লোকটি অদ্ভুত কায়দায় বসে বসেই ডান পা-টা ছিলে-ছেঁড়া ধনুকের মতো এমন ছুড়ল, ধাঁই করে লতার বুকে। শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ। স্থলে জলে আকাশে। প্রথমে গোলা যুদ্ধ। গেলাস ছোঁড়াছুড়ি, ডালের বাটি, আধখাওয়া পেঁয়াজ। রাম রাবণ তো নয়, রাম-সীতায় লড়াই।
পরেশদা বললেন, আর না। চলো সরে পড়ি। প্রেম জাগছে।
এর নাম প্রেম?
আজ্ঞে হ্যাঁ। প্রেমের তুমি কী বোঝো হে ছোকরা? আলোড়ন, আলিঙ্গন, আক্রমণ, আন্দোলন, নিষ্পেষণ, নিপীড়ন।
একটা গেলাস পরেশদার মাথা ঘেঁষে ঠিকরে চলে গেল বাইরে। দুটো নেড়ি কুকুর বসে ছিল প্রসাদের আশায়। দুটোতেই তারস্বরে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল। লতা ছুটে বাইরে চলে যেতে চাইছিল। লতার স্বামী চুলের মুঠি ধরে মেঝেতে পেড়ে ফেলল। পরেশদা বললেন, হয়ে গেল। ফ্লোর করে দিয়েছে। আর না। এইবার পালাই।
রাস্তায় নেমে বললুম, পরেশদা, আবার ওই গানের আসর! শরীরের সমস্ত রক্ত খালের মশা শুষে নিল। আর যে পারছি না।
ওইজন্যেই বলেছিলুম ছিলিমে মারো টান। মশা কেন, কাকড়াবিছে কামড়ালেও টের পেতে না। এত রাতে তুমি ফিরবে কী করে? হেঁটে! দিনকাল ভাল নয়। রাত আর বেশি বাকি নেই, কোনওরকমে কাটিয়ে দাও।
গানের আসরের কাছাকাছি এসে পরেশদার মত বদলে গেল, আমরা একটা কাজ অবশ্য করতে পারি। তবে… তবে…
বারকতক তবে শুনে বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করলুম, তবে কী?
তোমার হয়তো খারাপ লাগবে। ভাববে, তোমাকে আমি খারাপ করে দিচ্ছি। তবে, সবরকম। অভিজ্ঞতাই হওয়া ভাল। একবারই তো জন্মেছি। পরেশ নামে আর তো দ্বিতীয় বার আসা হবে না। জীবনের সব দিক দেখে যাব। আমার ভাই এই মত। তোমার মত অবশ্য অন্যরকম হতে পারে। আচ্ছা একটা সত্যি কথা বলবে?
মরার ভয় না থাকলে নিশ্চয় বলব।
পরেশদা আমার কাছে সরে এলেন আরও। হাতটা চেপে ধরে বললেন, শরীরটা একটু কেমন কেমন লাগছে না?
তা তো লাগছেই। সারাদিন টোটো করে ঘুরছি।
আরে ধুর। সে তো আমিও ঘুরছি। শ্যামবাজার ধর্মতলা, ধর্মতলা শ্যামবাজার। সে নয়। জিরাবাই যা দেখালে তাতে একটু ইচ্ছে ইচ্ছে করছে না? তারপরে তোমার ওই লতা। ভেতরটা একটু টাল খেয়েছে না? সত্যি বলবে। ভণ্ডামি করবে না মাইরি।
বেশ বেকায়দা হয়ে গেলুম। এর উত্তরে সত্যি কথা বলা যায় না। ঝট করে বলে ফেললুম, আমার কিছুই হয়নি।
তোমার তা হলে অসুখ আছে। তুমি পুরুষ নও। তুমি সেই।
খপ করে আমার দুটো হাত চেপে ধরে বললেন, চরিত্র দেখাচ্ছ। চরিত্র! ওই শরীরের ঝটকা দেখে তোমার চটকা ভাঙেনি! মিথ্যে বলার জায়গা পাওনি? চলো আমার সঙ্গে।
কোথায় আমাকে নিয়ে যাবে পরেশদা?
তুমি আমাকে কতটা খারাপ ভাবছ?
একটুও না।
তোমার কিছু নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে কি না?
হয়েছে।
এই এতটা সময় আমরা দুঃখকষ্ট ভুলে ছিলুম কি না?
ছিলুম।
কে ভোলালে?
গান।
গানের সঙ্গে?
নাচ।
ওকে নাচ বলে? এইবার আমি খিস্তি করব। চলো। বেশি দূরে যেতে হবে না। কাছেই।
আপনি আমাকে খুলে বলুন আগে।
ওই কালীমন্দিরের পাশের গলি দিয়ে ঢুকে গেলেই অন্য এক জগৎ। বিশাল এক বস্তি। সেই বস্তিতে জেগে আছে রাত-রূপসিরা। সাংঘাতিক এক মজার জায়গা। তোমাকে বলতে লজ্জা নেই আমি মাঝে মাঝে যাই ভাই। একটু আদরটাদর করে, একটু আদর খেয়ে, ফ্রেশ হয়ে চলে আসি। এতে তো কারও কোনও ক্ষতি হচ্ছে না। কারও কোনও ক্ষতিও আমি করছি না। তোমারও কেউ নেই, আমারও কেউ নেই। আমাদের এইসব নিয়েই থাকতে হবে। একা তো আর থাকা যায় না। আমার যুক্তিটা তুমি মানো কি না!
