেন কলি! পাশাক্রীড়ায় অর্থাৎ দূতসভায়, মদ্যপানে, পরস্ত্রী অনুগমনে আর প্রাণীহিংসায়। কলি সবিনয়ে বললেন, রাজন, দয়া করে আরও একটি আশ্রয় দিন। আপনি যা দিলেন, তা যথেষ্ট হল না।
মহারাজ পরীক্ষিত সামান্য চিন্তা করে বললেন, ঠিক আছে, সুবর্ণেও আপনার স্থান হোক। কলি সন্তুষ্ট হলেন। আমার আঙুলের আংটিটার দিকে তাকিয়ে মনে হল, এই সেই সুবর্ণ। ঘোর কলি। আমাকে আর একটু হলেই দুই ম-এ মজিয়ে মারত।
এক লাফে সূর্য উঠল টালার দিকের আকাশে। আমি বসে আছি বাগবাজারের ঘাটে। পরেশদা আর বেগ ধারণ করতে পারেননি। আমার গান শেষ হবার আগেই চলে গেছেন সেইখানে, যেখানে যাবার জন্যে প্রাণ ছটফট করছিল। ওস্তাদজি আর জিরাবাই সাহাবাবুদের গাড়িতে চেপে চলে গেছেন। ওস্তাদজি যাবার আগে ঠিকানা দিয়ে গেছেন। বলেছেন যদি যাই, তা হলে ঠিক ঘরানায় ফেলে দেবেন। জিরাবাই চাঁপাফুল রঙের কোমর বের করে পেছনের আসনে এলিয়ে ছিলেন। শরীর খুবই বে-এক্তার। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে।
ঘাটের কিনারায় জল ছলাত ছলাত করছে। পশ্চিম আকাশের ঘুম ভেঙে গেছে। মরকত নীল আকাশ। বড় বড় বিচিলির নৌকো মৃদুমন্দ দুলছে। ভোরের আনার্থীরা কেউ জলে, কেউ ঘাটে। কেউ বলছেন হরি, কেউ রাম, কেউ তারা। সারারাত বিশ্রীভাবে জেগে থাকার ফলে, চোখদুটো ফুলুরির মতো হয়ে আছে। এইখানে বসে থাকার ফলে, নিজের জীবনের সুরটা ধরতে পারছি। একদিকে মন্দির। মাঝে মাঝে টিং করে ঘণ্টা বাজিয়ে চলে যাচ্ছেন ভক্ত। শিবলিঙ্গের মাথায় জল ঢেলে চিৎকার করছেন কেউ, জয় বাবা বিশ্বনাথ। ঘাটের ধাপ কাপড়ের আর পায়ের জলে ক্রমশই ভিজে উঠছে। দু’হাত দিয়ে জল ঠেলার শব্দ। ঢেউয়ের ওপর প্রথম সূর্যের আলো চিকমিক করছে। গাঁজা নেই, গান নেই, শরীর দোলানো নাচ নেই। কোনও কুপ্রস্তাব নেই। লতার শাড়ি খোলা আধময়লা সাদা ব্লাউজ ফাটা বুক নেই। এই পবিত্রতাই আমার জীবনের সুর। আমি ধরে ফেলেছি। এই জীবনের সুর চিরকালের জন্যে বেঁধে দিয়ে গেছেন আমার পিতা, খ্যাপা হরিশঙ্কর। নিজেকেই নিজে টাইট করে বাঁধো,নইলে ফসকে যাবে। জীবন বড় গোল, পৃথিবীর চেটো বড় সমতল। বেশি নড়াচড়া কোরো না, গড়িয়ে পড়ে যাবে।
