তিনটে তেহাই মেরে গান শেষ হল। নর্তকী দু’বার হাত আঁকালেন। চুড়ি বেজে উঠল কিনকিন করে। রাতের শালু যেন দুলে উঠল। সমস্ত লোক নড়েচড়ে বসল। যে ঢোল বাজাবে তার কোলে গিয়ে চড়ল ঢোল। দু’দিকে গোটাকতক চাটা মেরে জানিয়ে দিলেন, জাগো জাগো।
নাচিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে ছিলেন। ডান পা-টা সটান সামনে বাড়িয়ে দিলেন। যেন উলটানো এক কদলীকাণ্ড। মসৃণ, নিটোল। অন্তরালে থাকে বলে অতিশয় শুভ্র। আকস্মিক আত্মপ্রকাশে সকলেরই ভেতরটা গেল গেল করে উঠল। পায়ের নিটোল গোছে পটি বাঁধা ঘুঙুর। সদম্ভে তিনবার পা ঠুকলেন তালে। এক, দো, তিন। ঝনঝন করে উঠল ঘুঙুর। শরীরের ওপর দিকে তরঙ্গ খেলে গেল। ঢোল ধরে নিল সেই ছন্দ, তবলা কাটতে লাগল তাল। সেই সাংঘাতিক পদোভা ডাইনে-বামে দ্রুত আন্দোলিত হয়ে তালের পর তাল ছাড়তে লাগল। ঘুঙুরের ঝনাৎকার। নর্তকী কানে হাত রেখে তীব্র সুরে ধরলেন–সেঁইয়া না মারো লাথ। তেরি গোড় পড়ি সজনীয়া। শুনো মেরি বাত।।
কোমর থেকে নিতম্ব জলস্তম্ভের মতো হিল্লোলিত করে নর্তকী উঠে দাঁড়িয়ে সপাটে একবার ঘুরে গেলেন। শাড়ি ফুলে উঠল ঘাগরার মতো। আমার পাশের লোকটি উঃ করে উঠল। ঠিক জায়গায় গিয়ে লেগেছে।
হঠাৎ আমার কানে বাজল পরিষ্কার কণ্ঠস্বর, বাঃ, বেশ হচ্ছে! এই তো চাই! এই তো চাই! স্পষ্ট হরিশঙ্করের কণ্ঠস্বর, Virtue! a fig! ‘tis in ourselves that we are thus, or thus!
২.০৯ কি সুন্দর–কি মহান–উদ্বেগে দাপটে
রাত কোথা দিয়ে কেটে গেল জানি না। সুরের নেশা, দেহের নেশা। ইন্দ্রিয়ের কিলিবিলি। গাঁজার ধোঁয়া। নাচিয়ে মহিলার নাম জিরাবাই। শ’খানেক মানুষকে একেবারে লুটিয়ে দিলে। আমরা খাওয়াদাওয়ার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলুম। হঠাৎ লতা এসে পরেশদার পিঠে এক চাপড় মেরে বললে, পেঁয়াজি বাইয়ের শরীরের পেঁয়াজি দেখতে হয় তো, আমাকে উদ্ধার করে এসে দেখো। ঘনিষ্ঠতা দেখে মনে হল, পরেশদাও লতার প্রেমমুগ্ধ। ছিপছিপে দীর্ঘাঙ্গী এই মহিলাও কম যান না। সবেতেই বেশ মাদকতা। শরীরের বাঁধুনি বোতলের নেশাকেও হার মানায়। পরেশদা গাঁজায় চুর হয়ে ছিলেন। গোপাল বালকটির মতো পিছু পিছু চলতে লাগলেন। পশ্চিমের গঙ্গাগর্ভ থেকে জোলো বাতাস বয়ে আসছে। বেশ ভারী। ভিজে আঁচলের মতো। লতার আঁচল উড়ে উড়ে ঝাঁপটা মেরে যাচ্ছে মুখে। মহুয়ার গন্ধ। গুনগুন করে গান ধরেছে তোমার আমার গোপন কথা শোনে শুনুক লোকে। মেয়েটা যে নেশা করেছে বেশ বোঝাই যায়। কপাল চকচক করছে। চোখদুটো ধকধক করছে। টুসকি মারছে। মাথায় অনেক চুল। থেকে থেকে খোঁপা ভাঙছে খোঁপা বাঁধছে। কখনও সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলছে।
পরেশদা সাবধান করছেন, এই কী হচ্ছে! লোকে মাতাল বলবে।
লতা বললে, এই নাবালক, মালটাকে জোটালে কোথা থেকে! বাঁদরছানার মতো সেই থেকে আমার দিকে জুলজুল করে তাকাচ্ছে। আমার শরীরে সুড়সুড়ি লাগছে মাইরি।
পরেশদা বললেন, অ্যায় লতু, হচ্ছেটা কী? কাকে কী বলছ! ভদ্দরলোকের ছেলে।
লতা খিলখিলিয়ে বললে, মাঝরাতে দুধের বাছা আর বুড়োহাবড়া ছাড়া কোন শালা ভদ্দরলোক!