পরেশদা, ওখানে আমি যেতে পারব না। আর এই এত রাতে আমাকে আপনি একা ফেলে পালাবেন না। একটা রাত আমার জন্যে একটু কষ্ট করুন। তা ছাড়া, আমার পকেটে আপনারই। দেওয়া একটা মাত্র টাকা পড়ে আছে। একটাকায় তো আর ফুর্তি হয় না!
পরেশদার প্রবল উৎসাহে একটু ভাঁটা পড়ল। বুঝলেন, যেখানে যাচ্ছেন সেখানে বিনা পয়সায় কেউ আদর করবেনা। ফেলো কড়ি মাখো তেল। একপাক পায়চারি করে নিলেন। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, ব্যাড লাক। আমার কাছে আমার মতন আছে। অন্যদিন থাকে। ভেরি ব্যাড লাক। আজকের রাতটা বেশ নরম ছিল। জমত ভাল। আমি যার কাছে যাই একেবারে ঘরের বউয়ের মতো ব্যবহার করে। যাক গে, আর একদিন হবে। চলো তা হলে ওই মশার ডিপোতে গিয়েই বসি।
জিরাবাইয়ের নাচ শেষ হয়ে গেছে। তিনি সাহাবাবুর গদিতে গিয়ে ঢুকেছেন। ওস্তাদজি একটা কাওয়ালির মুখ নিয়ে কসরত করছেন। আমার ভেতরে বেশ একটা ছটফটানি অনুভব করছি। পকেটে আজ টাকা থাকলে সময়টা কী সুন্দর কাটত! অনেকদিনের একটা ব্যাকুল ইচ্ছা, প্রবল কৌতূহল পূর্ণ হত। ওরা কেমন? কী করে? কী বলে? কেমন হাসে! কত কী শুনেছি! দূর থেকে দেখেছি। আজ চক্ষু-কর্ণের বিবাদভঞ্জন হত। এ তো পাপ নয়। একটা অনুসন্ধিৎসা। ভেতরটা তোলপাড় করছে। সবই তো তার ইচ্ছাতেই হচ্ছে। তিনি এটারও মালিক, ওটারও মালিক। তা হলে পাপ ভেবে কুঁকড়ে যাচ্ছি কেন? এটা তো ঠিক, ওই একটা জিনিস কিছুক্ষণের জন্যে মানুষের সবকিছু ভুলিয়ে দিতে পারে! হরিশঙ্করের নিষ্ঠুরতা, মুকুর অনিশ্চয়তা, কেউ-না থাকার নিঃসঙ্গতা। বলাও তো যায় না, প্রকৃত প্রেম হয়তো ওই জায়গা থেকেই পাশ ফিরে জেগে উঠবে। কার বরাতে কী লেখা আছে, কেউ কি বলতে পারে? সেদিন এক ভদ্রপাগল দু’চরণ কবিতা হাঁকছিল, হয়তো তারই লেখা: চলতে চলতে মাঝপথে গেলে তার দেখা পাওয়া যায়। সেই পথে জোনাকিরা দেয়। আলো। পাগল পরের চরণটা আর শেষ করলেন না। তড়বড় তড়বড় করে বলে উঠলেন, যে-জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি তার শালা কিস্যু হয় না। আমার ওইটা ভাল লেগেছিল, চলতে চলতে চলতে চলতে তার দেখা পাব। ওই যে বারোদির ব্রহ্মচারী, বিখ্যাত সাধক, তার এক শিষ্যকে বলেছিলেন, যদি মনে হয় আর পারছ না, তা হলে নিজের সঙ্গে অকারণে লড়াই না করে বেশ্যাগমন করো। তার এই যুক্তি শুনে সারা বৃন্দাবনে হইচই পড়ে গেল। বৈষ্ণবসমাজ অতিশয় অসন্তুষ্ট হলেন। বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীজি, কুলদানন্দ ব্রহ্মচারীজি তখন বৃন্দাবনে প্রবল সাধনায়। তারা। হায় হায় করে উঠলেন। তাদের দাওয়াই ছিল অন্য, দৌড়োও, কোদাল পাড়ো, গায়ে জল ঢালল। কষ্ট দিয়ে, না খেতে দিয়ে মেরে ফেলল। সনাতন পথ। বিদেশিরা বললেন, মরে না। বিকৃত হয়ে বেরিয়ে আসে। মারতে নেই। খাইয়ে খাইয়ে খিদে মেরে দিতে হয়। অরুচি করে দিতে হয়। বাঘের মোটা নেজও নড়বে, রোগা নেজও নড়বে। টিকিটিকিও ছুটবে, কুমিরও ছুটবে। করবেটা কী? ভগবানের যেমন কাণ্ড! এ কি তোমার ইচ্ছে? এ যে তার ইচ্ছে। মনে পড়ছে সেই গান। বাউল গাইছেন:
