তোমার বাড়িতে সবাই ভাববেন।
একই ব্যাপার, আমারও কেউ নেই।
তাই নাকি? আহা কী ভাগ্য! শিবুদার কী কেরামতি! রতনে রতন মিলিয়ে দিয়েছেন। চলো তা হলে।
রাতের খাওয়া?
সে ব্যবস্থাও হবে।
পরেশদা চায়ের ঝুপড়িতে ফিরে গেলেন। তার সঙ্গে কী একটা ব্যবস্থা করে ফিরে এলেন। বললেন, হয়ে গেল। তুমি আবার ভদ্দরলোক, শেষপর্যন্ত খেতে পারবে তো!
সন্দেহ আমারও আছে। ঘেন্না করলেও চেষ্টা করতে হবে। আর না। অনেক আদর খাইয়েছি।
নিজেকে। এইবার দেয়াল ভাঙতে হবে। সংসার-লেত্তি জীবন-লাটুকে ঘুরিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। তালগোল পাকাবার সময় এসেছে। ভাল ছেলে, লক্ষ্মী ছেলে হয়ে লাভ কী? জীবন অনেক বড়। একটা দিক দেখা হয়েছে! এইবার আর একটা দিক দেখব। যেটাকে আমরা আলোর দিক বলি, সে তো আমাদের ব্যাখ্যা। সে আলোর কেমন আলো! মুকু কীরকম খেলাটা দেখালে! এই লতারা অনেক ভাল। বোঝা যায়। মুকুরা ধড়িবাজ।
রাস্তা পাক মেরে খালের ওপারে গিয়ে পড়েছে। অন্ধকারে বাগবাজার ব্রিজ হাতির মতো দাঁড়িয়ে আছে। আমরা ব্রিজ পেরিয়েই গেলুম। গেট ঠেলে ঢুকতেই গান আরও স্পষ্ট হল। ভেতরটা বেশ প্রশস্ত। একটা মাথা-ঘেরা চাতাল। লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি পরে আসরে বসে আছেন ওস্তাদ। চেহারা দেখলে তেমন সমীহ হবার কথা নয়; কিন্তু গলায় সুরের ফুলঝুরি। শ্রোতারাও কেউ তেমন বিশিষ্ট নয়। আমরা একপাশে বসে পড়লুম। পরেশদাকে দেখে ওস্তাদজি গানের মধ্যেই ঘাড় নাড়লেন। তিনি চেনেন। আসরে তবলা আছে, ঢোলও আছে। খুব সেজেগুজে পাকা চেহারার এক মহিলা বসে আছেন। অবাঙালি। পরেশদা কানে কানে বললেন, নাচও হবে। এর নাচ দেখলে তোমার ষড়রিপুর প্রথমটা একেবারে ছেতরে যাবে। চোখের কায়দা কী, যেন অর্জুন তির ছুড়ছে। ওস্তাদের গান যেন। গলায় গামছার মোচড় মারছে, চিন্তা না করো শ্যাম। মহিলা বাবু হয়ে বসে আছেন মা ষষ্ঠীর মতো। উরুতে তাল দিচ্ছেন, সারা শরীরে ঢেউ খেলছে। ওস্তাদ যখন শ্যাম বলে সমে পড়ছেন, মহিলাও গলা মিলিয়ে হাঁটুতে চাপড় মারছেন। শব্দটা শুনতে পাচ্ছি, যেন ক্ষীরসাগরে কেউ ডাইভ মারছেন। শ্রোতারা সব টানটান হয়ে আছে। আমার পক্ষে একটু গুরুপাক হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশটা সহ্য হচ্ছে না। খালপাড়ের মশা মনে হচ্ছে তুলে নিয়ে যাবে। ছোট একটা কলকে হাত ঘুরতে ঘুরতে পরেশদার হাতে এসে গেল। শিশু যেভাবে ফিডিং বোতল চোষে সেইভাবে তিনটে প্রবল টান মেরে বললেন, পরীক্ষা করবে নাকি? শিববাবুর দাওয়াই।
আমার মাতামহের মুখে তার প্রথম গঞ্জিকাসেবনের গল্প শুনেছি, কংখলের এক সাধুর আখড়ায়। টান মেরেই উলটে পড়লেন। তারপর ফুলছে। পেট ফুলতে ফুলতে ফানুস। মনে হল আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছেন ধীরে ধীরে, দুলতে দুলতে। ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর স্বর্গের সিংহদুয়ার খুলে ডাকছেন, আইয়ে, আইয়ে। ভোরবেলা মনে হল, রম্ভা তার বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছেন। চোখ খুলে দেখলেন, তাগড়াই একটা কুকুর বুকের ওপর প্রেমসে ঘুমোচ্ছে। এর মধ্যেও তিনি করুণাময়ের প্রেম দেখতে পেয়েছিলেন। কুকুরটা জ্যান্ত জাম্পারের কাজ করেছিল। ওই প্রবল ঠান্ডায় তা না হলে নিউমোনিয়া হয়ে যেত!