পরেশদা ধমক মেরে বললেন, লতু, হি ইজ মাই ফ্রেন্ড।
আমার বেশ মজা লাগছিল। ভাগ্য আমাকে কী সুন্দর জায়গায় টেনে এনেছে। বলা যায় না, এইটাই হয়তো আমার বাকি জীবনের পরিবেশ। অন্য সময়ে আমি কি আসতুম এখানে? সাতদিন আগেও এখানে আসার কথা আমি ভাবতে পারতুম না। একেই বলে যোগাযোগ। তা সবই যদি ভগবানের ইচ্ছায় হয়, তা হলে এই খালপাড়ে আসাটাও তার ইচ্ছা। কেন? বলছি। ঠনঠনে গিয়েছিলুম মাকে প্রণাম করতে। হৃদয়ের ব্যথা জানাতে। মা সেখানে আমার জন্যে খাড়া করে রেখেছিলেন পকেটমার জামাইকে। জামাই সব আবর্জনা সাফা করে দিলে। দেখা হল এই পরেশদার সঙ্গে। তিনি টেনে নিয়ে এলেন এই বিচিত্র জায়গায়। এমনই বরাত, শুরু হল গান। সঙ্গে আবার নাচ। ভগবান জানতেন, ছেলেটার মনে গেঁদা হয়েছে। তালি মারতে হবে।
তালি মেরে পা ঠুকে জিরাবাই গান ধরলে, সেঁইয়া না মারো লাথ। তেরি গোড় পড়ি সজনীয়া। শুনো মেরি বাত ॥ ঈশ্বর এতেও সন্তুষ্ট হলেন না। পাতে দিলেন চাটনি। মাতাল লতা। যা ভেবেছিলুম। খেলা কোয়ার্টার সেমি নয় একেবারে ফাঁইনালে গিয়ে শেষ হল। খাদ্য যা জুটল সে আর বলার নয়। মাতাল রমণীর পোশাকআশাকের ঠিক থাকছে না। আঁচল খুলে পড়ে যাচ্ছে। চুল। এলিয়ে যাচ্ছে। শোচনীয় অবস্থা। তার নয়, আমাদের। সেই অবস্থায় কাজ কিন্তু হয়ে চলেছে। এনামেলের থালায় ভাত, ডাল, আস্ত একটা পেঁয়াজ আর চাটনি। এই হল খাদ্য। মেয়েটির হাতের রান্নার পরিচয় পাওয়া গেল ডালে। অমৃতের স্বাদ। কী দিয়েছিল কে জানে!
যে-লোকটিকে কিছু আগে দেখেছিলুম নির্বাক পশুর মতো বউয়ের পায়ে পায়ে ঘুরছে, মধ্যরাতে তার কী বিক্রম! সে-ও মনে হয় দু’পাত্র চড়িয়েছিল। রাজার মতো বসে বসে হুকুম করছে, অ্যায় ডাল দে। চাইবার মত একটা জিনিসই তো হয়েছে, সেটা ডাল। মদের একটা অদ্ভুত গুণ। পৃথিবীর সব প্রাণীকেই সম্বন্ধী মনে করায়। শালা ছাড়া সম্বোধন নেই। আর পরস্পরকে খুব নিকট করে। তুই ছাড়া মুখ দিয়ে আর কিছু বেরোয় না।
ডাল দে, বললেই তো আর ডাল দেওয়া যায় না। সব শেষ। লতা হাতের চুড়ি দিয়ে অ্যালুমিনিয়ামের ডেকচিটা একবার বাজিয়ে দিলে। মাথার ওপর দু’হাত তুলে শরীরের ওপরটা নাচিয়ে বললে, ডাল নেই, মাল আছে।