পরেশদার মুখের একপাশে একটু আলো পড়েছে। চোখদুটো সুচের মতো সরু, ধারালো। শুনেছি গাঁজা খেলে চোখের মণি আলপিনের মতো হয়ে যায়।
পরেশদা বললেন, বড়প্রসাদ হাতে আটকে রাখার নিয়ম নেই। টান মেরেই ছেড়ে দিতে হয়। আবার রাউন্ড মেরে ফিরে আসবে। সর্বধর্ম সমন্বয়। এক কলকে বহু ঠোঁট। টানোনা-টানো, একবার টাচ করো। ছোট্ট কলকে। সাংঘাতিক গরম। একবার মনে হল, মারি টান। জীবনটাকে একটু অন্য প্ল্যাটফর্মে দেখি। অনেকদিন তো ভদ্দরলোক ছিলুম, যারা মশারি ফেলে প্রেম করে। ভাগবতের মধ্যে পর্নোগ্রাফি পুরে বলে, কৃষ্ণকথা পড়ছি। জীবে দয়া করো, বলে কাজের লোককে বেধড়ক জুতোপেটা করে। ব আর ভ এক করে ফেলে, নিজের জিভেই দয়া করে। যাদের বাড়িতে দু’রকমের। চালের ভাত হয়। বাবুদের জন্যে চামরমণি, কাজের লোকের জন্যে বোগড়া। পাওনাদার দেখলে বলবে, কাম কাঞ্চনে আমার আসক্তি নেই, আর নিজের টাকা আদায়ের সময় কলার খামচে ধরবে। গোঁফ থেকে দুধের সর মুছতে মুছতে বলবে, ভোগ একপ্রকার রোগবিশেষ।
পাশের লোকটি ছোঁ মেরে কলকেটা আমার হাত থেকে নিয়ে বললে, নালায়েক।
পরেশদা কানে কানে বললেন, ভালই করেছ। এ হল মুটেমজুরের নেশা। তোমাদের জন্যে বোতল। তবে কী জানো, গাঁজা খেলে কাম জয় করা যায়। ইন্দ্রিয় হল সাপ। দেখো, মহাদেব কেমন। মাফলার করে গলায় পরে আছেন, যেন টনসিল হয়েছে। ওই গাঁজার জোরে বউকে বলছেন, অন্ন দে মা।
কলকে উড়তে উড়তে চলে গেল নাচিয়ের কাছে। তিনি হাঁটু তুলে বসে, দু’হাঁটুর চাপের মধ্যে। হাতের কনুই রেখে তিনটি বেদম টান মারলেন। ওস্তাদ তখন গানের কলিতে অলংকার সাজাচ্ছেন, চিন্তা না করো শ্যাম। কাফি আর সিন্ধু মিলে ফাটাফাটি ব্যাপার।
ছোট একটা টিনের কৌটো হাত ঘুরতে ঘুরতে পরেশদার হাতে এল। কী একটা ঘিয়ের মতো জিনিস আঙুলের ডগায় নিয়ে চুষে খেয়ে ফেললেন। কৌটো আমাকে টপকে চলে গেল পাশের লোকের হাতে। পরেশদা বললেন, ভেসলিন।
ভেসলিন খেলেন?
গাঁজা খেলে ভেতরটা ড্রাই হয়ে যায়। ঘি দুধ আমরা পাচ্ছি কোথায়!
